ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মাটির নিচে একাত্তরের বিভীষিকা

মৌলভীবাজার পিটিআই বাঙ্কারের অব্যক্ত আখ্যান

মৌলভীবাজার পিটিআই বাঙ্কারের অব্যক্ত আখ্যান
×

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহৃত সেই বাঙ্কার; মৌলভীবাজার, পিটিআই প্রাঙ্গণ

শিশির কুমার নাথ

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

মৌলভীবাজার শহরের প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) প্রাঙ্গণ। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে আর দশটা সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতোই শান্ত-স্নিগ্ধ এক কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। এ শান্ত মাটির নিচেই ঘুমিয়ে আছে একাত্তরের এক ভয়ংকর বিভীষিকাময় ইতিহাস। প্রশাসনিক ভবনের পাশেই লোকচক্ষুর অনেকটা আড়ালে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার। ইট-পাথরের এই জরাজীর্ণ কাঠামোটি নিছক কোনো সামরিক স্থাপনা নয়; এটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মমতা, পৈশাচিকতা এবং শত শত বাঙালির রক্তে ভেজা এক শোকগাথার জীবন্ত দলিল। লিখেছেন শিশির কুমার নাথ

মহান মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার জেলার রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ও বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস। একাত্তরের মার্চে সারাদেশের মতো চা-বাগান ঘেরা এই জনপদও স্বাধীনতার মন্ত্রে উত্তাল হয়ে ওঠে। ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট শুরু হওয়ার পরপরই মৌলভীবাজারে ১৪৪ ধারা জারি করে পাকিস্তানি প্রশাসন। কিন্তু মুক্তিকামী জনতা সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে। ২৬ মার্চ শহরের উত্তরাঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষের এক বিশাল মিছিল শহরে প্রবেশ করতে চাইলে চাঁদনীঘাটের পুলে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা নির্বিচারে গুলি চালায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন লুন্দু মিয়া; রচিত হয় মৌলভীবাজারের প্রথম আত্মদানের ইতিহাস।
পরদিন ২৭ মার্চ বিকেলে সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে আবারও রাজপথে নামে জনতা। পাকিস্তানি বাহিনীর বুলেটে সেদিনও ঝরে যায় তাজা প্রাণ। ২৯ মার্চ শহরের কাশিনাথ রোডের বাসা থেকে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা শ্রীনিবাস ভট্টাচার্য বলাইকে ধরে নিয়ে যায় হানাদাররা। তাঁকে এই পিটিআই ক্যাম্পাসে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়; যার মৃতদেহটি পর্যন্ত আর খুঁজে পায়নি তাঁর পরিবার। লেখক ও গবেষক তাজুল মোহাম্মদের ‘সিলেটে গণহত্যা’ গ্রন্থে এই প্রাথমিক প্রতিরোধ ও নির্মমতার বিবরণ পাওয়া যায়।

প্রাথমিকভাবে স্থানীয় প্রতিরোধ যোদ্ধারা পিটিআই ক্যাম্পাসকে তাদের অস্থায়ী সদর দপ্তর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এখানে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ। মৌলভীবাজার পিটিআইকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রূপান্তরিত করে একটি কন্ট্রোল রুমও খোলা হয়। ২৯ মার্চ মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী সাময়িকভাবে পিটিআই ও সংলগ্ন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু এই বিজয় দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২৯ এপ্রিল বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা মৌলভীবাজার পুনর্দখল করে নেয়। এরপরই এই পিটিআই ক্যাম্পাস এবং তৎসংলগ্ন ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউস এলাকাটি পরিণত হয় সিলেট অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এক মৃত্যুপুরী ও বধ্যভূমিতে।

সরেজমিনে বাঙ্কারটি পরিদর্শন করে দেখা যায়, সামরিক কৌশলের এক নিপুণ ও ভয়াবহ নিদর্শন এটি। মাটির প্রায় ১০ ফুট গভীরে এর অবস্থান। ছাদটি প্রায় ২০ ইঞ্চি পুরু ঢালাই দিয়ে তৈরি, যার দৈর্ঘ্য ২৫ ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে ১৯ ফুট। বাঙ্কারের ভেতরে রয়েছে পাশাপাশি দুটি কক্ষ–একটি ছোট, অন্যটি বেশ বড়। কক্ষগুলোয় প্রবেশের জন্য রয়েছে একটি সরু ও অন্ধকার সিঁড়িপথ।
বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই মাটির নিচে এত বড় একটি স্থাপনা রয়েছে। কারণ, বাঙ্কারের ছাদের ওপর মাটি ও ইট দিয়ে কৃত্রিম টিলা তৈরি করে তার ওপর ঘাস ও গাছপালা লাগিয়ে ক্যামোফ্লেজ (ছদ্মবেশ) করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, আকাশ থেকে মিত্রবাহিনীর বোম্বিং বা সরাসরি আর্টিলারি আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া। বাঙ্কারের ঠিক পাশেই ভারী কামান বসানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল কংক্রিটের পাকাপোক্ত ভিত্তি।

রব্বানী চৌধুরী তাঁর ‘মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে এ জেলার হাজার হাজার লোক শহীদ হন। মৌলভীবাজার জেলা সদরের এই পিটিআইতে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্রিগেড হেডকোয়ার্টার স্থাপন করা হয়, যার দায়িত্বে ছিলেন কুখ্যাত ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানা।’

গবেষক ও প্রাবন্ধিক দীপংকর মোহান্তর অনুসন্ধানী লেখায় উঠে এসেছে এই ক্যাম্প নির্মাণের মর্মান্তিক ইতিহাস। মে মাসের শুরুতে হেডকোয়ার্টারের নিরাপত্তা জোরদার করতে পাকিস্তানি সেনারা আশপাশের ইটভাটা থেকে হাজার হাজার ইট লুট করে আনে। সরকারি বিঅ্যান্ডবি এবং শহরের বড় ঠিকাদার মোবারক মিয়ার ভাটা থেকে আনা অসংখ্য ইটের গায়ে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘১৯৭১’। সেই ইট দিয়েই তৈরি হয় পিটিআইয়ের ভেতরের রাস্তা এবং এই ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার। সুরক্ষিত এ বাঙ্কারেই অবস্থান করতেন ব্রিগেডিয়ার রানা।

পিটিআই এবং পার্শ্ববর্তী ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউস এলাকাটি পরিণত হয়েছিল নারকীয় বধ্যভূমিতে। পিটিআইয়ের প্রতিটি কক্ষ হয়ে উঠেছিল নারী-পুরুষের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের কেন্দ্র।
দীপংকর মোহান্তর গবেষণা থেকে জানা যায়, ব্রিগেডিয়ার রানার জন্য বাঙ্কারের একটি বিশেষ কক্ষে নারীদের বন্দি করে রাখা হতো। পৈশাচিকতার শিকার এ নারীদের সম্পূর্ণ নিরাবরণ অবস্থায় রাখা হতো, যেন তারা পরিধেয় কাপড়ে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার পথও বেছে নিতে না পারেন। কুলাউড়ার ফটিকুলি গ্রামের দুই বোন এ নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসিন আলী এ পিটিআই বাঙ্কার থেকেই থানা বাজারের এক চিকিৎসকের দুই মেয়েকে উদ্ধার করেছিলেন।

দেশ স্বাধীনের পর মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধারা যখন বাঙ্কারটি উন্মুক্ত করেন, তখন সেখান থেকে অনেক বীরাঙ্গনা মুমূর্ষু অবস্থায় মুক্তি পান। পিটিআই ছেড়ে পালানোর সময়ও পাকিস্তানি সেনারা সার্কিট হাউসে বেশ কয়েকজন নারীকে হত্যা করে, যাদের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে জানা যায়, নির্যাতন শেষে স্বাধীনতাকামী মানুষের লাশ ফেলা হতো পিটিআইয়ের পশ্চিম দিকের পুকুরে, কুয়ার ভেতর এবং সুপার কোয়ার্টারের ঢালু জায়গায়। ট্যুরিস্ট রেস্ট হাউসের চারপাশে গর্ত করে গণকবর দেওয়া হতো। দেশ স্বাধীনের পর নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে হাজারো মানুষ ছুটে আসেন এই পিটিআই বধ্যভূমিতে।
প্রত্যক্ষদর্শী মখলিছ মিয়া জানান, স্বাধীনতার পরপরই সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, কুয়ার ভেতরে লাশের স্তূপ। চারদিকে নতুন খোঁড়া গর্ত থেকে ভেসে আসছে পচা লাশের উৎকট দুর্গন্ধ। রেস্ট হাউসের ঢালুর গর্তগুলো থেকে শিয়াল-কুকুরে টেনে বের করেছে মানুষের হাত-পা। যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল জমাট বাঁধা রক্ত, মানুষের কঙ্কাল আর নারী-পুরুষের ছিন্নভিন্ন পোশাক। ১৯৭২ সালের দিকে বর্তমান নতুন মহিলা হোস্টেলের নিচে একটি পুকুর খননকালেও মানুষের অসংখ্য হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়।

স্বাধীনতার পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইতিহাসের এই জীবন্ত সাক্ষী আজ অবহেলিত। পিটিআইয়ের সাবেক সুপারিনটেনডেন্ট রোকেয়া বেগমের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাঙ্কারের চারপাশে ফুলের টব দিয়ে সাজানো এবং ছাদে বাংলাদেশের একটি মানচিত্র অঙ্কন করে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশকে দৃশ্যমান করার একটা ক্ষুদ্র প্রয়াস চালানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে বড় কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। নিপীড়নের সাক্ষী বাঙ্কারটি সংরক্ষণেরও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মৌলভীবাজার জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল উদ্দিন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা সজল চক্রবর্তীর কণ্ঠে ঝরে পড়ে আক্ষেপ। তারা জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের এই স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের কার্যকর কোনো উদ্যোগ কোনো সরকারের আমলেই নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে হানাদার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরতে বাঙ্কারটির সংস্কার ও যথাযথ সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

পিটিআইয়ের সিনিয়র ইনস্ট্রাক্টর আমেনা আক্তার বলেন, পিটিআই কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সামর্থ্যের বাইরে সরকারিভাবে এটিকে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দর্শনীয় স্থান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এখান থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ইতিহাস জেনে তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশপ্রেমের বীজ বপন করতে পারবেন।
মৌলভীবাজার পিটিআইয়ের এই বাঙ্কার নিছক ইট-পাথরের কোনো গর্ত নয়; এটি আমাদের বেদনাবিধুর স্বাধীনতা সংগ্রামের এক জ্বলন্ত শোকগাথা। যে মাটিতে মিশে আছে নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্ত আর বীরাঙ্গনাদের চোখের জল, সেই মাটির ইতিহাস মুছে যেতে দেওয়া যায় না। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে অম্লান রাখতে এই বধ্যভূমি এবং বাঙ্কারটিকে একটি জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।। 

আরও পড়ুন

×