ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

খনির অন্ধকার থেকে সৃজনের আলোয়

খনির অন্ধকার থেকে সৃজনের আলোয়
×

পেন্সিলের ইতিহাস নিয়ে এআই জেমিনি দিয়ে তৈরি স্কেচ

 এইচ বি রিতা

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

রোজকার জীবনে ডায়েরির পাতায় পেন্সিলের ডগা দিয়ে হিজিবিজি আঁচড় কাটার সময় কখনও কি মনে প্রশ্ন জাগে–অতি সাধারণ কাঠের টুকরোটি আমাদের হাতে এলো কীভাবে? আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও পেন্সিল আবিষ্কারের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে রোমাঞ্চকর উপন্যাসের মতোই এক অভাবনীয় ইতিহাস।

পেন্সিলের ইতিহাসের সূচনা ১৫৬৪ সালে। ইংল্যান্ডের কামব্রিয়ায় আঘাত হানা প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের তাণ্ডবে উপড়ে পড়ে একটি বিশাল প্রাচীন গাছ। গাছটির শিকড়সংলগ্ন মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে এক আশ্চর্য কালো ও চকচকে খনিজ পদার্থ। শুরুতে স্থানীয়রা একে কয়লা ভাবলেও অবাক হয়ে দেখল এটি আগুনে পোড়ে না; বরং মসৃণ কোনো তলে ঘষলে চমৎকার গাঢ় কালো দাগ কাটে। সেটিই ছিল মানবেতিহাসে আবিষ্কৃত প্রথম এবং বিশুদ্ধতম গ্রাফাইটের খনি।
রহস্যময় খনিজ আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেয়। সে যুগে একে ‘প্লাম্বাগো’ বা ‘কৃষ্ণ সিসা’ বলা হতো। যদিও কামব্রিয়ার কৃষকদের কাছে এর স্থানীয় নাম ছিল ‘ওয়াড’। তখনকার মানুষ জানতই না যে এই বস্তু মূলত কার্বনেরই একটি রূপ। বিশাল পাহাড়ি চারণভূমিতে নিজেদের ভেড়ার পালকে আলাদাভাবে চিনে রাখার সুবিধার্থে কৃষকরা এই গ্রাফাইটের টুকরো দিয়ে ভেড়ার গায়ে দাগ কেটে চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেন। গ্রাফাইটের উপযোগিতা কেবল ভেড়ার গায়ে দাগ কাটার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর অনন্য রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য খুব দ্রুত তৎকালীন অন্যান্য শিল্পের নজর কাড়ে। গ্রাফাইট উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল। এটি হয়ে ওঠে এক অপরিহার্য উপাদান।

তৎকালীন কামব্রিয়ার খনিগুলো সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব এবং আকাশচুম্বী চাহিদার কারণে এই ‘কৃষ্ণ সিসা’ নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক চোরাচালান। পরে গ্রাফাইট চুরির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়! সে যুগে গ্রাফাইট এতই দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান ছিল যে এর তৈরি আদিম পেন্সিলগুলো কেবল অভিজাত শ্রেণি এবং রাজকীয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের হাতেই শোভা পেত।
বিশুদ্ধ গ্রাফাইট স্বভাবতই নরম এবং ভঙ্গুর হওয়ায় শুরুতে লেখার জন্য এর টুকরো সরাসরি আঙুলে ধরে ব্যবহার করা হতো। তবে পেন্সিলের আধুনিক রূপ, অর্থাৎ কাঠের আবরণের ভেতর গ্রাফাইটের শিস–এর উদ্ভাবনী যাত্রা শুরু হয় ইতালিতে। বরোডেল খনি আবিষ্কারের কিছুদিন পরই (১৫৬৫ সালের দিকে) ইতালীয় উদ্ভাবক দম্পতি সিমোনিও এবং লিন্ডিয়ানা বার্নাকোটি প্রথম কাঠের আবরণযুক্ত পেন্সিল তৈরি করেন। জুনিপার গাছের একটি কাঠিকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে তার মধ্যে গ্রাফাইটের টুকরো ঢুকিয়ে দেন তারা। শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও আজও আধুনিক পেন্সিল তৈরির মূল ভিত্তি হিসেবে এই পদ্ধতি টিকে আছে।

ইউরোপজুড়ে পেন্সিলের কাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত থাকলেও একসময় বড় ধরনের সংকট দেখা দেয়–প্রাকৃতিক নিরেট গ্রাফাইটের উৎস ক্রমশ ফুরিয়ে আসছিল। এই সমস্যার এক বৈপ্লবিক সমাধান নিয়ে আসেন ফরাসি রসায়নবিদ নিকোলা-জ্যাক কতেঁ। সালটা ১৭৯৫। তিনি গুঁড়ো গ্রাফাইটের সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে কাদামাটি মিশিয়ে, সেটিকে চুল্লিতে পুড়িয়ে শক্ত শিস তৈরি করার কৌশল আবিষ্কার করেন। কতেঁর এই উদ্ভাবনই পেন্সিলশিল্পে এক নবজাগরণ নিয়ে আসে এবং এটি শিল্পী ও লেখকদের কাছে আরও সুলভ, ব্যবহারযোগ্য ও টেকসই হয়ে ওঠে।
উনিশ শতকের শুরুতে পেন্সিল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছায়। ম্যাসাচুসেটসের এক আসবাব নির্মাতা উইলিয়াম মনরো প্রথম আমেরিকান কাঠের পেন্সিল তৈরি করে চমক সৃষ্টি করেন। প্রায় একই সময়ে বিখ্যাত মার্কিন দার্শনিক ও লেখক হেনরি ডেভিড থরো এবং তাঁর বাবা গ্রাফাইট গুঁড়ো করার এক উন্নত পদ্ধতি বের করে পেন্সিলের গুণগত মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেন। এটি সুলভ ও সস্তা একটি পণ্যে পরিণত করেন।

বিশ্বখ্যাত পেন্সিল ব্র্যান্ড ‘ডারওয়েন্ট’-এর শিকড় লুকিয়ে আছে ১৮৩২ সালে ইংল্যান্ডের কেসউইকে প্রতিষ্ঠিত ‘কাম্বারল্যান্ড পেন্সিল কোম্পানি’র মধ্যে। কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীলতা পেরিয়ে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় পেন্সিল আরও নিখুঁত করে তোলে। এর ফলেই জন্ম নেয় পেন্সিলের নানা বৈচিত্র্য–সবচেয়ে নরম ও গাঢ় ‘বি’ (ব্ল্যাক) গ্রেড থেকে শুরু করে সবচেয়ে শক্ত ও হালকা ‘এইচ’ (হার্ড) গ্রেড পর্যন্ত। মানের এই বৈপ্লবিক ধারাবাহিকতা শিল্পী, স্থপতি ও লেখকদের কাজের ক্ষেত্রে নিয়ে আসে আস্থার এক নতুন সম্ভাবনা। এককালের সেই কাম্বারল্যান্ড পেন্সিল কোম্পানিই বিবর্তনের পথ ধরে আজকের বিশ্বখ্যাত ‘ডারওয়েন্ট’ ব্র্যান্ড হিসেবে সমাদৃত।
খনির অন্ধকার থেকে উঠে আসা একটি সাধারণ খনিজ আর কাঠের টুকরোর যুগলবন্দি এভাবেই যুগে যুগে মানুষের চিন্তা, শিল্প আর সৃজনশীলতার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। 

আরও পড়ুন

×