আলোকচিত্রে জীবনের গল্প
আলোকচিত্রী সিরাজ আকরাম কায়েস
মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৭ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৬:৩৮
সময়কে ধরে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো ছবি। আলোকচিত্র শুধু দৃশ্য নয়, গল্পও বলে। সেই গল্প কখনও মানুষের হাসি-কান্না, কখনও প্রকৃতির রূপ, আবার কখনও দৈনন্দিন জীবনের অপ্রস্তুত মুহূর্ত। এমনই গল্পের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছেন তরুণ আলোকচিত্রী সিরাজ আকরাম কায়েস।
চট্টগ্রামের ছেলে কায়েসের ফটোগ্রাফিতে যাত্রা শুরু হয় প্রকৃতিকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই ছবি তোলা ছিল তাঁর প্রিয় শখ। ফুল, পাখি আর লতাপাতার ছবি তুলতে তুলতেই শখটা ধীরে ধীরে রূপ নেয় গভীর আসক্তিতে। এরপর তিনি বুঝতে পারেন, ক্যামেরা দিয়ে কেবল প্রকৃতি নয়, মানুষের জীবনের মুহূর্তও চিরস্থায়ীভাবে ধরে রাখা যায়। এভাবেই আলোকচিত্র হয়ে ওঠে তাঁর নেশা এবং ভালোবাসার জায়গা।
শুরুর দিনগুলোতে তিনি মোবাইল ক্যামেরা দিয়েই ছবি তুলতেন। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষ হয়ে ওঠেন। ছবি তোলা শুরু করেন ডিএসএলআর ক্যামেরায়। তাঁর ছবির সবচেয়ে বড় বিষয় মানুষ এবং মানবজীবন। তাঁর বিশ্বাস–মানুষের যাপিত জীবনের ভেতরেই সবচেয়ে বাস্তব, খাঁটি ও গভীর গল্প লুকিয়ে থাকে। সেই গল্পই তিনি ফ্রেমবন্দি করতে চান।
দেশের ভেতরে নানা জায়গায় তাঁর ক্যামেরার দৃষ্টি পৌঁছেছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছবি প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় সংবাদমাধ্যমে। কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুষ্ঠানেও প্রদর্শিত হয়েছে তাঁর ছবি।
এজন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন। ২০২৪ সালে দুবাইয়ের বিখ্যাত হামদান আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র পুরস্কারে তিনি ফাইনালিস্ট হন। বিশ্বের নামকরা আলোকচিত্রীদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত হওয়া তাঁর জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি।
শুধু সাফল্য নয়, বিপদের মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। ২০১৫ সালে খাগড়াছড়িতে ছবি তুলতে গিয়ে ধাওয়া খেতে হয়েছিল তাঁকে, এমনকি এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল জীবন যেন ঝুঁকিতে পড়ে গেছে! আবার ২০২০ সালে গাইবান্ধার নৌকাবাইচের ছবি তুলতে গিয়ে সন্ধ্যার পর অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন; চারপাশে ছিল বিস্তীর্ণ বিল, ফোনে চার্জ শেষ, হঠাৎ মনে হচ্ছিল যেন গোটা বিশ্ব তাঁকে ফেলে রেখে চলে গেছে। এসব পরিস্থিতি তাঁর সাহস ও ধৈর্য বাড়িয়েছে, আলোকচিত্রে এক নতুন দৃঢ়তা ও গভীরতা এনে দিয়েছে।
এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি অনলাইন-অফলাইন প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন সিরাজ। পেয়েছেন অনেক পুরস্কারও। তবে পুরস্কারের খুঁটিনাটি বিবরণ তিনি আলাদা করে সংরক্ষণ করেননি।
তাঁর কাছে পুরস্কার মানে কেবল সম্মান নয়; বরং মানুষের ভালোবাসা ও তাঁর কাজের স্বীকৃতি। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না মানুষ আমার পুরস্কারের তালিকা মনে রাখুক, আমি চাই তারা আমার ছবির ভেতরের গল্পগুলো মনে রাখুক।’
তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ফটোগ্রাফি দিয়ে আয় করতে চায়। কায়েসের মতে, শিক্ষার্থীরাও ছবি তুলে আয় করতে পারে। ছোটখাটো ইভেন্ট কাভার করা কিংবা অনলাইনে ছবি বিক্রি দিয়ে শুরু করা সম্ভব। তিনিও কিছু ছবি বিক্রি করে আয় করেছেন। তবে তাঁর কাছে ফটোগ্রাফি কখনও কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; বরং ভালোবাসা আর অভিজ্ঞতা ভাগ করার জায়গা।
ভালো ছবি তোলার জন্য সিরাজ আকরাম কায়েস বলেন, ‘আলোকে বোঝা ও সঠিকভাবে ব্যবহার করা উচিত। প্রতিটি ছবিই আলোর খেলা। আলোর দিক, শক্তি ও ছায়ার ব্যবহার বোঝা ছবির আবেগকে জীবন্ত করে। সাবজেক্টকে স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করতে হবে। মানুষ, প্রকৃতি বা বস্তু; তাদের প্রাকৃতিক ভাব ধরে রাখা হলে ছবিতে সত্যিকারের গল্প ফুটে ওঠে। ফ্রেম ও কম্পোজিশনে মনোযোগী হওয়া–ফ্রেমিং কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি গল্প বলার মাধ্যম। ছোটখাটো বিস্তারিতও অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রকৃতির ছবি তুলতে হলে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হবে–বিশেষ করে আউটডোর ফটোগ্রাফিতে প্রকৃতি আপনার সহকর্মী।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আলোকচিত্রে নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও গল্প তুলে ধরা তাঁর লক্ষ্য। তিনি চান, প্রতিটি ছবিতে এমন একটি অনুভূতি থাকুক, যা সবার মনে গভীরভাবে দাগ কাটবে।
- বিষয় :
- আলোকচিত্র
- জীবনের গল্প
