ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমাজনের রং ও নৃত্যে

আমাজনের রং ও নৃত্যে
×

মহুয়া রউফ

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:০১ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১৬:৫৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাজনে তিকুনা আদিবাসীদের নৃত্য দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ে গেল সত্যজিৎ রায়ের আগন্তুক সিনেমার কথা। সিনেমায় উৎপল দত্ত যেমন সাঁওতাল আদিবাসী পাড়ায় চলে যান, আমিও যেন তেমন কিছুর সন্ধান পেয়েছি এখানে। আদিবাসীদের প্রতি আছে আমার স্বভাবসুলভ কৌতূহল। আছে তাদের জীবনধারা জানার আগ্রহ। দেশ ভ্রমণে আমি শহুরে সভ্যতার গণ্ডি ছাড়িয়ে মানুষের মূল ও প্রকৃত জীবন খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। সবসময় যে তা সম্ভব হয় তা নয়, কিন্তু যেখানে সুযোগ আছে তা হাত ছাড়া করব কেন। 

নৃত্য থামল। খুব ইচ্ছে হচ্ছে, এ পাড়ায় থেকে যাই কোনো পরিবারের সঙ্গে ক’দিন। গাইড জানালেন, এটি সম্ভব নয়। তিকুনারা এ অনুমতি দেবেই না। তিনি বললেন, এই উঠান ডিঙ্গিয়ে তাদের ঘর পর্যন্ত যাওয়ারই অনুমতি নেই। আমরা পর্যটক দল এবার এলোপাতাড়ি ঘুরেফিরে দেখছি তিকুনা আদিবাসীপাড়া। কিছু পর্যটক দুগাল এগিয়ে দিয়ে বসেছে আদিবাসী পটুয়াদের সামনে। এ আহ্বানের অর্থ–আমার কপোলে আঁক বসন্ত রং আজ। আরেক দল পর্যটক কাছের ২০০ বছর বয়সী গাছের গোড়ায় ছবি তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। কে যে কার ক্যামেরার ফ্রেমে ঢুকে পড়ছে তারা বোঝার চেষ্টাই করছে না। অদূরে এক তিকুনা কিশোর গলায় একটা অ্যানাকোন্ডা পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আমি সেদিকে দ্বিতীয়বার তাকাচ্ছি না। মুখে রঙের নকশা আঁকা এক তিকুনা নারীর দিকে আমার ক্যামেরা তাক করতেই তিনি সরে গেলেন। গাইড বললেন, তুমি তাদের দলগত ছবি তুলতে পার কিন্তু একক কারও ছবি তুলতে অর্থ মূল্য দিতে হবে। 

সব তিকুনা নারী-পুরুষ দুগালে রঙের আলপনা এঁকেছেন। গাইড তিকুনাদের নানা রং-নকশার মাহাত্ম্য বলতে শুরু করেছেন। তিনি বলছেন, তিকুনারা তাদের জীবনযাত্রায় নানা চর্চার মধ্য দিয়ে যায়; যার একটি হলো মুখে রং ও নকশা ব্যবহার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। মুখের রং তাদের একটি হাতিয়ার এবং নিজেদের প্রকাশের মাধ্যম। চরিত্রের প্রকাশ, সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থান, অনুষ্ঠান, উৎসব, যুদ্ধের পরিস্থিতি, শিকারের সময় ছদ্মবেশ নেওয়া অথবা নিছক সাজসজ্জা– এমন নানা পরিস্থিতিতে তারা শরীরে রং মাখে। খারাপ শক্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার বিশ্বাসেও রং দিয়ে শরীরে নকশা আঁকে। প্রতিটি রং ও আলপনার আছে নিজস্ব অর্থ। এ ‘যেমন খুশি তেমন আঁকি’ এমনটা নয়। বসন্ত চলে যাচ্ছে এই কষ্টে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন–‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও যাও, যাও গো এবার যাবার আগে’। না, আমাজনের এ পাড়ায় বসন্ত যায় না। বসন্ত এখানে সবসময় সমাগম। 

তিকুনারা বিশ্বাস করে, মানুষই নিজেদের অন্যকিছুতে রূপান্তরিত করার ক্ষমতা রাখে। এ ক্ষমতাই মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। মুখের রং-নকশা তরুণ থেকে বয়স্ক ভেদেও ভিন্ন হয়। সম্প্রদায়ের মধ্যে অধিক গুরুত্ব বোঝাতেও রঙে ভিন্নতা আসে। কিছু নকশা শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক। কিছু নকশা-আঁকা মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছি তাদের জাগুয়ারের মতো লাগছে। কিছু আদিবাসী মুখজুড়ে কালো এবং লাল রঙের মিশ্রণ ঘটিয়েছে। তাদের হিংস্র দেখাচ্ছে। হুম, ভয় দেখানোর ধান্ধা। যুদ্ধে কালো রং দিয়ে মুখ এবং শরীর ঢেকে রাখে। কিছু রং আর নকশা বয়স বাড়ার ইঙ্গিত দেয়–কিশোরী তিকুনা নারীর বয়স বাড়ার অনুষ্ঠানে কালো জেনিপাপো রং ব্যবহার করে। কোন রং যুদ্ধের–অন্য গ্রামের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ব্যবহার করে। দৈনন্দিন মুখে রং-আলপনা আঁকার সঙ্গে নাকি তাদের মেজাজমর্জিরও সম্পর্ক আছে। 

গাইডকে বললাম, ‘কীভাবে তৈরি করে এই রং?’ তিনি জানালেন, রং প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরি করে। জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করা ফল, বীজ, পাতা ও কাঠের রস ব্যবহার করে রং বানায়। জেনিপাপো ফল কেটে তার ভেতরের সাদা অংশ বের করে পিষে দিলে কিছুক্ষণ পর গাঢ় নীল-কালো রং হয়। জেনিপাপোর কালো রং শক্তি ও সুরক্ষার প্রতীক। এটির স্থায়িত্ব নাকি অনেক বেশি। আচিওতে বা উরুকুম বীজ ব্যবহার করা হয় লালচে-কমলা রঙের জন্য। বীজ পিষে পেস্ট বানিয়ে লাগানো হয় শরীরে। এই রং দ্রুত মুছে যায়। আচিওতের লাল রং জীবন, উৎসব ও উর্বরতার প্রতীক। কয়লার গুঁড়া ও প্রাকৃতিক গাছের আঠা মিশিয়ে কালো রং তৈরি করে। রঙের স্থায়িত্ব বাড়াতে মৌমাছির মোম মেশায়। 

পর্যটকদের দুগালে তিকুনারা এঁকে দিচ্ছে দেবতা, নদী, প্রাণী বা গাছের প্রতীক। তিকুনাদের বিশ্বাস, এই রং ও নকশা তাদের অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে। কী যেন গানটা ভূপেনের! মনে পড়েছে–‘রঙের খনি যেখানে দেখেছি রাঙিয়ে নিয়েছি মন!’ এই যে আমিও এই আমার দুগাল রং দিয়ে আঁকালাম। 

সভ্যতার আরোপিত সব নিয়মকে তুচ্ছ জ্ঞান করে এরা মুক্ত, সরল, প্রাকৃতিক জীবনচর্চার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এখানে মানুষের রূপ ভিন্ন। এখানেই আছে ভূপেনের রঙের খনি।

আরও পড়ুন

×