শিল্প খাত
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল পেতে করণীয়
এম এম শহিদুল হাসান
এম এম শহিদুল হাসান
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট এখন শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে না, দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে গত এক দশকে দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি, বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহে সামান্য অস্থিরতাও সরাসরি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ৫৪ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা। এই বিপুল ব্যয় একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক খরচও বাড়িয়ে দিচ্ছে। যে জ্বালানির সরবরাহ মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে কোনো দেশের জন্যই নিরাপদ নয়।
দেশে দৈনিক গড় গ্যাস সরবরাহ বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি), অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন প্রায় তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এই ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে, যার একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকট দেখা দিলেই দেশের জ্বালানি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়ে যায়।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জ্বালানি নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তনের দাবি জানায়। তবে সমাধান শুধু আরও বেশি জ্বালানি আমদানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; বরং জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। আর এই রূপান্তর হতে হবে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সীমিত ভূমি, উচ্চ জনঘনত্ব এবং কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে বাংলাদেশের জন্য এমন একটি জ্বালানি কৌশল প্রয়োজন, যা একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে।
দেশের বর্তমান জ্বালানি চিত্র
বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও এর বাস্তব অবদান এখনও সীমিত। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে সৌরবিদ্যুতের স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় ৭৯৭ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি, কয়লাভিত্তিক প্রায় আট হাজার ৪০০ মেগাওয়াট এবং ফার্নেস অয়েলভিত্তিক প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও মাত্র ১.৫ শতাংশের কাছাকাছি।
অর্থাৎ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এখনও মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এ ধরনের একটি ব্যবস্থা স্বল্প মেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। কারণ এর ওপর নির্ভর করতে হয় আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, বৈদেশিক মুদ্রার প্রাপ্যতা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর।
তাই আগামী দিনের লক্ষ্য শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা হবে নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও টেকসই। এর জন্য জ্বালানির উৎসে বৈচিত্র্য আনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ধীরে ধীরে বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের জন্য উপযোগী নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশল অবলম্বনের পথে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা প্রযুক্তি নয়; জমি। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার চাপে কৃষিজমি ক্রমেই কমছে। তাই উন্নত বিশ্বের মতো হাজার হাজার একর জমি ব্যবহার করে বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ বাংলাদেশের জন্য সব ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কৃষিজমি রক্ষা করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা।

এই বাস্তবতায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথগুলোর একটি। শিল্পকারখানা, গুদাম, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি স্থাপনার বিশাল ছাদগুলোকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে পরিণত করা সম্ভব। বিশেষ করে শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় এক হওয়ায় এ ব্যবস্থা অর্থনৈতিকভাবেও কার্যকর। নেট মিটারিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ হলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে।
একই সঙ্গে কৃষি ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। সৌরচালিত সেচ ব্যবস্থা ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে কৃষির উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে পারে। পাশাপাশি সেচের চাহিদা কম থাকার সময়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব। নদী, খাল, জলাধার ও পুকুরে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। এর মাধ্যমে কৃষিজমি ব্যবহার না করেই পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। তবে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মৎস্য সম্পদ, নৌপরিবহন, সেচ ব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়গুলো অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুফল বহুবিধ
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবে না। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পনীতি, রপ্তানি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা এখন উৎপাদন প্রক্রিয়ার কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশগত মানকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্প, বৈশ্বিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
তবে সৌরবিদ্যুৎ একাই জ্বালানি সংকটের সমাধান নয়। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দিনের আলো ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। তাই একটি আধুনিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন ব্যাটারি শক্তি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, স্মার্ট গ্রিড, উন্নত সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো এবং কার্যকর গ্রিড ব্যবস্থাপনা। পাশাপাশি বায়ুবিদ্যুৎ, বায়োমাস, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সম্ভাবনাও কাজে লাগাতে হবে।
এর পাশাপাশি জ্বালানি দক্ষতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যুতের অপচয় কমানো অনেক ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর ও ব্যয়সাশ্রয়ী। শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিতে দক্ষতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সময়ের দাবি: পরিকল্পিত জ্বালানি রূপান্তর
অতিরিক্ত আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান শুধু আরও বেশি জ্বালানি আমদানিতে নয়; বরং পুরো জ্বালানি ব্যবস্থার একটি পরিকল্পিত রূপান্তরে। দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার, জ্বালানি দক্ষতার উন্নয়ন, আধুনিক বিদ্যুৎ অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা। সর্বোপরি বাংলাদেশের জ্বালানি ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে দেশের নিজস্ব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। সীমিত ভূমি ও বিপুল জনসংখ্যার দেশে অন্য দেশের জ্বালানি মডেল হুবহু অনুসরণ করে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
এম এম শহিদুল হাসান: ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও সাবেক উপাচার্য, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ
- বিষয় :
- শিল্প খাত