ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টার হবে ‘ডিএনএ’

ভবিষ্যতের ডেটা সেন্টার হবে ‘ডিএনএ’
×

জীবন্ত কোষে তথ্য সংরক্ষণ কার্যত প্রকৃতিতে বিদ্যমান শক্তিরই এক মাইলফলক উদ্ভাবন

রফিকুর রহমান প্রিয়াম

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৭:৪৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ ছবি, ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা বা উপাত্ত তৈরি হচ্ছে, তা ধারণ করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ব। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৪০ সালের মধ্যে প্রচলিত হার্ড ড্রাইভ বা ফ্ল্যাশ মেমোরি দিয়ে এই বিশাল তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। সংকটটি কেবল জায়গা বা স্টোরেজের নয়; বর্তমান ডেটা সেন্টারগুলোর বিপুল বিদ্যুৎ খরচ জন্ম দিচ্ছে ভয়াবহ পরিবেশগত উদ্বেগের। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলোতেই ১৭৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়েছে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ দিয়ে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ বসতবাড়ির এক বছরের সম্পূর্ণ চাহিদা মেটানো সম্ভব!

এই বৈশ্বিক ডেটা সংকটের এক অভাবনীয় ও যুগান্তকারী সমাধান মিলেছে প্রকৃতির সবচেয়ে প্রাচীন ও নিখুঁত তথ্যভান্ডার ‘ডিএনএ’-তে। মানবদেহসহ যে কোনো জীবের বংশগতির বৈশিষ্ট্যের ধারক এই জৈব অণুকে এখন ডিজিটাল ডেটা (শূন্য এবং এক-এর বাইনারি সংকেত) সংরক্ষণের কাজে লাগাচ্ছেন গবেষকরা। ডিএনএ’র প্রধান চমক হলো, এর অকল্পনীয় ধারণক্ষমতা। মাত্র এক গ্রাম ডিএনএ-তে প্রায় ৪৫৫ এক্সাবাইট তথ্য রাখা যায়। আরও সহজভাবে বললে, গোটা বিশ্বের বর্তমান যাবতীয় ডিজিটাল তথ্য স্রেফ একটি ছোট ঘরের সমপরিমাণ জায়গায় ডিএনএর মাধ্যমে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

সাধারণ হার্ডডিস্ক বা ম্যাগনেটিক ড্রাইভের আয়ু যেখানে মাত্র পাঁচ থেকে দশ বছর, সেখানে সঠিক পরিবেশে ডিএনএ হাজার থেকে লাখ লাখ বছর পর্যন্ত অবিকৃত থাকতে পারে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডিএনএ-তে একবার তথ্য লেখার পর তা সংরক্ষণে আর কোনো বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। এই বৈশিষ্ট্য ডিএনএ স্টোরেজকে একটি ‘জিরো-এনার্জি’ বা বিদ্যুৎবিহীন, পরিবেশবান্ধব মাধ্যমে পরিণত করেছে।

চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল

ডিএনএ ডেটা স্টোরেজ এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞান বা গবেষণাগারেই সীমাবদ্ধ নেই। চীনের তিয়ানজিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা সম্প্রতি প্রাচীন দুনহুয়াং ম্যুরালের ছবি সফলভাবে ডিএনএ-তে সংরক্ষণ করেছেন। পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে, বিশেষ কোনো সুরক্ষা ছাড়াই এই ডিএনএ এমন পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম, যা স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ২০ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে অবিকৃত থাকার সমতুল্য। অদূরভবিষ্যতে এটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্যও জোরকদমে প্রস্তুতি চলছে। ‘বায়োমেমোরি’ নামে একটি ফরাসি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ২০২৬ সালের মধ্যেই করপোরেট গ্রাহকদের জন্য ১০০ পেটাবাইট ক্ষমতার একটি ‘ডিএনএ কার্ড’ বাজারে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এর প্রাথমিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার ডলার।

অন্যদিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ‘মিস্ট’ বা মলিকিউলার ইনফরমেশন স্টোরেজ টেকনোলজিস উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, বিশাল ডেটা সেন্টারের আকারকে একটি ছোট টেবিলের সমান আকৃতিতে নামিয়ে আনা। পাশাপাশি স্টোরেজ খরচ কমিয়ে প্রতি গিগাবাইটে তা মাত্র এক ডলারে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে তারা।
বর্তমানে বিশাল ডেটা স্টোরেজ খরচের কারণে হাসপাতালগুলোকে অনেক সময় রোগীদের পুরোনো চিকিৎসাপত্র বা রেকর্ড মুছে ফেলতে হয়। কিন্তু ডিএনএ প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিটি মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আজীবন চিকিৎসা রেকর্ড চিরকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ‘মলিকুলার সিমিলারিটি সার্চ’ বা আণবিক সাদৃশ্য অনুসন্ধান প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশাল ডেটাবেজ থেকে রোগের ধরন বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত, উন্নত ও শতভাগ নির্ভুল করা যাবে।

এই প্রযুক্তি মানবসভ্যতার এক স্থায়ী ‘ব্যাকআপ’ বা বিকল্প রক্ষাকবচ হিসেবেও কাজ করবে। পরমাণু যুদ্ধ, মহামারি বা মহাজাগতিক কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে পৃথিবী কখনও ধ্বংসের মুখে পড়লে, মানবজাতির সঞ্চিত জ্ঞান ও ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ নিয়েছে ‘আর্ক মিশন ফাউন্ডেশন’। তারা ডিএনএ স্টোরেজ ব্যবহার করে চাঁদে অবস্থিত ‘লুনার লাইব্রেরি’-তে উইকিপিডিয়া ও সাহিত্যের বিশাল ভান্ডার পাঠিয়েছে, যা সেখানে কয়েকশ কোটি বছর পর্যন্ত সগৌরবে টিকে থাকতে সক্ষম।

এর চেয়েও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো ‘ইন ভিভো স্টোরেজ’ বা জীবন্ত কোষে তথ্য সংরক্ষণ। বিজ্ঞানীরা ব্যাকটেরিয়ার মতো জীবিত কোষের ভেতরেও ডেটা লুকিয়ে রাখার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এর ফলে কোনো ডেটা একবার একটি ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করালে, সেটি প্রাকৃতিক নিয়মেই বিভাজিত হয়ে নিজেই ডেটার কোটি কোটি কপি তৈরি করে বংশপরম্পরায় তা বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।

মানবজাতির ইতিহাস, অমূল্য জ্ঞান ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তিকে অনন্তকাল সুরক্ষিত রাখতে একুশ শতকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হতে যাচ্ছে এই জৈবিক স্টোরেজ ব্যবস্থা। অচিরেই এটি আমাদের প্রচলিত ডেটা সেন্টারগুলোর চিরাচরিত চেহারা পুরোপুরি বদলে দিয়ে এক নতুন ডিজিটাল পৃথিবীর সূচনা করবে।

আরও পড়ুন

×