ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রেমিট্যান্স

প্রবাসী আয়ের রেকর্ডে স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্য

প্রবাসী আয়ের রেকর্ডে স্পষ্ট আঞ্চলিক বৈষম্য
×

কাজী আহমেদ শামীম

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে একটি স্থানীয় ইংরেজি দৈনিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রেমিট্যান্স প্রবাহের বিস্ময়কর চিত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৩,৫৬০ কোটি (৩৫.৬ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের (৩০.৩ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। 

বাহ্যিক দৃষ্টিতে এ পরিসংখ্যান অত্যন্ত স্বস্তিদায়ক এবং সংবেদনশীল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য ইতিবাচক। তবে এই চমকপ্রদ প্রবৃদ্ধির সূচকের গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায় গভীর আঞ্চলিক বৈষম্য, জেলাভিত্তিক অসামঞ্জস্য এবং উন্নয়ন নীতির দীর্ঘমেয়াদি সীমাবদ্ধতার দুর্বলতার চিত্র। একদিকে চট্টগ্রাম জেলার অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি, ঢাকাকেন্দ্রিক বিশাল অর্থপ্রবাহ, অন্যদিকে পঞ্চগড় বা লালমনিরহাটের মতো প্রান্তিক জেলাগুলোর ঋণাত্মক প্রবাহ। 

চলতি অর্থবছরে ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স প্রাপ্তি সাধারণ অর্জন নয়। বিশ্বব্যাপী নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বিভিন্ন অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও প্রবাসী শ্রমিকদের এই অবদান বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে নজিরবিহীন শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ডলারের তীব্র অভাবের কারণে আমদানি ব্যয় মেটাতে বাংলাদেশকে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। প্রবাসীদের এই রেকর্ড পরিমাণ অর্থ প্রেরণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে কাঙ্ক্ষিত স্তরে উন্নীত করতে এবং টাকার অবমূল্যায়ন রোধ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে হুন্ডি প্রতিরোধে নেওয়া নানামুখী পদক্ষেপ, কার্ব মার্কেট ও ব্যাংকিং রেটের ব্যবধান কমে আসা এবং প্রণোদনা দেওয়ার ফলে হুন্ডি থেকে সাধারণ প্রবাসীরা ব্যাংকিং বা বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন। তবে এই সামষ্টিক স্বস্তির পেছনে যে সূক্ষ্ম বৈষম্য লুকিয়ে আছে, তা গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনে যে তথ্যটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের এবং আলোচনার জন্ম দেয়, তা হলো জেলাগুলোর মধ্যকার আকাশ-পাতাল ব্যবধান। বাংলাদেশের মোট রেমিট্যান্সের ৩৮ থেকে ৪০ শতাংশ এককভাবে আসছে ঢাকা জেলায়। দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, আবাসন ও বিনিয়োগের সুযোগ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রবাসীরাও তাদের অর্জিত আয়ের বড় অংশ রাজধানীতেই স্থানান্তর বা বিনিয়োগ করছেন।
চট্টগ্রাম জেলা এই বছর প্রবৃদ্ধির শীর্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া কুমিল্লা ও সিলেট তাদের ঐতিহ্যগত রেমিট্যান্স হাব হিসেবে আধিপত্য ধরে রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের শ্রমবাজারে এই অঞ্চলগুলোর দীর্ঘদিনের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের প্রবাসীদের জন্যও কাজের সুযোগ তৈরি করছে।

যেখানে চট্টগ্রাম প্রবৃদ্ধির রেকর্ড গড়ছে, সেখানে পঞ্চগড়ে রেমিট্যান্স কমেছে ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অন্যদিকে পুরো অর্থবছরে লালমনিরহাট জেলা পেয়েছে মাত্র ১৮ মিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট রেমিট্যান্সের ০.০৫ শতাংশের চেয়েও কম।

উত্তরবঙ্গের এই পিছিয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি সুস্পষ্ট মূল কারণ–
১. শ্রম অভিবাসনে অভিগম্যতার অভাব: ভিসা প্রসেসিং, দালাল চক্রের অর্থ শোষণ এবং অভিবাসন ব্যয়ের উচ্চহারের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের দরিদ্র মানুষ বিদেশে পাড়ি জমাতে পারছেন না। 
২. দক্ষতার অভাব: উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা মূলত কৃষিনির্ভর বা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিবেচিত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি বেতনের কারিগরি কাজে তাদের প্রবেশাধিকার কম। 
৩. তথ্য ও সচেতনতার ঘাটতি: সরকারি ও বেসরকারি অভিবাসন সংস্থাগুলোর কেন্দ্রমুখী কার্যক্রমের কারণে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষ নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
উৎস দেশগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য এখনও আমাদের রেমিট্যান্সের মূল চালিকাশক্তি হলেও ইউরোপ ও এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের অবদান ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এককভাবে ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়ে সৌদি আরব শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। নির্মাণ ও সেবা খাতে বিশালসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকের উপস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য রেমিট্যান্সের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
৫.০৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়ে যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এটি নির্দেশ করে যে, দক্ষ পেশাজীবী ও উচ্চশিক্ষিত প্রবাসীদের (বিশেষ করে পেশাদার খাত ও ব্যবসা থেকে) আয়ের একটি বড় অংশ এখন দেশে আসছে। মালয়েশিয়ায় সাম্প্রতিক শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের বিনিয়োগবান্ধব মনোভাব রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।

উচ্চ প্রবৃদ্ধির এই আনন্দের আড়ালে কিছু দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে, যা দ্রুত বিবেচনায় নিতে হবে:

ক. রেমিট্যান্স ব্যবহারের অনুৎপাদনশীল খাত: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণা দেখা যায়, দেশে আসা রেমিট্যান্সের সিংহভাগই ব্যয় হয় দৈনন্দিন ভোগ (consumption), জমি ক্রয় ও গৃহনির্মাণে। শিল্প বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি বা উৎপাদনশীল খাতে এ অর্থের ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। ফলে রেমিট্যান্স বাড়লেও এটি স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারছে না।

খ. দক্ষতার অভাব ও মাথাপিছু আয় কম: আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে বড় অংশ অদক্ষ। ফিলিপাইন বা ভারতের মতো দেশগুলো স্বল্পসংখ্যক দক্ষ পেশাজীবী পাঠিয়ে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স আয় করে, বাংলাদেশ তার চেয়ে দ্বিগুণ শ্রমিক পাঠিয়েও তা পারে না। 

গ. হুন্ডি ও অফিসিয়াল চ্যানেলের টেকসই ধরে রাখা: ব্যাংকিং খাতে সংস্কার না হলে এবং নমনীয় মুদ্রা বিনিময় হার বজায় না থাকলে প্রবাসীরা পুনরায় অনানুষ্ঠানিকতার (হুন্ডি) দিকে ঝুঁকতে পারেন।
তবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের এই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে রেমিট্যান্সকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উৎপাদনশীল জাতীয় শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। এ জন্য তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন:

ক. উত্তরবঙ্গকেন্দ্রিক বিশেষ অভিবাসন উদ্যোগ: পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রামের মতো পিছিয়ে পড়া জেলাগুলোর যুবকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগে সুদবিহীন বা স্বল্প সুদে ‘অভিবাসন ঋণ’-এর ব্যাপক সম্প্রসারণ করতে হবে এবং এসব জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোকে (TTC)  ঢেলে সাজতে হবে। খ. দক্ষতাভিত্তিক শ্রম রপ্তানিনীতি: কৃষিভিত্তিক কাজের বাইরে গিয়ে আইটি, নার্সিং, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং এবং মেকানিক্যাল কাজের ওপর আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। গ. রেমিট্যান্স বন্ড ও বিনিয়োগে উৎসাহিতকরণ: প্রবাসীরা যাতে তাদের অর্জিত অর্থ কেবল জমি কেনায় অপচয় না করে পুঁজিবাজার, গ্রিন বন্ড, অবকাঠামো খাত এবং ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ করতে পারেন, সে জন্য আকর্ষণীয় সুদের হার ও কর ছাড়ের সুবিধা-সংবলিত বিশেষ স্কিম চালু করতে হবে। ঘ. বিকেন্দ্রীভূত সুবিধা ও ব্যাংকিং সেবা: ঢাকার বাইরে প্রান্তিক জেলাগুলোতে বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানোর সহজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে হুন্ডি চক্রগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে অবৈধ সুযোগ নিতে না পারে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রেমিট্যান্স হিসেবে পাওয়া ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি আমাদের কোটি প্রবাসীর রক্ত পানি করা পরিশ্রমের ফসল। তবে এই অর্জনের আড়ালে যে আঞ্চলিক অসমতা ফুটে উঠেছে, তা দূর করতে না পারলে সুষম জাতীয় উন্নয়ন অধরাই থেকে যাবে। সরকারি নীতিকে কেবল ‘মোট রেমিট্যান্স বৃদ্ধি’র মানসিকতা থেকে বের করে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ অভিবাসন নীতি’র দিকে চালিত হতে হবে। 

কাজী আহমেদ শামীম:  অভিবাসনবিষয়ক বি‌শ্লেষক

আরও পড়ুন

×