শিক্ষার্থীদের ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’
পাবনার বেড়া উপজেলার বিভিন্ন স্কুলে বিস্তৃত হচ্ছে ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’
জালাল উদ্দিন
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪৫ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ | ২১:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৬ সালের কথা। নিজেদের টিফিনের সামান্য কটি টাকা বাঁচিয়ে পাবনার বেড়া উপজেলার কয়েকজন শিক্ষার্থী শুরু করে অসচ্ছল মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার কাজ। জমানো টাকায় চাল, ডাল, তেল কিনে তারা পৌঁছে দিত হতদরিদ্রদের দুয়ারে। কিন্তু মানুষের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তারা একসময় গভীরভাবে উপলব্ধি করে, পেটের ক্ষুধা নিবৃত্ত করার পাশাপাশি সমাজের দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন ‘মনের ক্ষুধা’ মেটানো। সেই বোধ থেকেই প্রায় এক দশক পুরোনো সেই মানবিক উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে পাঠ উদ্যোগে। যার নাম–‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’ নামে এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগটি শুধু পরিসরেই বড় হয়নি, বদলে দিয়েছে তাদের স্বপ্নের পরিধিও।
পাঠাগারের নাম ‘কুঁড়েঘর’ রাখার পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক জীবনদর্শন। উদ্যোক্তাদের মতে, কুঁড়েঘর এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সারল্যের এক চিরন্তন প্রতীক। বাঁশ, কাঠ ও ছন দিয়ে তৈরি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এই পাঠাগারগুলো সমাজের সব শ্রেণির শিক্ষার্থীর জন্য উন্মুক্ত এক পরম আশ্রয়। এখানে ধনী-গরিবের কোনো বিভাজন নেই; জ্ঞানের কাছে, বইয়ের কাছে সবাই সমান।
বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের একদম সহজে প্রবেশযোগ্য স্থানে এগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যেন টিফিনের অবসরে বা ছুটির পর শিক্ষার্থীরা অনায়াসেই বইয়ের জগতে হারিয়ে যেতে পারে।
সংগঠনটি প্রথমে বেড়া পোর্ট এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে একটি ‘কুঁড়েঘর পাঠাগার’ স্থাপন করেছিল। শিক্ষার্থী ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে অভাবনীয় ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর তারা এটি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ আগস্ট বেড়া উপজেলার তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই পাঠাগার। ১৮ নম্বর চরপেচাকোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেড়া বালিকা পাইলট উচ্চবিদ্যালয় এবং বেড়া সরকারি বিপিন বিহারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে স্থাপিত এই জ্ঞানকুঞ্জগুলোর উদ্বোধন করেন বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুনাল্ট চাকমা।
প্রাথমিকভাবে গল্প, উপন্যাস, কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান, ইতিহাস থেকে শুরু করে শিশু-কিশোর সাহিত্য, জীবনী, নৈতিক শিক্ষা ও সাধারণ জ্ঞানের বইয়ে সাজানো হয়েছে তাকগুলো। তবে এখানেই এর উদ্যোক্তারা পাঠচক্র, বই পর্যালোচনা, সাহিত্য আড্ডা এবং বই পড়া প্রতিযোগিতার মতো আয়োজন করে এটিকে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেন।
সাঁথিয়ার জোড়গাছা ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন উল্লাস বলেন, ‘সুশিক্ষাই একটি সুস্থ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের মূলভিত্তি। আর পাঠাগার হলো সেই সুশিক্ষা বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। এই তরুণেরা শিক্ষার্থীদের মাঝে যে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে, তা সত্যিই অভাবনীয়।’
‘শিক্ষার্থী সহযোগিতা সংগঠন’-এর সভাপতি মেহরাব হোসেন জিম শোনালেন তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, ‘টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে মানবসেবার যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ বইয়ের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করার এক বড় আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য, পর্যায়ক্রমে বেড়া উপজেলার প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি করে কুঁড়েঘর পাঠাগার স্থাপন করা।’
- বিষয় :
- জালাল উদ্দিন
- পাঠাগার
- পাবনা