ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্লাস্টিকের দুর্গ

বর্জ্য থেকে অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম

বর্জ্য থেকে অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম
×

পানামার ‘বোকাস দেল তোরো’ দ্বীপপুঞ্জে প্লাস্টিক বোতলের দুর্গ

শাহেরীন আরাফাত

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কানাডা থেকে পানামায় বাস করতে আসা এক ব্যক্তি পৃথিবীকে অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যের হাত থেকে রক্ষা করার ব্রত নেন। তিনি পানামার মানুষকে উদ্বুদ্ধ করলেন সেই অঞ্চলের রাস্তাঘাট আর চমৎকার সব সমুদ্রসৈকত থেকে হাজার হাজার পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে আনতে। সেই আবর্জনাকে তিনি অবিশ্বাস্য শিল্পকর্মে রূপ দেন। তৈরি করলেন এক বিশাল প্লাস্টিকের দুর্গ, যা আজ ক্যারিবিয়ান সাগরের কাছে সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। এটি কোনো রূপকথার গল্প নয়; মন্ট্রিয়লের বাসিন্দা রবার্ট বেজেউর জীবনের এক বাস্তব কীর্তি। যথার্থ কারণেই তাঁকে ডাকা হয় ‘প্লাস্টিক কিং’ বা প্লাস্টিকের রাজা নামে। 

২০১২ সালের কথা। রবার্ট তখন পানামার ‘বোকাস দেল তোরো’ দ্বীপপুঞ্জের ‘ইসলা কোলোনে’ বসবাস করতেন। তিনি কাজ করতেন ‘বোকাস রিসাইক্লিং প্রোগ্রাম’-এর সঙ্গে, যাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশটির সৈকত ও জনপদ আবর্জনামুক্ত রাখা। দেড় বছর কাজ করার পর এই কানাডিয়ান ভদ্রলোক আঁতকে উঠলেন। দেখলেন, এই অল্প সময়েই তারা ১০ লাখেরও বেশি প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করেছেন; যা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্যের বিশাল এক স্তূপে পরিণত হচ্ছিল।

এই দূষণ কমানোর জন্য তাঁর মাথায় এলো এক অদ্ভুত বা বুনো পরিকল্পনা। তিনি ভাবলেন, বোতলগুলো রিসাইক্লিং বা প্রক্রিয়াজাত না করে যদি সরাসরি এগুলো ব্যবহার করা যায়? যদি এগুলো দিয়ে এমন বিশাল কোনো কাঠামো তৈরি করা যায়, যা মানুষের বাসস্থানের কাজে লাগবে। একই সঙ্গে এটি মানবসৃষ্ট বর্জ্য ও পরিবেশবান্ধব সমাধানের এক স্মৃতিস্তম্ভ হয়ে দাঁড়াবে?
এই ভাবনা থেকেই জন্ম নিল প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি বিশ্বের বৃহত্তম দুর্গ–চারতলাবিশিষ্ট, ৪৬ ফুট (১৪ মিটার) উঁচু ‘কাস্তিলো ইনস্পিরেশিওন’। অবিশ্বাস্য এই দুর্গ তৈরি করতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার প্লাস্টিকের বোতল।

২০২২ সালের গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস সংস্করণে রবার্ট বলেন, ‘প্রথমে দ্বীপের বাসিন্দা এবং কর্মকর্তারা ভেবেছিলেন আমি পাগল হয়ে গেছি, এমনকি আমার স্ত্রী ও ছেলেও তাই ভেবেছিল! তারপর তাদের কৌতূহল জাগল এবং তারা দেখতে চাইল আমি আসলে কী করতে যাচ্ছি। দালানটি যত বড় হতে থাকল, তাদের আগ্রহও তত বাড়তে থাকল।’
ধীরে ধীরে ভবনটি রূপ নিতে শুরু করল। কংক্রিট এবং ইস্পাতের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে রবার্ট এবং তাঁর দল বোতলগুলোকে ব্যবহার করলেন ‘ইকো বিল্ডিং মেটারিয়াল’ বা পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী হিসেবে। বোতলগুলো ইনসুলেশন বা তাপনিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং দুর্গটিকে রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। প্লাস্টিকের এই ব্যবহার দুর্গটিকে এমন এক অনন্য নান্দনিকতা দিয়েছে, যা দেখতে অনেকটা রঙিন কাচের মতো মনে হয়।
নির্মাণকাজের স্মৃতিচারণা করে রবার্ট বলেন, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, আমাদের কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা নকশা ছিল না। আমরা প্রতিদিন নতুন করে ভাবতাম আর কাজ এগোতাম। এভাবে আমরা চারতলা পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম!’

সব মিলিয়ে দুর্গের মধ্যে রয়েছে চারটি গেস্ট রুম বা অতিথি কক্ষ, একটি ভোজের স্থান এবং ছাদে একটি ভিউয়িং প্ল্যাটফর্ম বা দেখার জায়গা। এ ছাড়াও উৎসুক দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতামূলক নানা শিক্ষামূলক উপকরণ। প্রকল্পজুড়ে রবার্ট ‘রিসাইক্লিং’-এর চেয়ে পিইটি প্লাস্টিকের ‘আপসাইক্লিং’-এর ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। আপসাইক্লিং মানে হলো প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন না করে সেটিকে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পুনরায় ব্যবহার করা। রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় অনেক সময় প্লাস্টিকের ফাইবার বা তন্তু বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করে ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু আপসাইক্লিং বর্জ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। রবার্ট বলেন, ‘একজনের কাছে যা আবর্জনা, অন্যের কাছে তা প্রাসাদ। উল্কাপাতের কারণে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়েছিল, আর মানবজাতি বিলুপ্ত হবে প্লাস্টিকের কারণে।’

দুর্গটি নির্মাণের কয়েক বছর পর, রবার্ট তাঁর টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য ‘এনার্জি গ্লোব অ্যাওয়ার্ড’ পান। তবে পুরস্কার পেয়েই তিনি থেমে যাননি। ২০২১ সালে তিনি তাঁর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করেন এবং গড়ে তোলেন আস্ত এক প্লাস্টিক বোতলের গ্রাম। বোকাস দেল তোরো দ্বীপপুঞ্জ থেকে সংগৃহীত বর্জ্য দিয়েই এই গ্রামের অন্য ভবনগুলো তৈরি করা হয়েছে। এই ঘরগুলোতেও বোতলগুলো তাপনিরোধক হিসেবে কাজ করে এবং কংক্রিটের প্রলেপে আবৃত থাকায় বসবাসকারীরা আবহাওয়া থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকেন। রবার্ট তাঁর দুর্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন এক বিশাল অন্ধকূপ বা ডানজিয়ন। দেড় হাজার বর্গফুট আয়তনের এই অন্ধকূপ লম্বায় ১২ ফুট। মজার ব্যাপার হলো, অন্ধকূপটি ১০ হাজার প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি এবং এতে ছয়টি ‘সেল’ বা কক্ষ রয়েছে। এখানে ১৬ জন অতিথি (বা কয়েদি!) থাকতে পারেন। রূপক অর্থে, যারা এখানে থাকবেন তারা তাদের ‘প্লাস্টিক বর্জ্যসংক্রান্ত অপরাধের’ জন্য অনুশোচনা করবেন এবং প্লাস্টিকের কারাগারে ‘সাজা খাটার’ পর নিজেদের ভোগ ও ব্যবহারের অভ্যাস পরিবর্তনের শপথ নেবেন।

২০২২ সাল পর্যন্ত রবার্টের হিসাবে, পুরো গ্রামটি তৈরি করতে প্রায় দুই লাখ প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার করা হয়েছে, যা স্থানীয় পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে। রবার্ট বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের প্যাকেজিং বা মোড়কজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য রাজি করাতে হবে। এটি কীভাবে সম্ভব–আমরা একটি পিইটি বোতল থেকে মাত্র আট মিনিট ধরে পানি পান করি, আর তারপর সেটিকে প্রকৃতিতে ফেলে দিই, যা ধ্বংস হতে ৮০০ বছর সময় নেয়?’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যদি বোতলগুলো এমনভাবে তৈরি করা হতো, যাতে একটার সঙ্গে আরেকটা যুক্ত করা যায়, তবে আমরা এগুলো দিয়ে অনায়াসেই নানা ধরনের কাঠামো তৈরি করতে পারতাম। সেটি বেঞ্চ, টেবিল, স্টোরেজ বক্স কিংবা কুকুরের ঘর– যে কোনো কিছুই হতে পারত।’ 

সৌজন্যে: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
 

আরও পড়ুন

×