হিরোশিমা-নাগাসাকি ধ্বংসের ৮১ বছর
বিপন্ন পৃথিবীর ভবিষ্যৎ
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বোমাটি নিক্ষেপের এক মাস পর, যে ভবনের কঙ্কালসার কাঠামোটি দেখা যাচ্ছে, একসময় এটি ছিল হিরোশিমার একটি সিনেমা হল, ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন এক মার্কিন সংবাদদাতা
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৮ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১৯:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট–মানব ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে এ দুটি দিন কেবল নিছক কোনো তারিখ নয়, বরং এক মহাজাগতিক ট্র্যাজেডির সমার্থক। পারমাণবিক বোমার একেকটি আঘাতে মুহূর্তের মধ্যেই বাষ্পীভূত হয়ে গিয়েছিল আস্ত দুটি শহর। হিরোশিমা ও নাগাসাকির মাটি ছুঁয়েছিল চার হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, আকাশ থেকে ঝরেছিল তেজস্ক্রিয় কালো বৃষ্টি। মাশরুম মেঘ আর আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল হাজারো প্রাণ আর কংক্রিটের দেয়ালের গায়ে লেপ্টে থাকা ছায়ায় লেখা হয়েছিল মানুষের ভয়ংকর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার এক ভয়াল আখ্যান। আজ সেই ভয়াবহ ঘটনার ৮১তম বার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকরা এক অশনিসংকেত দিচ্ছেন–হিরোশিমা ও নাগাসাকি কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি কোনো অতীত নয়, বরং এটি আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের এক জীবন্ত শঙ্কা।
ইতিহাসবিদ ও লেখক অ্যামি শিরা টাইটেলের মতে, এই বার্ষিকীগুলো কেবল পারমাণবিক যুদ্ধের বিধ্বংসী মানবিক মূল্য স্মরণ করার ক্ষণ নয়; বরং এটি অনুধাবনের সময় যে পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি আজও ফুরিয়ে যায়নি। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৯টি দেশের হাতে ১২ হাজারেরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এই বিপুল অস্ত্রভান্ডার প্রমাণ করে, ধ্বংসের সেই বিভীষিকা আজও আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।
হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ এবং নাগাসাকিতে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের পারমাণবিক বোমার আঘাতে তাৎক্ষণিকভাবে এবং পরবর্তী সময়ে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারায়। সামরিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের একাংশ আজও যুক্তি দেন, এই হামলা ছিল একটি ‘প্রয়োজনীয় অমঙ্গল’। তাদের মতে, জাপানের মূল ভূখণ্ডে মিত্রবাহিনীর পরিকল্পিত ‘অপারেশন ডাউনফল’ বাস্তবায়িত হলে কয়েক মিলিয়ন মানুষের প্রাণহানি হতো।
১৯৪৫ সালের এক পশ্চিমা সমীক্ষায় দাবি করা হয়, ওই অভিযানে অংশ নিলে ১৭ থেকে ৪০ লাখ মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারত আর জাপানিদের মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াত ৫০ লাখ থেকে এক কোটির মধ্যে। এই বিশাল প্রাণহানি এড়াতেই পারমাণবিক বোমার ব্যবহারকে অনেক সামরিক কৌশলবিদ যৌক্তিক মনে করেন। কিন্তু এ যুক্তির আড়ালে চাপা পড়ে যায় মানবিক বিপর্যয়ের সেই অকল্পনীয় চিত্রটি। স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইনকে চিঠি লিখে ম্যানহাটান প্রজেক্টের সূচনা করা পদার্থবিদ লিও জিলার্ড পরবর্তী সময়ে এই বোমার ব্যবহারকে ‘ইতিহাসের অন্যতম বড় ভুল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।
পারমাণবিক বিস্ফোরণের সেই নরক থেকে যারা বেঁচে ফিরেছিলেন, জাপানে তারা ‘হিবাকুশা’ নামে পরিচিত। পারমাণবিক অস্ত্রের প্রকৃত বিশেষজ্ঞ কোনো তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী বা ‘ওপেনহেইমার’ নন; বরং এ হিবাকুশারাই। হিরোশিমায় হামলার পর শহরের ৯০ শতাংশ চিকিৎসক ও নার্স নিহত বা আহত হয়েছিলেন। ৪৫টি হাসপাতালের মধ্যে ৪২টিই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কোনো ধরনের মানবিক সহায়তাই সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিস্ফোরণের ফায়ারবলটি সর্বোচ্চ আকার ধারণ করতে সময় নিয়েছিল মাত্র ১০ সেকেন্ড, কিন্তু তার ভয়াবহ প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে বেড়াচ্ছেন এসব মানুষ।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, ভয়াবহ নির্মমতার শিকার এ মানুষগুলোই আজ শান্তির সবচেয়ে বড় দূত। নিজেদের ক্ষতের মধ্যেও তারা ফিলিস্তিনের গাজার মতো বর্তমান যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকার মানুষের জন্য সমবেদনা জানান, রাজপথে দাঁড়ান সংহতি নিয়ে। একটি শহর ধ্বংসের প্রকৃত অর্থ কী, তা তাদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানেন না। কারণ তারা জানেন, একটি শহরের পতন মানে গোটা মানবতার অবক্ষয়।
হিরোশিমা ধ্বংসযজ্ঞের আট দশক পর বিশ্ব আজ এক নতুন পারমাণবিক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের অস্ত্রভান্ডারে যুক্ত করতে যাচ্ছে নতুন পারমাণবিক গ্র্যাভিটি বোমা ‘বি৬১-১৩’। আধুনিক নিরাপত্তা ও নিখুঁত লক্ষ্যভেদের ক্ষমতাসম্পন্ন এ বোমাটি হিরোশিমায় ফেলা ‘লিটল বয়’-এর চেয়ে প্রায় ২৪ গুণ বেশি শক্তিশালী। পেন্টাগনের মতে, ভূগর্ভস্থ সুদৃঢ় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে এটি তৈরি করা হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, ইরানের নাতাঞ্জের পাহাড়ে লুকানো পারমাণবিক স্থাপনার মতো লক্ষ্যবস্তুগুলো এর নিশানা হতে পারে। এই ধরনের ‘ব্যবহারযোগ্য’ পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকায়ন বিশ্বকে এক খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে। এর সঙ্গে যদি গাজা গণহত্যায় ইসরায়েলের ব্যবহার করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি যুক্ত হয়, তবে তা ডেকে আনতে পারে অকল্পনীয় বিপর্যয়।
পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস কেবল জাপানেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার মারালেঙ্গার আদিবাসী ভূমি– সর্বত্রই পারমাণবিক পরীক্ষার বিষাক্ত প্রভাব রয়ে গেছে। মার্শাল আইল্যান্ডসের কিছু অংশ আজও চেরনোবিল বা ফুকুশিমার চেয়ে দশগুণ বেশি তেজস্ক্রিয়। মূলত আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো এ পরীক্ষাগুলোকে বিশ্লেষকরা ‘পারমাণবিক বর্ণবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আজ বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তির পক্ষে দাঁড়ালেও বিশ্বের পরাশক্তিগুলো এখনও নিশ্চুপ। পারমাণবিক অস্ত্রের উপস্থিতিতে মানবজাতির কোনো ভবিষ্যৎ থাকতে পারে না। আজকের এই দিনে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে কেবল দুটি পথই খোলা আছে–হয় আমরা সম্মিলিতভাবে পারমাণবিক অস্ত্র চিরতরে নির্মূল করব, নয়তো একদিন এ অস্ত্রই মানবজাতিকে পৃথিবী থেকে মুছে ফেলবে।