ডাকটিকিট ও একজন বিমান মল্লিক
বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিট হাতে এর নকশাকার বিমান মল্লিক
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪৭ | আপডেট: ০৪ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
ডাকসেবার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করে সারাবিশ্বে পালন করা হয় ডাক দিবস। ১৮৭৪ সালে সুইজারল্যান্ডের বের্ন শহরে বিশ্ব ডাক সংস্থার (ইউপিইউ) প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণ করে প্ৰতিবছর ৯ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় দিবসটি। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয়। এ উপলক্ষে দেশের প্রথম ডাকটিকিটের নকশাকার বিমান মল্লিককে নিয়ে লিখেছেন শিশির কুমার নাথ
---------------------------------------------------------
ডাক ব্যবস্থার ইতিহাস অনেক প্রাচীন হলেও ডাকটিকিটের প্রচলন হয়েছে পৌনে ২০০ বছর আগে। ছোট্ট একটি ডাকটিকিট বয়ে নিয়ে চলে একটি দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও নানা জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ধারাকে। এই ডাকটিকিট কেবল চিঠির ওপরেই লাগানো হয় না; আঙ্গিক, সৌন্দর্য ও আবেগিক বিশ্লেষণে এটি একটি সংগ্রহযোগ্য বস্তু। জননন্দিত শখগুলোর একটি হলো ডাকটিকিট সংগ্রহ। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর একটি কবিতায় লিখেছেন, ‘ডাক টিকিটের রাশি– আমি ভালবাসি,/যদি তা’ পুরাণো হয়– ব্যবহার-করা,/ছেঁড়া, কাটা, ছাপমারা, স্বদেশী, বিদেশী;– তা’ সবে পরশি’ যেন হাতে পাই ধরা!’
বাংলাদেশের ডাকটিকিটের সঙ্গে বিমান মল্লিক প্রাসঙ্গিক নাম। দেশে তখন যুদ্ধাবস্থা। যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত। তৎকালীন সরকার একটি ডাক ব্যবস্থা গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে। মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া এবং স্বাধীনতার সপক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য ডাকটিকিট একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বাংলাদেশ নামে ডাকটিকিট প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ও ডাক বিভাগের পোস্টমাস্টার জেনারেল জন স্টোনহাউসকে এ ডাকটিকিট প্রকাশের দায়িত্ব দেয়।
জন স্টোনহাউস লন্ডনপ্রবাসী বাঙালি নকশা প্রণয়নকারী বিমান মল্লিককে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের নকশা করার দায়িত্ব দেন। বিমান মল্লিক বিনা পারিশ্রমিকে ডাকটিকিটগুলোর নকশা করে দেন। তারপর স্টোনহাউসের সহযোগিতায় লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রেস থেকে ছাপা হয় ডাকটিকিটগুলো।
১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই হাউস অব কমন্সে আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ডাকটিকিটগুলো ও ফার্স্ট ডে কাভার প্রদর্শন করেন। তার পরদিন যুক্তরাজ্যের প্রায় সবকটি সংবাদমাধ্যমে এ খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। ২৯ জুলাই বাংলাদেশসহ উত্তর-দক্ষিণ আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ পায় স্বাধীন বাংলাদেশের ডাকটিকিট। ডাকটিকিটগুলোর নকশায় স্থান পায় বাংলাদেশের মানচিত্র, পতাকা, ব্যালট বাক্স, শিকল ভাঙার ছবি, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তপাত ইত্যাদি। প্রতি সেট ডাকটিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২১ টাকা ৮০ পয়সা, যা ব্রিটিশ মুদ্রায় মূল্য ছিল ১ পাউন্ড ৯ পেনি। টিকিট বিক্রির জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘বাংলাদেশ ফিলাটেলিক এজেন্সি’ নামে প্রতিষ্ঠানকে। সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে স্বাধীন বাংলার ডাকটিকিট। বিভিন্ন দেশে সরকার ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে টিকিটগুলো পৌঁছানোর পরই আলোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্বকে জানান দেওয়া হয় একটি নতুন দেশের অস্তিত্বের কথা।
বাংলাদেশের প্রথম এই ডাকটিকিটগুলোর নকশাবিদ বিমান চাঁদ মল্লিক, যিনি বিমান মল্লিক নামেই পরিচিত। জন্ম ১৯৩৩ সালে কলকাতার হাওড়ায়। তাঁর পিতার নাম অজিত কুমার মল্লিক এবং মায়ের নাম শ্রদ্ধা দেবী। বিমান মল্লিক পেশায় হয়ে ওঠেন একজন ডিজাইনার। ১৯৬৫ সালে কাজ পেয়ে যান নামকরা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে। ১৯৬৯ সালে মহাত্মা গান্ধীকে নিয়ে ব্রিটিশ সরকার স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে। এ ডাকটিকিট নকশা করে আলোচনায় আসেন বিমান মল্লিক। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র ভিনদেশি, যিনি ব্রিটিশ ডাকটিকিট নকশা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ফিলাটেলিস্ট আখলাকুর রহমান বলেন, ‘বিমান মল্লিক আর বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটের সেট এমনভাবে জড়িয়ে আছে, একটিকে ছাড়া অন্যটি চিন্তাও করা যায় না। একটির কথা বললে অন্যটিও চলে আসে। বিমান মল্লিকের নকশা করা আটটি ডাকটিকিট মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস। পোস্টার ঢঙে করা উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার এ আটটি ডাকটিকিটকে অনন্য করে তুলেছে। এ ডাকটিকিটগুলো দেখলে বোঝা যায়, শুধু মেধা আর মনন নয়; বরং শিল্পের সঙ্গে ভালোবাসা যুক্ত হলে তবেই তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা পায়।’
ফিলাটেলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (পিএবি) পৃষ্ঠপোষক এ টি এম আনোয়ারুল কাদিরের কথায়, “বাংলাদেশের অন্যতম ফিলাটেলিক সংগঠন ফিলাটেলিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ২০০৩ সাল থেকে ২৯ জুলাই ডাকটিকিট দিবস হিসেবে উদযাপন করে আসছে। ২০০৮ সালে আমি জানতে পারি, বিমান মল্লিক জীবিত আছেন। তখন আমি অনলাইনে যোগাযোগ করি এবং তাঁকে জানাই তাঁর ডিজাইন করা বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশের তারিখটি আমরা ডাকটিকিট দিবস হিসেবে উদযাপন করি। তিনি অত্যন্ত খুশি হন। তখন আমি তাঁকে ডাকটিকিট দিবসের একটি ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও বিশেষ সিলমোহরের ডিজাইন করার অনুরোধ জানাই। পরবর্তী সময়ে ডাক বিভাগের মাধ্যমে আবার অনুরোধ জানানোর পর ২০১৫ সালের ২৯ জুলাই ডাকটিকিট দিবসে তাঁর ডিজাইন করা ডাকটিকিট, উদ্বোধনী খাম ও বিশেষ সিলমোহর প্রকাশিত হয়। এবারও তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেননি। তিনি বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু। ২০০৮ সালে আমার ডাকটিকিটবিষয়ক একটি বই প্রকাশিত হয় এবং বইয়ের একটি কপি তাঁকে পাঠাই। বইয়ের প্রচ্ছদে একেবারে ওপরে তাঁর ছবি ব্যবহার করায় এবং তাঁকে নিয়ে একটি অধ্যায় রাখায় তিনি অত্যন্ত খুশি হন। ২০০৮ সাল থেকে আজ পর্যন্ত তিনি ২৯ জুলাই ডাকটিকিট দিবসে কী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি, সেটি জানতে চান। ২০১২ সালের ২৭ মার্চ বাংলাদেশ সরকার বিমান মল্লিককে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ঢাকায় আমন্ত্রণ জানিয়ে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ স্মারক দেয়। তিনি জানান, এটি তাঁর অনেক বড় প্রাপ্তি।”
নব্বই পেরোনো এই গুণী শিল্পী এখনও আঁকেন, লিখেন। বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিট সেটের মধ্যে রক্তাক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিমের ডাকটিকিট আলাদা করে তাঁর মনে দাগ কাটে। এটি নিয়ে লিখেছেন ছড়াও– ‘দেশের বুকে মারল গুলি অত্যাচারী Bulli/ লেখক কবি ধরল কলম আমার হাতে তুলি/কাজটা ছিল শক্ত সমাধানে ছড়িয়ে দিলেম ডাকটিকিটে রক্ত।’
বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমেও পাওয়া যায় তাঁর সরব উপস্থিতি। যোগাযোগের সৌভাগ্য হয়েছে কয়েকবার। বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলো সংগ্রহ করার পর আবদার করেছিলাম ডাকটিকিটগুলোর সঙ্গে শিল্পীর একটি স্মারক সংগ্রহে রাখার জন্য। চমকে দিয়ে একটি চিঠি পাঠালেন। লন্ডন থেকে হাতে এসে পৌঁছার পর মনে হলো এ এক দারুণ প্রাপ্তি। আমাদের ডাকটিকিটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে বিমান মল্লিকের নাম। শিল্পী বেঁচে থাকবেন আঁকায়, রেখায়।
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক
- বিষয় :
- ডাকটিকিট
- শিশির কুমার নাথ
