ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গ্রিনল্যান্ডের মানুষের জীবন

গ্রিনল্যান্ডের মানুষের জীবন
×

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:১৭ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৯:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ব মানচিত্রের একেবারে উত্তরে তাকালে চোখে পড়ে এক বিশাল সাদা ভূখণ্ড। নাম তার গ্রিনল্যান্ড। উত্তর মেরুর খুব কাছে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে দূর থেকে কেবল বরফের এক নিথর মরুভূমি মনে হতে পারে। কিন্তু সেই শ্বেতশুভ্র বরফের নিচে চাপা পড়ে আছে ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ক্ষমতার এক আগ্নেয়গিরি। লিখেছেন রফিকুর রহমান প্রিয়াম
----------------------------------------------------------

বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরের এই দ্বীপটি আজ আর কেবল এস্কিমোদের বরফের দেশ নয়, বরং একুশ শতকের পরাশক্তিগুলোর দাবার ছকের কেন্দ্রবিন্দু। আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপের ৮০ শতাংশই সারাবছর থাকে বরফের নিচে; যার নিচে চাপা পড়া ট্রিলিয়ন ডলারের খনিজসম্পদ, যা বদলে দিতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির গতিপথ। একইসঙ্গে দ্বীপটি হয়ে উঠেছে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়ংকর মানদণ্ড।

গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে, খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের দিকে কানাডার এলসমিয়ার দ্বীপ থেকে প্রথম মানুষের পা পড়ে এই তুষাররাজ্যে। এরপর শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন সভ্যতার উত্থান-পতন দেখেছে এই দ্বীপ। ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ‘আর্লি ডরসেট’ জনগোষ্ঠী এখানে বসতি গড়ে। তবে গ্রিনল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায়টি শুরু হয় ভাইকিংদের আগমনের মাধ্যমে। ৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ভাইকিং নেতা এরিক দ্য রেড এখানে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বসতি স্থাপন করেন। পরে ১০০০ থেকে ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে আর্কটিক কানাডা থেকে ‘থুলে’ জনগোষ্ঠী (বর্তমান ইনুইটদের পূর্বপুরুষ) এখানে আসে এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। রহস্যজনকভাবে পনেরো শতকে ভাইকিংরা বিলুপ্ত হয়ে যায়। টিকে থাকে কেবল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা ইনুইটরা। তাদের হাত ধরেই তৈরি হয় বিখ্যাত ‘কায়াক’ নৌকা ও স্লেজ গাড়ির সংস্কৃতি। 
রাজনৈতিকভাবে গ্রিনল্যান্ড ১৮১৪ সালে ডেনমার্কের কলোনি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৫৩ সালে এটি ডেনমার্কের একটি প্রদেশে পরিণত হয় এবং দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০০৯ সালে লাভ করে ‘সেলফ গভর্ন্যান্স’ বা ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা ছাড়া বাকি সব বিষয়ে গ্রিনল্যান্ড এখন অনেকটাই স্বাধীন।

হাড়কাঁপানো শীতে জীবনযুদ্ধ
মাত্র ৫৬ হাজার মানুষের দেশ গ্রিনল্যান্ড। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব এতই কম, একে বিশ্বের অন্যতম জনবিরল অঞ্চল বলা চলে। এখানকার আদি বাসিন্দা ইনুইট বা এস্কিমোরা প্রকৃতির সন্তান। মেরু ভালুক, বল্গা হরিণ আর সিলের চামড়া দিয়ে তৈরি পোশাক পরেই তারা মোকাবিলা করে হিমাঙ্কের নিচে থাকা তাপমাত্রা।
গ্রিনল্যান্ডের জীবনযাত্রা অদ্ভুত রকমের বৈপরীত্যে ভরা। একদিকে রাজধানী নুক; যেখানে শপিং মল, ক্যাফে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। অন্যদিকে প্রত্যন্ত গ্রাম বা সেটেলমেন্ট; যেখানে জীবন এখনও প্রকৃতির খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল।

নুক শহরে আবাসন সংকট প্রকট। একটি সরকারি ফ্ল্যাট পাওয়ার জন্য মানুষকে ১০ বছর থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। ফলে বাধ্য হয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হয় অনেককে। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় এখানে আকাশচুম্বী। যেহেতু প্রায় সব খাবার ও নিত্যপণ্য ডেনমার্ক থেকে আমদানি করতে হয়, তাই এক লিটার দুধের দাম এখানে ২০০-২৫০ টাকা (বাংলাদেশি মুদ্রায়)। ইন্টারনেট খরচও বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ। মাসে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ টাকা গুনতে হয় কেবল সংযোগ সচল রাখতে। তবুও ইনুইটদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে। বরফের তৈরি ইগলু এখন শুধুই ঐতিহ্য। তারা এখন কাঠ ও পাথরের বাড়িতে থাকে, স্লেজ কুকুরের বদলে স্নো-মোবাইল ব্যবহার করে এবং শিকারের পাশাপাশি খনি ও তেলক্ষেত্রে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছে।

মাটির নিচে ‘আধুনিক প্রযুক্তির খনি’
গ্রিনল্যান্ডকে কেন বলা হচ্ছে ‘আধুনিক প্রযুক্তির খনি’? কারণ আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এর বরফের নিচে। ১. রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট: স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, মিসাইল গাইডেন্স সিস্টেম কিংবা উইন্ড টারবাইন– সব তৈরির জন্য ১৭টি বিশেষ খনিজ উপাদানের প্রয়োজন হয়। গ্রিনল্যান্ডে এই উপাদানের এত বিশাল মজুত রয়েছে, তা একাই বিশ্বের ২৫ শতাংশ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। ২. রত্নপাথর ও মূল্যবান ধাতু: এখানকার সোনা, দস্তা, সিসা এবং লোহার ভান্ডার বিশাল। আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, এখানকার রুবি (চুনি) এবং স্যাফায়ার (নীলা) প্রায় ২৯০ কোটি বছরের পুরোনো। ৩. জ্বালানি সম্পদ: ধারণা করা হয়, গ্রিনল্যান্ডের উপকূলে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ব্যারাল তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে। ৪. তেজস্ক্রিয় পদার্থ: কুয়ানের সুইট এলাকায় বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ইউরেনিয়াম মজুত এবং ইলিমাউসাক এলাকায় বিশাল থোরিয়াম ভান্ডার রয়েছে, যা ভবিষ্যতের পারমাণবিক শক্তির উৎস হতে পারে।
এ ছাড়া বরফগলা পানির তীব্র স্রোতকে কাজে লাগিয়ে গ্রিনল্যান্ড তার বিদ্যুতের সিংহভাগ উৎপাদন করে, যা তাকে পরিবেশবান্ধব শক্তির এক রোল মডেলে পরিণত করেছে।

কৌশলগত গুরুত্ব
ভূগোল গ্রিনল্যান্ডকে দিয়েছে এক অনন্য কৌশলগত সুবিধা। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের ওপর এর অবস্থান এমন, যেখান থেকে আমেরিকা, ইউরোপ এবং রাশিয়ার ওপর নজরদারি করা সম্ভব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্ব বুঝতে পারে। ১৯৫১ সালের প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় এখানে গড়ে তোলা হয় ‘পিটুফিক স্পেস বেস’ (পূর্বতন থুলে বিমান ঘাঁটি)। এখান থেকেই আমেরিকার মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম পরিচালিত হয় এবং রাশিয়ার দিক থেকে ধেয়ে আসা যে কোনো হুমকি শনাক্ত করা হয়। 
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরুর বরফ গলে নতুন নতুন সামুদ্রিক পথ (যেমন–নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ) উন্মুক্ত হচ্ছে। এই পথ এশিয়া ও ইউরোপের বাণিজ্যিক দূরত্ব ৪০-৫০ শতাংশ কমিয়ে দেবে। ফলে পানামা বা সুয়েজ খালের বিকল্প হিসেবে এই রুট ভবিষ্যতে বিশ্ব বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশ সংযোগ
গ্রিনল্যান্ড বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে হলেও, আমাদের ভাগ্য এক সুতোয় গাঁথা। গ্রিনল্যান্ড হলো বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ‘ব্যারোমিটার’। ১৯৯৮ সাল থেকে প্রতিবছর এখানকার বরফ গলে যাচ্ছে এবং গত ২৫ বছরে এই হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, গ্রিনল্যান্ডের সব বরফ যদি গলে যায়, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৭ মিটার বা ২৩ ফুট বেড়ে যাবে। এর ফলাফল বাংলাদেশের মতো বদ্বীপ রাষ্ট্রের জন্য হবে ভয়াবহ। উপকূলীয় এলাকা লবণপানির নিচে তলিয়ে যাবে। সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ ধ্বংস হয়ে যাবে এবং কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। আটলান্টিকে বরফ গলা মিঠাপানি মিশে সমুদ্রের লবণের ঘনত্ব কমিয়ে দিচ্ছে, যা বিশ্বব্যাপী সমুদ্রস্রোত ও আবহাওয়া ব্যবস্থাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।

ভূ-রাজনীতির দাবানল ও আমেরিকার আগ্রাসী দৃষ্টি
২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেনমার্কের কাছে গ্রিনল্যান্ডকে ‘কিনে নেওয়ার’ প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড সেই প্রস্তাবকে ‘অবাস্তব’ বলে উড়িয়ে দিলেও, ভূ-রাজনীতির মাঠে আমেরিকা হাল ছাড়েনি। আর্কটিক অঞ্চলে চীন ও রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে আমেরিকা গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ চায়। আগামীতে এই অঞ্চলটি নিয়ে উত্তেজনা বাড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে হলেও এই বরফশীতল দ্বীপটি দখলে রাখতে চাইবে। প্রকৃতির এই দান শেষ পর্যন্ত মানবজাতির কল্যাণে আসবে, নাকি লোভের যূপকাষ্ঠে বলি হবে–সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

×