মৌলভীবাজারের শাহ মোস্তফার মেলা
শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৬ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাঘের হাড়কাঁপানো শীত। কুয়াশার চাদর মুড়ি দেওয়া প্রকৃতি। ঠিক এমন সময়েই মৌলভীবাজার শহর জেগে ওঠে এক ভিন্ন আমেজে। শহরের বেরির পাড় এলাকা মুখরিত হয়ে ওঠে হাজারো মানুষের পদচারণায়, বাতাসে ভাসে নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর জিলাপি ভাজার ঘ্রাণ। উপলক্ষ– উপমহাদেশের প্রখ্যাত সুফিসাধক হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা শেরে সওয়ার চাবুকমার (র.)-এর বার্ষিক ওরস ও ঐতিহ্যবাহী মেলা। প্রায় সাত সাতশ বছর ধরে চলে আসা এই মেলা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং সিলেট বিভাগের লৌকিক সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য মিলনমেলা।
মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে হজরত সৈয়দ শাহ মোস্তফা (র.)-এর নাম। তিনি ছিলেন হজরত শাহ জালাল (র.)-এর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম সহচর। আধ্যাত্মিক মহিমায় ভাস্বর এই সাধক পরিচিত ছিলেন ‘শেরে সওয়ার চাবুকমার বোগদাদী’ নামে। জনশ্রুতি রয়েছে, তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে এবং হাতে সাপকে চাবুক হিসেবে ব্যবহার করে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই জনপদে এসেছিলেন।
প্রতি বাংলা সনের ১ মাঘ তাঁর ওরস পালিত হয়। মিলাদ মাহফিল, জিকির ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ওরসের আনুষ্ঠানিকতা। এ বছর পালিত হলো তাঁর ৬৮৫তম ওরস। এই দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করে ভক্তি, শ্রদ্ধা আর লৌকিক আচারের যে সংমিশ্রণ ঘটেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এই মেলা।
শাহ মোস্তফা রোডসংলগ্ন বেরি লেকের পাড়। মাজার শরিফকে কেন্দ্র করে প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসে এই মেলা। যদিও মেলাটি তিন দিনব্যাপী হওয়ার কথা। এর রেশ থাকে চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত। মেলার কয়েকদিন আগে থেকেই স্থানীয়দের মুখে মুখে ফেরে–‘বেরির পাড় মেলা বইছে’।
মৌলভীবাজার শহর তো বটেই, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা এবং দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ভক্ত-আশেকান ও ব্যবসায়ীরা এখানে সমবেত হন। মেলা উপলক্ষে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। শহরের যান্ত্রিকতা ভুলে মানুষ এখানে খুঁজে পায় গ্রামীণ আবহ।
মেলার মাঠে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। সারি সারি দোকান আর তাতে সাজানো হরেক রকমের পণ্য। একদিকে মুড়ি-মুড়কি, খৈ-উখড়া, তিলুয়া-বাতাসা, কদমা, নিমকি, আর গরম জিলাপির সুবাস; অন্যদিকে শিশুদের কোলাহল। মেলায় পাওয়া যায় নাড়ু, কটকটি, চটপটি, ঢ্যাপের মোয়া ও তিলের নাড়ুর মতো ঐতিহ্যবাহী সব খাবার। তবে মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মৃৎশিল্প বা মাটির তৈরি সামগ্রী। রাজবাড়ী, মুন্সীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মৃৎশিল্পীরা তাদের নিপুণ হাতে গড়া সম্ভার নিয়ে আসেন।
রাজবাড়ী থেকে আসা মৃৎশিল্পী বিকাশ পাল তাঁর মাটির পুতুলের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। তাঁর দোকানে মিলছে হাতি, ঘোড়া, ফুল, পাখি ও নানা ধরনের টেপা পুতুল। উজ্জ্বল রঙে রাঙানো এ পুতুলগুলো শিশুদের তো বটেই, বড়দেরও শৈশবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। প্রতিটি পুতুলের দাম ১০ থেকে ৩০ টাকার মধ্যে।
বিকাশ পাল বলেন, ‘বহু প্রাচীন এই মেলা। প্রায় ৩০ বছর ধরে আমি নিয়মিত এখানে আসি। বিক্রিবাট্টাও বেশ ভালো হয়। মানুষ আগ্রহ নিয়ে মাটির জিনিস কেনেন।’
পাশেই মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা আরেক বিক্রেতা বসেছেন গৃহস্থালি মাটির সামগ্রী নিয়ে। হাঁড়ি-পাতিল, সরা, ব্যাংক, শোপিস–কী নেই সেখানে! মাঘের পড়ন্ত বিকেলে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন সোনালি আভায় মেলা প্রাঙ্গণ এক মায়াবী রূপ ধারণ করে।
এই মেলা কেবল কেনাকাটার জায়গা নয়, এটি স্মৃতি রোমন্থনেরও এক উপলক্ষ। মেলায় আসা ৬৫ বছর বয়সী প্রবীণ আব্দুল খালিক বলেন, ‘আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি এই মেলার কথা। এটি বহু প্রাচীন মেলা। এ এলাকায় এত বড় মেলা আর কোথাও হয় বলে আমি জানি না। ছোটবেলায় কত মেলা দেখেছি, এখন তো আর তেমন মেলা হয় না। তাই এখানে এলে নস্টালজিক হয়ে পড়ি।’
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই মেলা টিকে আছে স্থানীয় মানুষের ভালোবাসায়। স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হকের মতে, ‘এই মেলার আয়োজন ও ব্যাপ্তি অন্য যেকোনো মেলার চেয়ে বিশাল। মেলা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে দাওয়াত দেওয়া হয়, দেখা-সাক্ষাৎ হয়। এটি আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের হৃৎস্পন্দন।’
শাহ মোস্তফার মেলা গ্রামীণ কুটিরশিল্প ও কারিগরদের জন্য এক বড় আশীর্বাদ। বাঁশ-বেতের তৈরি কুলা, ডালা, চালুন, হাতপাখা থেকে শুরু করে কাঠের আসবাব, লোহার দা-বঁটি– সবই পাওয়া যায় এখানে। প্রান্তিক উদ্যোক্তারা সারাবছর অপেক্ষা করেন এ সময়ের জন্য। হাজার হাজার মানুষের সমাগমে যে অর্থনৈতিক লেনদেন হয়, তা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে।
দিন শেষে শাহ মোস্তফার মেলা কেবল পণ্য বেচাকেনার হাট নয়, এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষ এখানে এক কাতারে মিশে যায়।
নাগরদোলার দোলানি, শিশুদের বাঁশির শব্দ আর আধ্যাত্মিক গানের সুর–সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বেরির পাড়ে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক লোকজ ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসলেও, শাহ মোস্তফার মেলা স্বমহিমায় টিকে আছে এবং ভবিষ্যতেও এই জনপদের মানুষের প্রাণে প্রশান্তির সুবাতাস ছড়িয়ে যাবে–এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
লেখক: ঐতিহ্য সংগ্রাহক
