সৈকতের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ
নিজের তৈরি পণ্যের সঙ্গে সোহেল হোসেন সৈকত
মো. আশিকুর রহমান
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪০ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার ব্যস্ত সড়কে হাঁটছিলেন সোহেল হোসেন সৈকত। চোখে পড়ল রাস্তার পাশে স্তূপ করে থাকা প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের মোড়ক, ভাঙা চেয়ার। দৃশ্যটা প্রতিদিনের; কিন্তু তাঁর কাছে একটাই প্রশ্ন ফিরে এলো, ‘যে জিনিস একবার ব্যবহারেই শেষ, সেটিই কি আমাদের জীবনের স্থায়ী সমাধান হতে পারে?’
এই প্রশ্ন তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় শৈশবের গ্রামে। ঘরের আঙিনায় রাখা বাঁশের চালনি, বাজার থেকে আনা বাঁশের ঝুড়ি, ঘরের কোনায় রাখা বেতের মোড়া– এসব টেকসই পরিবেশবান্ধব জিনিস বছরের পর বছর ব্যবহার করা যেত। কোনোটা ভাঙলে জ্বালানি হতো, না হলে মাটিতে মিশে যেত। পরিবেশে কোনো বোঝা চাপিয়ে দিত না। ঠিক এই স্মৃতি থেকেই জন্ম নিল তাঁর উদ্যোগ ‘ইকোইন’, যেখানে বাঁশের হাত ধরে নতুনভাবে টেকসই জীবনধারা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে।
টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার থেকে সবুজ উদ্যোক্তা
সোহেল হোসেন সৈকতের জন্মস্থান ভাণ্ডারিয়া পৌরসভার পিরোজপুর জেলায়। টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে স্নাতক শেষ করে তিনি সহজেই একটি চাকরির জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষা ও সৃজনশীলতাকে টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার ইচ্ছা তাঁকে ভিন্ন পথে নিয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করেন, তরুণ প্রজন্মের উদ্যোক্তারা শুধু ব্যবসা নয়, সমাজ ও পরিবেশের জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ২০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য। বাকি প্লাস্টিক নদী-নালা, সড়ক বা মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়, যা পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ডেল্টা অঞ্চলে এই দূষণ মৎস্য এবং কৃষিকাজকেও প্রভাবিত করছে। বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর ৩০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে ফেলা হয়, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বাঁশ একসময় প্রতিটি গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়েছে গুরুত্ব। সোহেল বুঝলেন, বাঁশের ব্যবহার কমে যাওয়ার দুটি বড় কারণ রয়েছে– ঘুণপোকা ও ছত্রাকের আক্রমণে পণ্য দ্রুত নষ্ট হয়। আধুনিক ডিজাইনের অভাবে তরুণরা এসব পণ্যে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ সমস্যা কাটাতে তিনি দুই বছর গবেষণা চালান। বের করে আনেন একটি সমাধান– ট্রিটমেন্ট প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে বাঁশের জিনিসপত্র টেকসই হয় পাঁচ থেকে সাত বছর বা আরও বেশি সময়। পাশাপাশি ডিজাইনে আনা হয় আধুনিকতার ছোঁয়া। ফলে পণ্যগুলো যেমন ব্যবহারযোগ্য হচ্ছে, তেমনি তরুণ প্রজন্মের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
বর্তমানে ‘ইকোইন’ টিম তৈরি করছে প্রায় ৩০ ধরনের বাঁশের পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে ঘরের সাজসজ্জার সামগ্রী, রান্নাঘরের জিনিস, অফিস ব্যবহারের উপকরণসহ নিত্যদিনের ব্যবহারযোগ্য নানা জিনিস। এসব পণ্য একদিকে যেমন স্থানীয় হস্তশিল্পের ঐতিহ্য বহন করছে, অন্যদিকে আধুনিক নকশার মাধ্যমে বাজারে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। সোহেল বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি পণ্য হোক প্লাস্টিকমুক্ত, টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব। একই সঙ্গে স্থানীয় কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।’
‘ইকোইন’-এর যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন স্থানীয় কারিগররা। তাদের দক্ষ হাত ছাড়া এই শিল্প টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই উদ্যোগটির মাধ্যমে তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ। কারিগর ফারুক মিয়া বলেন, ‘আগে হাতে কাজ থাকত না। সংসারে অভাব লেগেই থাকত। এখন চাহিদা বেড়েছে, কাজও বেড়েছে। পরিবার নিয়ে আগের চেয়ে ভালো আছি।’ আরেক কারিগর শাহ আলম মিয়া বলেন, ‘আমরা মানের সঙ্গে কোনো আপস করি না। ভালো পণ্য তৈরি করতে পারলে ক্রেতা বারবার ফিরে আসবে। মানই আমাদের সবচেয়ে বড় মূলধন।’
‘ইকোইন’ কেবল একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নয়; বরং সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা। সোহেল চান মানুষকে টেকসই জীবনযাপনের গুরুত্ব বোঝাতে। এ জন্য ভবিষ্যতে স্কুল ও কলেজে কর্মশালা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। সেখানে তরুণদের শেখানো হবে কীভাবে প্লাস্টিকমুক্ত ও পরিবেশবান্ধব পণ্য দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে পারে।
তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা হলো বাণিজ্যিকভাবে বাঁশ উৎপাদন। বর্তমানে মূলত স্থানীয়ভাবে সহজলভ্য বাঁশ ব্যবহার করেই পণ্য তৈরি করা হয়। কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। এই চাহিদা পূরণের জন্য বাঁশের কাঁচামালের ধারাবাহিক জোগান নিশ্চিত করা জরুরি। তাই ‘ইকোইন’ শুধু বাঁশ ব্যবহারই করবে না, পাশাপাশি এর উৎপাদনেও বিনিয়োগ করতে চায়। এর মাধ্যমে যেমন টেকসই কাঁচামালের নিশ্চয়তা তৈরি হবে, তেমনি প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ ও পরিবেশ সুরক্ষার কাজও এগিয়ে যাবে।
আজকের পৃথিবী প্লাস্টিক দূষণে ভুগছে। এ সময় সোহেল হোসেন সৈকতের ‘ইকোইন’ যেন এক টাটকা বাতাস। বাঁশের আধুনিক ব্যবহার কেবল পরিবেশ রক্ষা করছে না, বরং বদলে দিচ্ছে অনেকের জীবনও। আগে যারা কাজের অভাবে হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, আজ তারা আবার হাতে কাজ পাচ্ছেন; পাচ্ছেন পরিবারকে সচ্ছলভাবে চালানোর সুযোগ। বাংলাদেশে তৈরি বাঁশের পণ্যকে বৈশ্বিক বাজারে পরিচিত করে তুলতে চান তরুণ উদ্যোক্তা সোহেল হোসেন সৈকত। তাঁর বিশ্বাস, দেশীয় কাঁচামাল ও দক্ষ কারিগরের সমন্বয়ে তৈরি এই পরিবেশবান্ধব পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকবে। সোহেল বলেন, ‘‘আমার স্বপ্ন একদিন ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগসহ আমাদের পণ্য পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে পৌঁছাবে।’’
- বিষয় :
- পরিবেশ
- বেত
- পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ
