বিরতি মানেই শেষ নয়...
ফরায়েজী বিন্তি ফেরদৌস
জিয়া হাসান
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩১ | আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৪৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারীর কর্মজীবনের পথটা সবসময় সরলরেখায় চলে না। কখনও সংসার, কখনও মাতৃত্ব, আবার কখনও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রয়োজনে সেই গতিপথে সাময়িক ছেদ পড়ে। আমাদের সমাজে এই ‘বিরতি’ বা ‘ক্যারিয়ার গ্যাপ’কে অনেক সময় নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হয়। অনেকেই ভাবেন, একবার থমকে যাওয়া মানেই বুঝি সব শেষ। এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন অনেকেই; তাদেরই একজন ড. ফরায়েজী বিন্তি ফেরদৌস। বর্তমানে তিনি ‘কাজী কনসালট্যান্স’-এর প্রোগ্রাম ডিরেক্টর এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ইভালুয়েশন স্পেশালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর এই কর্মস্থলে ফিরে আসার গল্প কেবল সাফল্যের নয়, বরং গভীর আত্মোপলব্ধি ও সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলে নেওয়ার সাহসিকতার গল্প।
ড. ফরায়েজী মনে করেন, ক্যারিয়ারে বিরতি নেওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়, বরং এটি অনেক সময় আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। দীর্ঘ কর্মজীবনে মানুষ অনেক সময় একঘেয়েমিতে আক্রান্ত হয়, নিজের অজান্তেই আটকে পড়ে একটি ‘কমফোর্ট জোন’-এ। তাঁর মতে, ‘বিরতি আমাদের সেই বৃত্ত ভেঙে নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। এটি নিজেকে পুনরায় আবিষ্কার করার সময়।’
প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের বেড়াজালে ড. ফরায়েজীকে ছয় মাসের বাধ্যতামূলক বিরতিতে যেতে হয়েছিল। নানা প্রতিকূলতায় সেই বিরতি দীর্ঘ হলেও তিনি হতাশ হননি। বরং সেই সময়টিকে কাজে লাগিয়েছেন নিজেকে শাণিত করতে, যা তাঁকে কর্মক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
দীর্ঘ বিরতির পর কর্মক্ষেত্রে ফেরার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো–পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া। ড. ফরায়েজীর মতে, আজকের যুগে আধুনিক প্রযুক্তির জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
কেউ যদি পাঁচ বছর আগে কাজ ছেড়ে থাকেন, তবে মনে রাখতে হবে–পাঁচ বছর আগের কর্মপরিবেশ আর বর্তমান পরিস্থিতি এক নয়। নতুন বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা যুক্ত করে সিভি আপডেট করতে হবে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে কেবল পুরোনো অভিজ্ঞতা দিয়ে টিকে থাকা কঠিন। তাই বিরতির সময়ে বসে না থেকে ছোট ছোট কোর্স করা, নতুন সফটওয়্যার শেখা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। এটিই একজন পেশাজীবীকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখে।
বিরতির সময়টিতে অনেকেই আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভোগেন। ড. ফরায়েজী জোর দিয়েছেন মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। অবশ্যই নেতিবাচক চিন্তা দূরে রাখতে হবে। আমাদের সমাজে পুরুষদের ওপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্বের চাপ বেশি থাকায় তারা অনেক সময় ক্যারিয়ারে ঝুঁকি নিতে ভয় পান। আবার অনেকের ক্ষেত্রে অনেক আগে থেকেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। তবে সুযোগ ও সময় সম্ভব হলে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নিজেদের পছন্দমতো সৃজনশীল বা গবেষণাধর্মী কাজ বেছে নিতে পারেন।
ড. ফরায়েজী বিসিএস ক্যাডার বা বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ‘পদবি’র মোহে আটকাননি। তিনি খুঁজেছেন কাজের সার্থকতা। দিনশেষে নিজের কাজের প্রতি তৃপ্তি এবং মানসিক প্রশান্তি তাঁর কাছে বেশি জরুরি। তবে তাঁর এই ফিরে আসার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি উদ্যোগ হলো ওয়াটারএইড বাংলাদেশের ‘উইমেন্স রিটার্নশিপ’ প্রোগ্রাম। এটি মূলত কর্মবিরতিতে থাকা মধ্যম পর্যায়ের নারী পেশাজীবীদের পুনরায় কর্মজীবনে ফিরিয়ে আনার একটি রূপান্তরমূলক প্রয়াস। মেন্টরশিপ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার কোচিংয়ের মাধ্যমে এ কর্মসূচি নারীকে শুধু কাজেই ফেরাচ্ছে না; বরং নেতৃত্বের ভূমিকায় প্রস্তুত করছে।
ক্যারিয়ারে বিরতি নেওয়া মানেই পেশাজীবনের সমাপ্তি নয়। সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সঙ্গে সখ্য এবং ইতিবাচক মানসিকতা থাকলে এই বিরতিই হতে পারে আরও বড় কোনো সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর। ড. ফরায়েজী বিন্তি ফেরদৌস আজ সেই মানুষদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা বিরতি শেষে নতুন করে নিজেদের প্রমাণ করতে প্রস্তুত। মনে রাখতে হবে, থেমে যাওয়ার নাম জীবন নয়; বরং নতুন করে শুরু করতে পারার নামই জীবন।
- বিষয় :
- নারী
- কর্মবিরতি
- কর্মজীবী নারী
