ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নগরে নতুন ধারার রেস্তোরাঁ

নগরে নতুন ধারার রেস্তোরাঁ
×

ভোজনরসিকদের মন জয় করতে বালি রেস্টুরেন্টে ইন্দোনেশিয়ান খাবারে বাংলা ফিউশন যুক্ত করা হয়েছে

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪০ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার যানজট অনেক সময় কেড়ে নিলেও ভোজনপ্রিয় মানুষ এখনও সুযোগ এলেই বন্ধু, স্বজন কিংবা পরিবার নিয়ে খানিকটা সময় ভিন্নমাত্রায় কাটাতে চায়। ছোটাছুটির এ শহরে ঐতিহ্যবাহী সব খাবারের সঙ্গে মিলিয়ে রেস্তোরাঁর অবয়বেও পরিবর্তন লক্ষণীয়। যাদের হাত ধরে খাবারের স্বাদের পাশাপাশি কখনও পাহাড়, কখনও ভিনদেশের কোনো ঐতিহ্যের সাক্ষাৎ, তাদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন আশরাফুল ইসলাম আকাশ

বাবুমশাই রেস্তোরাঁ

বাঙালিয়ানার ছোঁয়া

সময়টা ২০২২ সাল। করোনার ভয়াবহতা তখনও কাটেনি। এর মধ্যেই পড়ালেখার পাঠ চুকিয়েছেন শাকির জামান। চাকরিজীবী পরিবারের রীতি ভেঙে তিনি হতে চাইলেন উদ্যোক্তা। সেটিও আবার খাবারের ব্যবসায়। ভোজনরসিকদের জিহ্বায় স্বাদ দিতে চাইলেন ভিন্ন কিছুর। নিজের মনে জমানো সেই পরিকল্পনা মা রাশেদা আহমেদকে জানালেন। সন্তানের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার ইচ্ছা তাঁরও মনে ধরল বেশ। তবে কিছু শুরু করার আগে শাকিরকে কলকাতায় যাওয়ার পরামর্শ দিলেন মা রাশেদা। মায়ের পরামর্শে পশ্চিমবঙ্গে কয়েক মাস কাটিয়ে দিলেন। ঘুরলেন-ফিরলেন পুরোনো শহরের নানা খাবার নিয়ে বোঝাপড়া পরিষ্কার করে নিলেন। এরপর দেশে ফিরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে শুরু করলেন ‘বাবুমশাই হেরিটেজ’। 
বাবুমশাই হেরিটেজ মূলত জমিদারদের ঐতিহ্যকে বহন করছে। তবে এখানকার ক্রেতারা সব শ্রেণিরই মানুষ। জমিদারদের যেভাবে অ্যাপায়ন করা হতো, ঠিক সে রকমই কিছু চেষ্টা করলেন শাকির। কাঁসার থালাভর্তি ছোট বাটিতে নানা পদের তরকারি, সঙ্গে সাদা ভাত পরিবেশন করা হয়। এসব খাবারের মান ঠিক রেখে ক্রেতা সাশ্রয়ী মূল্যে পরিবেশন করার দৃঢ়সংকল্প নিয়ে উদ্যোক্তা যাত্রা শুরু করেন তিনি। 
শাকির জামান বলেন, ‘আমার এ প্রতিষ্ঠানের ব্যাকবোন আমার মা। বাবুমশাইয়ের যত আয়োজন সবকিছু তাঁকে নিয়েই করা। আমি যেহেতু গণমাধ্যম ও যোগাযোগ বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই ঐতিহ্য ও রং আমার পছন্দের জায়গা। সে কারণে ব্যবসায় এ বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কলকাতায় যখন ছিলাম, দেখেছি অনেক জায়গায় এখনও খুবই ট্র্যাডিশনালি সব সার্ভ করা হয়। আমাদের এখানে এটি শুরু হয়নি ভেবে থিমেটিক আইডিয়ার বীজ বপন করি।’ 
রাজধানীর বুকে অগণিত রেস্তোরাঁ গড়ে উঠেছে। এসবের ভিড়ে ‘বাবুমশাই হেরিটেজ’ আলাদা বটে। এখানে খেতে আসা অধিকাংশ অতিথির পরনে থাকে পাঞ্জাবি ও শাড়ি। হাতে সময় নিয়ে তারা রেস্তোরাঁয় আসেন, আড্ডায় মেতে ওঠেন। শাকির বলেন, ‘বাবুমশাইকে বাঙালি রূপে কল্পনা করে এভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছি।’ বাবুমশাইয়ের সবখানে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া স্পষ্ট। কোথাও স্থান পেয়েছে রিকশা, কোথাও আদি বাংলার হারিকেন কিংবা গরুর গাড়ির চাকা। বাবুমশাইয়ের রসুইখানাও দখলে রেখেছেন এক বিহারি বাবুর্চি। তাঁর রান্নার স্বাদে রীতিমতো বিমোহিত এখানকার সেবাগ্রহীতারা। 

বাঁশ-বেত ও খড়ের ব্যাঙের ছাতায় নতুনত্ব

ইন্দোনেশিয়ার দৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্থান বালি। দূরদেশের এই প্রদেশে ঘুরতে গেলে সময় ও অর্থের অপচয় দুটোই কষ্টসাধ্য। সেই দুটো সাধ্যের মধ্যে এনে ভোজনপ্রিয় বাঙালিকে বুদ করে রেখেছেন উদ্যোক্তা বিপুল হোসেইন। রাজধানীর উত্তরায় বালির আদলে গড়ে তুলেছেন খাবারের মহল বালি রেস্টুরেন্ট; যেখানে প্রতিনিয়ত ছুটছেন রাজধানীবাসী। নিচ্ছেন ইন্দোনেশিয়ান খাবারের বাংলা ফিউশনের স্বাদ। 
বিপুল হোসেইন ছাত্রাবস্থায় পণ করেছিলেন উদ্যোক্তা হবেন। যেই ভাবনা, সেই কাজ। ২০১৮ সালে মিরপুরে ছোট্ট করে শুরু করেন ফুড বিজনেস। শুরুটা ভালোই হয়েছিল। বাধা হয়ে দাঁড়ায় কভিড পরিস্থিতি। এক ধাক্কায় স্বপ্ন চূরমার হয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন বিপুল। তবে হার মানতে চাননি। প্রস্তুতি নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আবারও স্বপ্নের খাতা খোলেন বিপুল। আগের ভুলগুলো শুধরে শুরু করলেন নতুন যাত্রা। 
‘বালি রেস্টুরেন্ট’-এর আত্মপ্রকাশের আগে তিন মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করেন বিপুল। মার্চ-এপ্রিলে বাঁশ-বেত ও খড়ের ব্যাঙের ছাতায় নতুনত্ব আনেন তিনি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের ঘরে বসেও খাবারের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ রেখেছেন উদ্যোক্তা। মজার ব্যাপার হলো, ভোজনরসিকদের মন জয় করতে বালি রেস্টুরেন্টে  ইন্দোনেশিয়ান খাবারে বাংলা ফিউশন যুক্ত করা হয়েছে। তাতেই বাজিমাত। কথায় কথায় বিপুল জানালেন, ‘আমার রেস্টুরেন্টে সেফ এসেছেন মালয়েশিয়া থেকে। শুরুতে আমরা ট্রায়াল ফুড চেষ্টা করি; যা ক্রেতার মনে ধরে। সেই ধারাবাহিকতা আজও চলছে।’ 
বালি রেস্টুরেন্টে পাস্তা পান্তাই, বাক্সো কুয়া, সি ফুড স্যুপ, নাসি কামপুর আয়াম, নাসি গরেঞ্জ খাবারগুলোর স্বাদ ক্রেতার পছন্দের শীর্ষে। এর বাইরেও মকটেইল ও বিভিন্ন শেকস পানীয় জনপ্রিয়।
বিপুলের রেস্টুরেন্টে এখন ৩২ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। তাদের সবাই ভিন্ন ভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত। তিনি বললেন, ‘আমি যে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারব, সেই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল। এ কারণে ছাত্রাবস্থায় ধাক্কা খেয়েও এখানে আসতে পেরেছি। স্বপ্ন এখন একটাই, বালি রেস্টুরেন্টকে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত করা।’ 

প্রকৃতির ছোঁয়ায় হেবাং

পাহাড়ি খাবারের স্বাদ

ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে পাহাড় থেকে রাজধানীতে এসেছিলেন চার বোন বিপলী, প্রিয়াংকা, সুচিন্তা ও স্বস্তি চাকমা। স্বপ্নের এ শহরে শুরুতেই নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। নানা সময় কটূক্তিও শুনতে হয়েছে। সেই কটূক্তিই তাদের শক্তি হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দ্বার খুলে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া প্রিয়াংকার সাহসিকতায় যাত্রা শুরু করে হেবাং। এ কাজে তাঁকে সহযোগিতা করেন অন্য তিন বোন। তাদের শক্তি ছিল চাকমা সংস্কৃতি ও পাহাড়ি রান্নার স্বাদ।
২০১৬ সালে ফেসবুক দিয়ে শুরু। নিজেরাই করতেন হোম ডেলিভারি। দুই বছরের মধ্যে রাজধানীতে বৃহৎ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। কাজীপাড়ায় একটি ছোট্ট আউটলেট দেন। উদ্যোক্তা চার বোনের হাতে পাহাড়ি খাবারের স্বাদ নিতে শুরু করেন ভোজনপ্রিয় বাঙালিরা।
বিপলী চাকমা বলেন, ‘হেবাংয়ের যাত্রাটাই হয়েছে আমাদের জীবনযাপনকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। তবে শুরুতে অনেকেই বলতেন এসব খাবার কেউ গ্রহণ করবে না। তবুও আমরা কেউ মনোবল হারায়নি। যানজটের শহরে গড়ে ওঠা রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করলে ভোজনরসিকদের ধারণা বদলে যাবে। রেস্তোরাঁজুড়ে পাহাড়ি ছোঁয়া। বাঁশ-খড়ের তৈরি জুমঘরে বসে খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ করে দেবে হেবাং। এখানকার বিন্নি ভাত, পাহাড়ি ব্যাম্বো চিকেন, ব্যাম্বো ফিশ, কাঁকড়া ফ্রাই, শুঁটকি ফ্রাই ও মুন্ডি বেশ নজর কেড়েছে।
বিপলী চাকমা জানান, তাদের এখানে প্রতিটি খাবারই অর্গানিক। সব সবজিই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা থেকে সংগ্রহ করা হয়। কিছু কিছু সবজি রাঙামাটি থেকেও নিয়ে আসেন তারা। এরপর সেগুলো ঘরোয়া উপায়ে প্রক্রিয়া করে ক্রেতার কাছে পরিবেশন করা হয়। 
বিপলী বলেন, ‘আমরা কখনও হারতে চায়নি। সাত বছরের এই যাত্রায় দুবার হোঁচট খেতে হয়েছে। তবু এগিয়ে গেছি। দেশের মাটিতে বসে পাহাড়ি খাবারের স্বাদ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই; যেন আমাদের সংস্কৃতি ও জীবনযাপন নিয়ে কোনো ভুল ধারণা না জন্মায়।’ 

 

আরও পড়ুন

×