ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

১৩ জমিদারের গ্রাম

১৩ জমিদারের গ্রাম
×

পাবনার বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া গ্রামের জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের বাড়ি

 জালাল উদ্দিন 

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাবনার বেড়া উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত হাটুরিয়া গ্রাম। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের পাতায় গ্রামটি দখল করে আছে এক অনন্য স্থান। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য–একসময় এ নিভৃত পল্লিতেই একসঙ্গে বসবাস করতেন ১৩ জন জমিদার। কেবল এ গ্রামেই নয়, বৃহত্তর পাবনা জেলার বাইরেও বিস্তৃত ছিল তাদের জমিদারি। ১৩ জন জমিদারের আবাসস্থল হওয়ায় শতবর্ষ আগে গ্রামটির জৌলুস ও ঐতিহ্য ছিল চমকে দেওয়ার মতো।

বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থায় হাটুরিয়াকে কিছুটা দুর্গম মনে হতে পারে, কিন্তু শত বছর আগে যমুনা নদী-তীরবর্তী এ গ্রামটি ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তখন নদীপথই ছিল যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। উনিশ শতকের শুরু থেকেই এ অঞ্চলটি ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি এবং ব্যবসায়িক সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে একপর্যায়ে প্রভাবশালী ও বিত্তশালীরা এখানে বসতি স্থাপন শুরু করেন।

বেড়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরের এই গ্রাম ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা প্রায় ১০০ বছর আগে বৃহত্তর পাবনা জেলার অন্যতম অভিজাত এলাকা এবং বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গণ্য হতো। যমুনাপারের এ গ্রামের খ্যাতি সুদূর কলকাতাতেও বিস্তৃত ছিল। গ্রামের পাশের নৌবন্দর ‘নাকালিয়া’ থেকে কলকাতার সঙ্গে সরাসরি স্টিমার চলাচল করত। নৌপথে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত ছিল অত্যন্ত সহজ। ফলে কেবল জমিদাররাই নন, অনেক সম্ভ্রান্ত ও বিত্তশালী ব্যক্তিও এখানে বসবাস করতেন এবং এখান থেকেই তাদের জমিদারি ও ব্যবসা পরিচালনা করতেন।
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি ও ইতিহাসবিদদের মতে, শুরুতে এ গ্রামে দুজন জমিদার বসতি স্থাপন করলেও কালক্রমে অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার এখানে চলে আসেন। ধীরে ধীরে নদীপারের এই গ্রামে গড়ে ওঠে বিশাল সব প্রাসাদ, মন্দির ও নানা প্রাচীন স্থাপনা। ১৯০০ সালের পর থেকে গ্রামটিতে জমিদারের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং একপর্যায়ে তা ১৩ জনে গিয়ে পৌঁছায়। ঐতিহাসিকদের মতে, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত (জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির আগ পর্যন্ত) এই ১৩ জন জমিদার হাটুরিয়ায় তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছিলেন।

এই ১৩ জন জমিদার হলেন–প্রমথনাথ বাগচী, কাঞ্চিনাথ বাগচী, উপেন্দ্রনাথ বাগচী, ভবানীচরণ বাগচী, কালীসুন্দর রায়, ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়, সুরেন চন্দ্র রায়, সুধাংশু মোহন রায়, শক্তিনাথ রায়, বঙ্কিম রায়, ক্ষুদিরাম পাল, যদুনাথ ভৌমিক ও যতীন্দ্রনাথ ভৌমিক।
জনশ্রুতি ও প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ১৯১৫ সালের পর থেকে এই জমিদারদের সরব উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা এ গ্রাম থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। আজ জমিদারি নেই, কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামটি ‘১৩ জমিদারের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখনও লোকমুখে ফেরে সেই জমিদারদের পাইক-পেয়াদার দাপট, জলসাঘরের গান কিংবা যমুনা নদীতে রাজাদের ভাসমান প্রমোদতরীর গল্প।

১৩ জমিদারের মধ্যে সবচেয়ে প্রজাবৎসল ছিলেন জমিদার প্রমথনাথ বাগচী; কিছুটা কঠোর বা প্রজাপীড়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন যদুনাথ ভৌমিক। তবে অবাক করা বিষয় হলো, একই গ্রামে এতজন জমিদার থাকলেও তাদের মধ্যে কখনও বড় ধরনের দ্বন্দ্ব বা সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন পূজা-পার্বণ ও উৎসবে তারা সবাই মিলেমিশে আনন্দ করতেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির পর এবং দেশভাগের আগে-পরে তারা একে একে স্থায়ীভাবে কলকাতায় পাড়ি জমান। দুই-একজন জমিদারের বংশধররা থেকে গেলেও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় তারাও দেশ ত্যাগ করেন। জমিদারদের চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অযত্ন আর অবহেলায় বিলীন হতে থাকে তাদের রেখে যাওয়া স্থাপনা, সম্পদ আর ঐতিহ্য।
জমিদারদের প্রত্যেকেই বাস করতেন প্রাচীরঘেরা সুরম্য অট্টালিকায়। বাড়ির পাশেই থাকত শানবাঁধানো পুকুর বা বিশাল দিঘি। সংস্কারের অভাবে অনেক পুকুর ভরাট হয়ে গেলেও এখনও পাঁচ-ছয়টি পুকুর টিকে আছে। যদিও দখল ও দূষণে সেগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। পুকুরের চেয়েও বেশি জরাজীর্ণ দশা অট্টালিকাগুলোর। কালের আবর্তে এবং মালিকানা বদলের পর অনেক স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে কালের সাক্ষী হিসেবে গ্রামে মাত্র দুই-তিনটি অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে। জরাজীর্ণ এসব ভবন এখন পরিত্যক্ত। তবে জমিদারদের অট্টালিকার কিছু অংশ ও জমি ‘অর্পিত সম্পত্তি’ হিসেবে ইজারা নিয়ে বর্তমানে অনেকে বসবাস করছেন।

সরেজমিন দেখা যায়, প্রাচীন সেই জৌলুসের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। জীর্ণশীর্ণ কিছু পুরোনো স্থাপনা দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। পলেস্তারা খসা বিশাল অট্টালিকা, শানবাঁধানো ঘাট, বাড়ির প্রবেশমুখে বাঘ-সিংহের পাথরের মূর্তি আর পুরোনো মন্দিরের স্মৃতিচিহ্নগুলো আজ ধ্বংসের মুখে। বেশির ভাগ অট্টালিকার জায়গায় গড়ে উঠেছে নতুন বসতি। এর মধ্যেও জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের সুদৃশ্য প্রধান ফটক ও ভবনটি কোনোমতে টিকে আছে। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ না নিলে কয়েক বছরের মধ্যেই এগুলো পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে।
অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে বংশপরম্পরায় বসবাস করছেন দীপক গোস্বামী (৫০)। তিনি বলেন, ‘একসময় আমরা জমিদারের ভবনে বাস করলেও এখন তা বসবাসের অনুপযোগী। তাই এর পাশেই ঘর তুলে থাকছি। অনেকেই জমিদারের প্রাচীন নিদর্শন দেখতে আসেন, কিন্তু ধ্বংসাবশেষ দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যান। শৈশবে আমি অট্টালিকার এক স্থানে এর নির্মাণকাল ১৯১১ সাল এবং নির্মাতা হিসেবে জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের পিতা উমেশ চন্দ্র রায়ের নাম খোদাই করা দেখেছিলাম। ছেলেবেলায় দেখা সেই সুপরিসর জলসাঘর ও কক্ষগুলো এখন শুধুই স্মৃতি।’
বেড়া মনজুর কাদের মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা মরহুম মমতাজ উদ্দিন সিরাজগঞ্জের চৌহালী এলাকার এক জমিদারের নায়েব ছিলেন। তাঁর কাছে হাটুরিয়ার জমিদারদের অনেক গল্প শুনেছি। আমি নিজেও কিছু তথ্য সংগ্রহ করছি। একই এলাকায় একসঙ্গে এতজন জমিদারের বসবাসের নজির দেশের অন্য কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই।’

স্থানীয় হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদ সরকার বলেন, ‘১৩ জমিদারের প্রাচীন নিদর্শনের অধিকাংশই বিলীন হয়ে গেছে। যতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করছি।’
এ বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর রাজশাহী ও রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের আওতাধীন শাহজাদপুর রবীন্দ্র কাচারিবাড়ির কাস্টোডিয়ান শাওলি তালুকদার জানান, ‘কোনো স্থাপনার বয়স ৯০ থেকে ১০০ বছর হলে তা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে গণ্য হতে পারে। আমরা ওই জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করে দেখব। যদি তা সংরক্ষণযোগ্য মনে হয়, তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে মতামত পাঠানো হবে এবং তার ভিত্তিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা বলেন, ‘হাটুরিয়া গ্রামে একসঙ্গে ১৩ জমিদারের বসবাসের বিষয়টি আমি অবগত হয়েছি। তাদের প্রাচীন নিদর্শনগুলো পরিদর্শন করে সংরক্ষণযোগ্য হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
সচেতন মহল মনে করে, ইতিহাস ও ঐতিহ্য থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দিতে এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো টিকিয়ে রাখা প্রয়োজন। দর্শনার্থীদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে ইতিহাসের সাক্ষী এ জনপদকে সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি এখন এলাকাবাসীর প্রাণের দাবি। 

আরও পড়ুন

×