ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে চান মোহাম্মদ আরশাদ

দেশে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে চান মোহাম্মদ আরশাদ
×

পরিবারের সঙ্গে মোহাম্মদ আরশাদ

জিয়াউল জিয়া

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৬:৩১

পোশাকশিল্প দীর্ঘ চার দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠলেও দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছেন বাংলাদেশের বৃহত্তম বন্দরনগরী খ্যাত চট্টগ্রামের ছেলে মোহাম্মদ আরশাদ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বৈশ্বিক উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান ট্রুভান্টের উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কাজের পরিধির মধ্যে রয়েছে– উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের অপারেশন এবং বৈশ্বিক অপারেশনাল এক্সিলেন্সের দায়িত্ব, যা লেগো, প্রোক্টর অ্যান্ড গ্যাম্বল, ক্র্যাফট হেইঞ্জের মতো শীর্ষ ব্র্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। তিনি শুধু নিজের সাফল্যেই থেমে থাকতে চান না; বরং দেশের তরুণ বেকারদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করার পরিকল্পনা করছেন।

তবে পোর্ট অফিসার্স কলোনির এক মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে মোহাম্মাদ আরশাদের বেড়ে ওঠা সোনার চামচ মুখে নিয়ে হয়নি। তাঁর বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একজন কর্মচারী। মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই আরশাদের মধ্যে ছিল এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত কৌতূহল। মানুষের সঙ্গে মিশে কাজ করা, খেলাধুলায় নেতৃত্ব দেওয়া, সমাজভিত্তিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া– সবকিছুতেই তিনি ছিলেন সক্রিয়। সেই ছোটবেলার আগ্রহ আর অনুশীলনই ভবিষ্যতে তাঁকে অগ্রগামী করেছে।

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে আরশাদ ভর্তি হন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে। পড়ালেখার বাইরেও তিনি ছিলেন দারুণ সক্রিয়। মেকানিক্যাল ফ্যাকাল্টির ক্রিকেট দলের সহ-অধিনায়ক ছিলেন। একই সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রাম ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠক। এখান থেকেই তিনি শিখেছেন সময় ব্যবস্থাপনা, টিমওয়ার্ক, নেতৃত্ব ও লক্ষ্যনিষ্ঠ থাকার কৌশল। পড়াশোনা শেষে যোগ দেন ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশে। ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে কারখানার প্রতিটি ধাপ নিজ হাতে শিখেছেন। মান নিয়ন্ত্রণ, লজিস্টিকস, সাপ্লাই চেইন থেকে শুরু করে উৎপাদনব্যবস্থা পর্যন্ত। এখানেই তাঁর নেতৃত্বগুণ প্রতিষ্ঠানের নজরে আসে। কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁকে আন্তর্জাতিক দায়িত্বে পাঠানো হয়। সেখানে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে বিভিন্ন পদে কাজ করেন। 

আরশাদের বিশ্বাস, ‘প্রযুক্তি আমাদের কাজে সহায়তা করে, কিন্তু নেতৃত্ব আসে মানুষের কাছ থেকে। প্রযুক্তি কখনও মানুষের বিকল্প হতে পারে না।’ এটাই তাঁর কাজের মূল দর্শন। তিনি সবসময় মানুষের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পছন্দ করেন। সহকর্মীদের সম্মান দেন, তাদের মূল্যায়ন করেন। এর মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেছেন শক্তিশালী টিম; যা যে কোনো প্রযুক্তির চেয়ে বেশি কার্যকর।

২০২৫ সালের জুলাই মাসে মোহাম্মদ আরশাদ যোগ দেন ট্রুভান্টে। এটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে খাদ্য, কনজিউমার, স্বাস্থ্যসেবা, হাউসহোল্ড ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টরে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর জন্য অন্যতম বৃহৎ কনট্র্যাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ও প্যাকেজিং প্রতিষ্ঠান। 

ব্যক্তিগত সাফল্যের পরও আরশাদের রয়েছে দেশের প্রতি অকৃত্রিম টান। শুধু নিজেকেই সাফল্যের শিখরে তুলতে চান না। বাংলাদেশের আরও যেসব তরুণ প্রতিভা রয়েছে, তারাও যেন বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজেদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে পারেন সে জন্য দেখেন স্বপ্ন। তিনি জানান, দেশের তরুণ বেকারদের পেশাগত দক্ষতা প্রশিক্ষণ দিতে গড়ে তুলতে চান একটি একাডেমি। মোহাম্মদ আরশাদ বলেন, ‘যেহেতু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপারেশন এবং ম্যানুফ্যাকচারিং নিয়ে কাজ করি তাই ভবিষ্যতে বাংলাদেশে যে শ্রমশক্তি আছে তাদের কারিগরি শিক্ষা বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং ডিপার্টমেন্টে তাদের দক্ষ করে তোলার জন্য একটি একাডেমি করার ইচ্ছে আছে, টেকনিক্যাল-ভোকেশনাল একাডেমি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা গার্মেন্টস সেক্টরসহ বর্তমানে বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে এগিয়ে আছি, বলা চলে বাংলাদেশ একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাব। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে জনশক্তি আছে তাদের আমার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে দক্ষ এবং নেতৃত্বদানে যোগ্য করে গড়ে তুলতে এই একাডেমি সহায়তা করবে। সে ক্ষেত্রে দেশের যারা ইন্ডাস্ট্রি লিডার আছেন তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ বৃদ্ধি করে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এ কাজটি শুরু করার ইচ্ছে আছে।’

ব্যক্তিগত জীবনে আরশাদ দুই মেয়ের বাবা। তাঁর স্ত্রী সাবিহা শারমিন এমবিএ সম্পন্ন করে বর্তমানে বিজনেস অ্যানালাইটিক্স বিষয়ে মাস্টার্স করছেন। আরশাদ জানান, অফিস শেষে মেয়েদের সঙ্গে সময় কাটানোই তাঁর সবচেয়ে শান্তির জায়গা।

এক সাধারণ পরিবার থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে আসা আরশাদের গল্প কেবল একজন মানুষের নয়, এটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় তরুণদের জন্য এক দৃঢ় অনুপ্রেরণার নাম।

আরও পড়ুন

×