ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সরকারের ১৮০ দিন এবং পার্বত্য চুক্তির হালচাল

সরকারের ১৮০ দিন এবং পার্বত্য চুক্তির হালচাল
×

জাকির হোসেন, দীপায়ন খীসা, সতেজ চাকমা

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে বসবাস করছে ১৪টি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের সব অধিকার আন্দোলনে আদিবাসীদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ সত্ত্বেও নিজেরা বরাবর অধিকারবঞ্চিত থেকে গেছে। 

বঞ্চনার কশাঘাতে জর্জরিত হতে হতে পাহাড়ে দানা বেঁধেছিল সশস্ত্র আন্দোলন। এর অবসান ও শান্তি আনয়নে বিভিন্ন সরকার সংলাপের আয়োজন করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’। কিন্তু ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। 
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারও পার্বত্য শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দেয়নি। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকট থেকে উত্তরণে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তার মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।

দুই.
বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মসূচি দিয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের পক্ষ থেকে ১৮০ দিনের কর্মসূচিতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার তালিকায় রাখার আহ্বান জানিয়ে ৩ মার্চ সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছিল। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে নিয়োগকৃত অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহারের দাবিও জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, সরকার গঠনের পর ১৮০ দিন প্রায় শেষ হয়ে এলেও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। অথচ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মিছিল, সমাবেশ, সেমিনার, গ্রাফিতির দেয়াল এবং জনপরিসরে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার স্থায়ী অবসানে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি বারংবার উচ্চারিত হয়েছে।

তিন. 
সরকারের কর্তাব্যক্তিদের স্মরণে থাকা ভালো, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পেছনে রয়েছে প্রলম্বিত লড়াই ও সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস। চুক্তির আগে পাহাড়ি জনগণের সশস্ত্র সংগ্রাম অবসানে ও সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকার প্রয়াস চালিয়েছিল। এটাকে জাতীয় সমস্যা হিসেবেই স্বীকার করে নিয়ে বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন সরকার সংলাপে বসেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সরকার ৭ বার, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৩ বার এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ৬ বার বৈঠকে বসেছিল। তিন সরকারের আমলে ধারাবাহিক ২৬টি বৈঠকের মধ্য দিয়ে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয়েছিল ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। এই চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যই নয়, দেশে সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জন্যও অপরিহার্য।

চার.
বিগত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নকে দীর্ঘদিন ধরে স্থবির রেখেছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়েও দেশবাসীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পর আরও বেশি প্রত্যাশা ছিল, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হবে নির্বাচিত সরকার। কিন্তু সে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিষয়ে প্রায় ছয় মাসের অভিজ্ঞতায় আমাদের মূল্যায়ন, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। 
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন মাসের মধ্যে গত ১ জুন ‘স্বাস্থ্যগত ও ব্যক্তিগত’ কারণে দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। এ পদত্যাগ নিয়ে সমাজ ও নাগরিক পরিসরে উদ্বেগ পরিলক্ষিত হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, এসব ক্ষোভ ও অসন্তোষ সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে একজন অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) খণ্ডের ১৯ ধারার সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন।   

আমরা দেখেছি, খালেদা জিয়ার নেত্বত্বাধীন বিএনপি সরকার ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে সংলাপ পুনরায় চালু করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় এসেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছিল। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য জেলার তিনটি আসনেই পাহাড়িরা বিপুল ভোটে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের নির্বাচিত করেছে। অ-পাহাড়ি প্রতিমন্ত্রী দিয়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয় পরিচালিত হওয়ায় পাহাড়ি জনগণের মধ্যে হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। 

পাঁচ.
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী কথা ছিল, পাহাড়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলিক পরিষদ। বর্তমান সরকার এ পরিষদকে কার্যকর করার ক্ষেত্রে এখনও এগিয়ে আসেনি। বরং নানা ক্ষেত্রে পরিষদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে ত্রাণ কার্যক্রম তত্ত্বাবধানে যশোর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী ওই অঞ্চলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক সংস্থা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদকে এ কার্যক্রমে সম্পৃক্তই করা হয়নি। 

ছয়.
রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপি ৩১ দফা কর্মসূচিতে ‘সম্প্রীতিমূলক সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা (রেইনবো নেশন)’ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ বিএনপির এই বহু জাতির বাংলাদেশ গঠনের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানিয়েছে। বিএনপি ঘোষিত বহু জাতির ‘রেইনবো নেশন’-এর বুনিয়াদ মজবুত করার লক্ষ্যে সরকারের উচিত হবে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সব পদক্ষেপ পরিহার করা। আমাদের প্রত্যাশা, ২০০১ সালে চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিলেন, সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে বর্তমান সরকারও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সচল রাখতে উদ্যোগী হবে।

সাত. 
পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী অবিলম্বে একজন পাহাড়িকে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। চুক্তি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ প্রদানে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন ও কার্যকর করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট সময়সূচিভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। সেই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও পরিবীক্ষণ কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে। এ ছাড়া বিধিমালা প্রণয়নসহ ‘পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’ দ্রুত কার্যকর করতে হবে। সর্বোপরি বিষয়গুলো নিয়ে অবিলম্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সংলাপের আয়োজন করতে হবে।

জাকির হোসেন, দীপায়ন খীসা, সতেজ চাকমা: মানবাধিকারকর্মী এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে যুক্ত

আরও পড়ুন

×