ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১৫ মিলিয়ন বছরের বরফচাপা হিম জগৎ

ভস্তক হ্রদের অমীমাংসিত রহস্য

ভস্তক হ্রদের অমীমাংসিত রহস্য
×

ভস্তক হ্রদের উপর রাশিয়ার গবেষণা কেন্দ্র

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৫ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীর বুকে এমন একটি স্থান আছে, যা আমাদের চেনা জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না, বাতাস বয়ে চলে না এবং গত ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি বছর ধরে সেই স্থানটি বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ স্থাপন করেনি। এটি কোনো ভিনগ্রহের গল্প নয়, এটি আমাদেরই পৃথিবীর দক্ষিণ মেরুর এক গভীর রহস্য–‘লেক ভস্তক’ বা ভস্তক হ্রদ। অ্যান্টার্কটিকার চার কিলোমিটার পুরু বরফের চাদরের নিচে সমাধিস্থ হয়ে আছে এক বিশাল জলরাশি, যা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক জীবন্ত ধাঁধা।  রাশিয়ায় নতুন গবেষণাগার চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সময়ের আধারটি খোলার এক নতুন প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।

বরফের নিচে অদৃশ্য মহাসাগর
অ্যান্টার্কটিকার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রাশিয়ার ‘ভস্তক স্টেশন’-এর ঠিক নিচেই এ হ্রদের অবস্থান। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন এখানে গবেষণা ঘাঁটি গেড়েছিল, তখন তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি তারা পৃথিবীর অন্যতম বড় এক ভৌগোলিক বিস্ময়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ১৯৯০-এর দশকে স্যাটেলাইট রাডার এবং সিসমিক সাউন্ডিংয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, পায়ের তলের ওই নিরেট বরফের স্তূপের নিচে লুকিয়ে আছে বিশাল তরল পানির এক জগৎ। ভস্তক হ্রদ আয়তনে উত্তর আমেরিকার লেক অন্টারিওর সমান। লম্বায় ২৫০ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ৫০ কিলোমিটার এ হ্রদটি এতটাই বিশাল, একে হ্রদ না বলে ‘ভূগর্ভস্থ সমুদ্র’ বলাই শ্রেয়। প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর শীতলতম স্থানে (যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৮৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নামে) বরফের নিচে পানি তরল থাকে কী করে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে পৃথিবীর গভীরতম ভূতাত্ত্বিক রহস্যে। ওপরের প্রায় চার হাজার মিটার পুরু বরফের চাপে পানির হিমাঙ্ক কমে যায়। তার সঙ্গে যুক্ত হয় পৃথিবীর তলদেশ থেকে উঠে আসা ‘জিওথার্মাল’ বা ভূতাপীয় উত্তাপ। এই দুইয়ের জাদুতে প্রচণ্ড ঠান্ডাতেও ভস্তক হ্রদের পানি জমে পাথর হয়ে যায়নি।

চৌম্বকীয় অসংগতি
ভস্তক হ্রদ কেবল একটি স্থির জলাশয় নয়; এটি একটি জীবন্ত ভূতাত্ত্বিক সিস্টেম। হ্রদটির দক্ষিণ-পূর্ব তীরে বিজ্ঞানীরা এক অদ্ভুত ‘ম্যাগনেটিক অ্যানোমালি’ বা চৌম্বকীয় অসংগতি খুঁজে পেয়েছেন। এর অর্থ হলো, সেখানকার ভূত্বক বা ক্রাস্ট সাধারণের চেয়ে অনেক পাতলা। ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ভস্তক হ্রদটি একটি ‘রিফট ভ্যালি’ বা ফাটল উপত্যকার ওপর অবস্থিত।

অক্সিজেনের বিষাক্ত ফাঁদ
ভস্তক হ্রদের পানি পৃথিবীর অন্য যে কোনো পানির চেয়ে আলাদা। লাখ লাখ বছর ধরে ওপরের হিমবাহ গলে হ্রদে পানি প্রবেশ করেছে। সেই বরফের সঙ্গে আটকা পড়া প্রাচীন বাতাসও হ্রদের পানিতে মিশেছে। হ্রদটি ওপর থেকে সিল করা থাকায় সেই গ্যাস বের হতে পারেনি। ফলে ভস্তক হ্রদের পানি অক্সিজেনে টইটম্বুর। সাধারণ পানির চেয়ে প্রায় ৫০ গুণ বেশি অক্সিজেন এখানে দ্রবীভূত আছে। 
তবে সেখানে পাওয়া একটি ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। তার নাম থার্মোফিলিক ব্যাকটেরিয়া, এটি এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা শুধু গরম পরিবেশে (৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে) বাঁচে। মাইনাস ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রার হ্রদে এর উপস্থিতি কেবল একটিই ইঙ্গিত দেয়–হ্রদের তলদেশে কোথাও না কোথাও গরম পানির উৎস বা আগ্নেয়গিরির মতো উষ্ণ ফাটল রয়েছে। এ ব্যাকটেরিয়াটিই ভস্তক হ্রদকে ‘মৃত’ জলাশয় থেকে এক সম্ভাব্য ‘এলিয়েন ইকোসিস্টেম’-এ পরিণত করেছে।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় রাশিয়ার বিজ্ঞানী সের্গেই বুলাত জানান, হ্রদের পানির একদম ওপরের স্তরটি সম্ভবত জীবাণুমুক্ত বা ‘স্টেরাইল’। অর্থাৎ যদি প্রাণ থেকেও থাকে, তবে তা ওপরের স্তরে নেই; তা লুকিয়ে আছে হ্রদের গভীর অন্ধকারে, উষ্ণ প্রস্রবণের আশপাশে।

নতুন ভস্তক স্টেশন
এতদিন ভস্তক হ্রদে গবেষণা চালানো ছিল এক দুঃসাধ্য সাধন। ১৯৫৭ সালে তৈরি পুরোনো স্টেশনটি বরফের নিচে প্রায় ডুবে গিয়েছিল। তবুও রাশিয়া হাল ছাড়েনি। ২০২৪-২৫ সালে তারা সেখানে এক অত্যাধুনিক ‘উইনটারিং কমপ্লেক্স’ বা নতুন স্টেশন চালু করেছে।
এই নতুন স্টেশনটি আধুনিক প্রকৌশলের এক বিস্ময়। এটি বরফের ওপর ৩৬টি বিশাল পিলারের ওপর দাঁড় করানো, যাতে বরফের স্তরে এটি ডুবে না যায়। এখানে রয়েছে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, হাসপাতাল, এমনকি জিম ও সওনা।
দেড় কোটি বছর ধরে বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা ভস্তক হ্রদ যেন প্রকৃতির এক সিন্দুক। এর ভেতরে কী আছে–আদিম কোনো জীবাণু, নাকি পৃথিবীর বিবর্তনের এক অজানা অধ্যায় তা এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তার আগ পর্যন্ত চার কিলোমিটার বরফের নিচে–সেই অন্ধকার, নিঃশব্দ জগতে ভস্তক হ্রদ তার রহস্য বুকে নিয়েই অপেক্ষা করছে। মানবজাতি কি প্রস্তুত সেই রহস্যের মুখোমুখি হতে? 

আরও পড়ুন

×