ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চারুকলায় বৈশাখের বারতা

চারুকলায় বৈশাখের বারতা
×

জয়নুল গ্যালারির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁশ, কাগজ, আঠা আর রঙের পাত্র। খোলা প্রাঙ্গণে চলছে বিশাল আকৃতির মোটিফ তৈরির প্রস্তুতি ছবি:: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৩ | আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০২৬ | ২০:০৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার প্রখর রোদ যেন কেবল চৈত্রের খামখেয়ালি নয়; বরং সৃষ্টির এক অলক্ষ্য অনুঘটক। তপ্ত দুপুরের এই তাপদাহ যখন নগরবাসীকে ক্লান্ত করে তোলে, ঠিক তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রাঙ্গণে কান পাতলে শোনা যায় ভিন্ন এক স্পন্দন। সেখানে ঘাম, রং, ক্যানভাস আর তারুণ্যের অদম্য কল্পনা মিলেমিশে তৈরি করছে শিকড়ের উৎসব–বঙ্গাব্দ ১৪৩৩-কে বরণ করে নেওয়ার এক মহাযজ্ঞ। ৩০ মার্চ চারুকলার জয়নুল গ্যালারির সামনের লবিতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বর্ণিল কর্মযজ্ঞের উদ্বোধন করা হয়। শিক্ষার্থীদের বাজানো ঢাকের বোল, মুড়ি-মুড়কি আর পান-সুপারির গ্রামীণ আতিথেয়তা যেন সেদিনই জানান দিয়ে গেছে–বৈশাখ আর বেশি দূরে নয়, সে ধেয়ে আসছে নতুনের বার্তা নিয়ে।

নামের বিতর্ক ও সৃষ্টির অবিরাম স্রোত
চারুকলার ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রার নামকরণ ঘিরে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বিতর্ক ছিল। শুরুতে গত বছরের মতো এবারও ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামটি ব্যবহার না করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামেই উৎসব উদযাপনের কথা জানানো হয়েছিল। তবে নাম নিয়ে এ দোলাচলের মধ্যেই ৫ এপ্রিল সচিবালয়ে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এক সুস্পষ্ট ঘোষণা দেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, “পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে যে বিতর্ক আমরা তার অবসান চাই। এখন থেকে নববর্ষের এই শোভাযাত্রা ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামেই অনুষ্ঠিত হবে।’’
তবে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি একটু ভিন্ন। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর ইউনেস্কোর ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ বা অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় এ উৎসব যুক্ত হয় এবং রেকর্ডে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবেই লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে ইউনেস্কো ঢাকার হেড অব অফিস সুজান ভাইজ স্পষ্ট করেছেন, নামকরণসংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে ইউনেস্কো কোনো হস্তক্ষেপ করে না। তবে বাংলাদেশ সরকার যদি ইউনেস্কোর রেকর্ডে নাম পরিবর্তন করতে চায়, তবে কনভেনশনের নিয়ম অনুযায়ী আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। 

ক্যানভাসে শিকড়ের গল্প
জয়নুল গ্যালারির ভেতরে ঢুকলেই চোখে পড়ে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঁশ, কাগজ, আঠা আর রঙের পাত্র। তৈরি হচ্ছে বাঘ, প্যাঁচা, রাজা কিংবা কল্পনার বিচিত্র সব চরিত্রের মুখোশ। প্রতিটি মুখ যেন স্থির থেকেও কথা বলছে, অপেক্ষা করছে পহেলা বৈশাখের সকালে রাজপথে লাখো মানুষের ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়ার।

গ্যালারির বাইরে, খোলা প্রাঙ্গণে চলছে আরও বড় প্রস্তুতি। এবারের ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’র প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এ শক্তিশালী ভাবনাকে ধারণ করে তৈরি করা হচ্ছে এবারের প্রতীকী মোটিফগুলো। এবার প্রধান আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বিশাল আকৃতির একটি মোরগের প্রতিকৃতি। ঘোর অমানিশা কাটিয়ে ভোরবেলার মোরগের ডাক যেমন নতুন দিনের সূচনার ঘোষণা দেয়, তেমনি এই মোটিফটি নতুন বছর, নতুন সূর্য ও জাতীয় জাগরণের প্রতীক হিসেবে উঠে আসবে। লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যুক্ত করা হয়েছে সোনারগাঁর বিখ্যাত কাঠের হাতির বিশাল কাঠামো। চার চাকার এই কাঠের হাতি বাংলার লোকশিল্পের এক ঐতিহ্যবাহী প্রতীক; যা আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ কারুশিল্পীদের অবদানকে স্মরণ করাবে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোটিফগুলোর একটি হলো বিশাল আকৃতির দোতারা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা-মামলার বিপরীতে একটি নীরব শৈল্পিক প্রতিবাদ হিসেবে এ বাদ্যযন্ত্রটিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এটি প্রমাণ করে, চারুকলার এ আয়োজন কেবল আনন্দ-উৎসব নয়; বরং এটি সমসাময়িক অসংগতির বিরুদ্ধে একটি সুতীব্র সাংস্কৃতিক প্রতিবাদও।
এ ছাড়া শান্তি ও সম্প্রীতির চিরন্তন বার্তা তুলে ধরতে থাকছে পায়রার মোটিফ, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সহাবস্থানের কথা বলবে। কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টেপা পুতুলের আদলে তৈরি ঘোড়াও স্থান পেয়েছে এবারের মোটিফে। প্রধান এই পাঁচটি কাঠামোর পাশাপাশি চিরায়ত প্যাঁচা, বাঘের মুখোশ এবং আরও নানা ধরনের ক্ষুদ্র মোটিফ তো থাকছেই। চারুকলার ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলামের ভাষায়, ‘এবারের শোভাযাত্রা হবে আরও বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের অংশগ্রহণই মুখ্য হয়ে উঠবে।’

বিশাল এই কর্মযজ্ঞের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়, এই প্রস্তুতি কেবল একটি নির্দিষ্ট দিনের কয়েক ঘণ্টার শোভাযাত্রার জন্য নয়। এটি এক ধরনের সম্মিলিত শিল্পচর্চা, এক অভূতপূর্ব সামাজিক মিথস্ক্রিয়া।

রঙে মাখামাখি হাতে কাজ করছিলেন চারুকলার শিক্ষার্থী পলক হালদার। কপালে জমে থাকা ঘাম মুছে তিনি বলেন, ‘আমাদের পড়াশোনা যেমন গৎবাঁধা নয়, তেমনি এই প্রস্তুতির মাঝেও কোনো গৎবাঁধা চিন্তা নেই। আমরা এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কাজ করি। সত্যি বলতে কী, মনে হয় নিজের হাতে আমরা বছরের প্রথম সকালটাকে সাজাচ্ছি।’

এই উৎসব যে কেবল চারুকলা বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে আটকে নেই, তা প্রাঙ্গণে আসা সাধারণ মানুষকে দেখলে বোঝা যায়। অনেকে সপরিবারে আসছেন প্রস্তুতির এই ধাপগুলো চাক্ষুষ করতে। কেউ মোবাইল ফোনে ফ্রেমবন্দি করছেন ব্যস্ত শিল্পীদের, কেউবা পরম কৌতূহলে শিশুদের দেখাচ্ছেন কীভাবে বাঁশের কঙ্কাল থেকে জন্ম নেয় একটি রঙিন পাখি। গৃহিণী মারুফা হাসান তাঁর ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে এসেছেন। তাঁর মতে, ‘এখানে যে নির্ভেজাল আনন্দ আর শিকড়ের টান অনুভব করা যায়, তা শহরের অন্য কোনো যান্ত্রিক বিনোদন কেন্দ্রে পাওয়া অসম্ভব।’

দিনশেষে উৎসবের নামের বিতর্ক, মতভেদ কিংবা ব্যাখ্যার ভিন্নতা–সবকিছু ছাপিয়ে এই ঘাম-ঝরানো আয়োজন প্রমাণ করে, যে কোনো উৎসবের আসল শক্তি নিহিত থাকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে।

আরও পড়ুন

×