মেছোবিড়ালের বন্ধু বখতিয়ার মাস্টার
মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ | ২০:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মেছোবিড়াল বাঘের মতো একটু দেখতে বলে এ প্রাণীর জীবন সবসময় সংকটে থাকে। বাঘ ভেবে মানুষ একে হত্যা করে। প্রাণীটি দেখতে অনেকটা বাঘের মতো, গায়ে ডোরাকাটা দাগ–তাই অজ্ঞতাবশত মানুষ এর নাম দিয়েছে ‘মেছোবাঘ’। এই ‘বাঘ’ শব্দটিই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাণীটির জন্য। তবে চুয়াডাঙ্গার এক স্কুলশিক্ষক মো. বখতিয়ার হামিদ বিপুল এই ভুল ধারণা ভেঙে প্রাণীটিকে বাঁচাতে একাই লড়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। তাঁর মতে, মেছোবিড়াল পরিবেশ ও প্রকৃতির জন্য এক অনন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী। খাদ্যশৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করে তারা।
মানুষের ভুল বোঝার অন্যতম কারণ– মেছোবিড়ালের গায়ে চোঙা বা টিকের মতো কালচে দাগ থাকে, যা অনেকটা ছোট চিতাবাঘের মতো। গালের পাশে হলদে-সাদা ছোপ এদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এদের শরীরে দুই স্তরের পশম থাকে–একটি রুক্ষতা প্রতিরোধ করে, অন্যটি পানিতে নামলে শরীর শুকনো রাখতে সাহায্য করে।
চুয়াডাঙ্গা সদরের গাইদঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বখতিয়ার হামিদের জীবনের মোড় ঘুরে যায় চার বছর আগের এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাতে। বেলগাছির বকচর বিলে কৃষকরা একটি মা মেছোবিড়ালকে তার ছানাসহ দেখতে পান। গ্রামবাসীর চোখে তখন শুধুই আতঙ্ক– ‘বাঘের বাচ্চা!’
কালবৈশাখীর সেই রাতে মা বিড়ালটি তার দুটি ছানাকে সরাতে পারলেও, একটি ছানা ঝড়ের কবলে পড়ে যায়। খবর পেয়ে বখতিয়ার ছুটে যান। প্রবল ঝড়-বৃষ্টি আর অন্ধকারের মধ্যে তিনি ভেজা কাঁপা কাঁপা ছানাটিকে উদ্ধার করেন। সেই রাতে প্রাণীটির অসহায় চাহনি বখতিয়ারের হৃদয়ে এক গভীর দাগ কেটে যায়।
ভোররাত ৪টার দিকে তিনি ছানাটিকে সেই জায়গায় রেখে আসেন, যেখানে মা বিড়ালটির আসার সম্ভাবনা ছিল। পরদিন সকালে গিয়ে দেখেন ছানাটি নেই–মা এসে তাকে নিয়ে গেছে। প্রকৃতির এই নীরব মিলনদৃশ্য বখতিয়ারের চোখে আনন্দাশ্রু এনে দেয়। সেই থেকেই শুরু হয় তাঁর এক নতুন সংগ্রাম–প্রকৃতির এই সন্তানদের বাঁচানোর সংগ্রাম।
মেছোবিড়াল সংরক্ষণে বখতিয়ার গড়ে তুলেছেন ‘পানকৌড়ি’ নামের একটি সংগঠন। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি প্রায় ৪০টি মেছোবিড়াল উদ্ধার ও অবমুক্তকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে ২০টি তিনি সশরীরে উদ্ধার করেছেন বেলগাছি, গাংনী, মেহেরপুর, দর্শনা, আলমডাঙ্গা ও দামুড়হুদা এলাকা থেকে। এমনকি প্রযুক্তির সহায়তায় ভার্চুয়ালি নির্দেশনা দিয়েও তিনি দূর-দূরান্তে উদ্ধারকাজে সহায়তা করেছেন।
বখতিয়ার শুধু উদ্ধারই করেন না, আহত প্রাণীগুলোর চিকিৎসাও নিশ্চিত করেন। সড়ক দুর্ঘটনায় চোয়াল ভেঙে যাওয়া কিংবা মানুষের আঘাতে নিউরোলজিক্যাল সমস্যায় ভোগা মেছোবিড়ালকে তিনি খুলনা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহায়তায় অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি সার্জন দিয়ে সুস্থ করে তুলেছেন।
বখতিয়ারের মতে, মেছোবিড়াল হত্যার প্রধান কারণ তিনটি– ১. ভুল পরিচয়: বাঘ ভেবে ভয় পাওয়া। ২. অজ্ঞতা: এটি যে পরিবেশের বন্ধু, তা না জানা। ৩. মিডিয়া ও লোকদেখানো বীরত্ব: সামাজিক মাধ্যমে নিজেকে ‘বাঘ শিকারি’ হিসেবে জাহির করার প্রবণতা।
তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘মেছোবিড়াল কখনোই মানুষকে অযথা আক্রমণ করে না। উল্টো মানুষ দেখলে এরা ভয়ে গুটিশুটি মেরে থাকে বা পালিয়ে যায়। অথচ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে এদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং হত্যার পর গাছে ঝুলিয়ে উল্লাস করে।’
বর্তমানে বখতিয়ারের সংগঠন ‘পানকৌড়ি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগ, বন অধিদপ্তর এবং আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় মেছোবিড়াল নিয়ে গবেষণা ও ক্যামেরা ট্র্যাপিং কার্যক্রম চালাচ্ছে। তিনি বিশ্বাস করেন, সঠিক তথ্য ও জনসচেতনতাই পারে এই প্রাণীটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে।
বখতিয়ার হামিদ স্বপ্ন দেখেন, পাঠ্যপুস্তকে মেছোবিড়ালের সঠিক তথ্য যুক্ত হবে, ডাকটিকিট বা টাকায় এর ছবি থাকবে; যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই একে ভালোবাসতে শেখে। জলাভূমি সংরক্ষণ আর মানুষের একটু সহনশীলতাই পারে মেছোবিড়ালকে প্রকৃতির কোলে বাঁচিয়ে রাখতে।
বখতিয়ার মাস্টারের মতো মানুষরাই আমাদের মনে করিয়ে দেন–প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে আর তাদের বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদেরই।
