সমাজ
মান্দার স্কুল থেকে জাতির ‘শিক্ষা’
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২১
| প্রিন্ট সংস্করণ
বিষয়টি হয়তো অত গুরুতর নয়, তাই জাতীয় সংবাদপত্রে ঠাঁই পায়নি। কী এমন ঘটেছে মান্দায়? সামাজিক মাধ্যম থেকে এটুকুই জানা যায়, বিলবয়রা গয়েশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাবিবুর রহমান দুজন ছাত্রকে শাসন করেছেন। একজন ছাত্র হাসপাতালে ভর্তি। অপরাধ, ছাত্র দুজন বিদ্যালয়ে আসে না। হাইকোর্টের আদেশ আছে– ছাত্রদের বেত্রাঘাত করা যাবে না। বিদ্যালয়ে না এলে প্রধান শিক্ষক কি শাসন করতে পারবেন না! বিদ্বজ্জনেরা বলেন, প্রধান শিক্ষক শাসন না করে মোটিভেশন করতে পারতেন!
বিদ্যালয়টি উপজেলা সদর থেকে ১২-১৪ কিলোমিটার দূরে। স্থানীয় জনসাধারণের দান ও উদ্যোগে ১৯৭৪ সালে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের আগে বাংলায় স্থানীয়ভাবে টোল আর মক্তব পরিচালিত হয়ে আসছিল। এটাই ছিল আমাদের মজ্জাগত। কোম্পানি আমাদের ব্যবসা ও শাসন ব্যবস্থা দখল করে নিয়ে প্রথমেই স্থানীয় ধারার শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করে। অন্তত দুই প্রজন্মকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে দূরে রাখার পর ১৮৩৫ সালে আধুনিক ধারায় হাই স্কুল স্থাপন শুরু হয় ঢাকায় কলেজিয়েট স্কুল স্থাপনের মাধ্যমে। এটি অবিভক্ত বাংলায় প্রথম সরকারি হাই স্কুল। ১৮৫৪ সালে উডস ডেসপাচ জারির পর সরকারি অনুদানে বেসরকারি হাই স্কুল স্থাপন শুরু হয়। এর কয়েক বছর পর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উৎসাহে জমিদাররা হাই স্কুল স্থাপন করতে থাকেন। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলে স্থানীয় ধনাঢ্য, বিদ্যোৎসাহীর উদ্যোগে চলতে থাকে স্কুল-কলেজ স্থাপন। যারই একটি বিলবয়রা গয়েশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়।
বেসরকারি স্কুলগুলোর দেখভাল, যত্ন-আত্তি, শিক্ষকদের নিয়োগ, বেতন-ভাতা সবই করত ম্যানেজিং কমিটি। ১৯৮৪ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে স্কুলগুলো এমপিওভুক্ত হলো। শিক্ষকদের বেতন নির্ধারিত হলো সরকারি বেতন স্কেলে। শিক্ষকদের বেতন প্রথম দিকে কিছু অংশ সরকার, বাকি অংশ দিত ম্যানেজিং কমিটি। এখন সিংহভাগই দেয় সরকার। অনেক স্কুলে সেটুকুই শিক্ষকদের প্রাপ্তি। স্কুলের ভবন নির্মাণ, মেরামতের দায়িত্বও সরকারের। তাই এখন স্কুলে একটা টয়লেট বানাতেও হাত পাততে হয় সরকারের কাছে। ভবন নির্মাণও তাই। ১৯৮৪ সাল থেকে ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগে স্থাপিত বেসরকারি বিদ্যালয়ের সিংহভাগেরই অভিপ্রায় এমপিওভুক্তি।
এসব গ্রামীণ বিদ্যালয় বিশেষত হাই স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশকে পড়াশোনার ফাঁকে কৃষিকাজ, পণ্য পরিবহন, বাজারে বেচাকেনা করতে হয়; পরিবারের অন্যদের সঙ্গে বা কখনও একা।
মান্দা নওগাঁ জেলায়। সেখানে গাছ থেকে আম পাড়া, গ্রেডিং করা, বাজারে নেওয়ার কাজে যে স্কুলের ছাত্ররা আটকে পড়েনি, তা কে জানে! প্রধান শিক্ষক যাদের শাসন করেছেন, তারা কী কাজে বা অ-কাজে স্কুল কামাই করেছে, জানা নেই।
গ্রামীণ স্কুল হিসেবে এসএসসি পরীক্ষার ফল বেশ ভালো। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে যথাক্রমে ৩১, ৩৭, ৪৫, ২৬ ও ২১ জন। পাঁচ বছরে পাসের হার যথাক্রমে ১০০, ৭০.২৭, ৯৫.৫৫, ৮৪.৬২ ও ৬৬.৬৭ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছিল যথাক্রমে ২, ১৩, ৭, ২ ও ০ জন। এ বছরের ফল বেরিয়েছে স্কুলের অঘটনটির পরে। পাসের হার মাত্র ২৫.৮১ শতাংশ; মানবিক বিভাগ থেকে ৯ জনের কেউই পাস করেনি। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২২ জনের আটজন পাস। কেউ জিপিএ ৫ পায়নি।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদের পাঠবিমুখতায় প্রধান শিক্ষক কেন উদ্বিগ্ন হবেন না? শিক্ষকের চাওয়া তো এটাই– তাঁর ছাত্ররা সবাই পাস করে বেরিয়ে যাক সমাজের বৃহত্তর অঙ্গনে। সেই চাওয়া থেকে ছাত্রকে শাসন করেছেন। ৪ আগস্ট গোটা স্কুল ফুঁসে ওঠে; প্রধান শিক্ষককে তালাবদ্ধ করে তাঁর মোটরসাইকেল জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ এসে উদ্ধার করে প্রধান শিক্ষককে; পোড়া মোটরসাইকেলটি নিয়ে যায় আলামত হিসেবে।
সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেল স্কুল ভবনের জরাজীর্ণ দশা। ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীকে বলতে শোনা গেল, তাদের টয়লেটের সমস্যা। অবাক ব্যাপার, মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগে কেউ বাধা দিল না! ভয় হচ্ছিল, এই বুঝি ছাত্ররা প্রধান শিক্ষককে আটকে রাখা কক্ষে আগুন দেয়! উস্কানি পেলে হয়তো আগুন লাগিয়ে দিতে পারত গোটা স্কুল ভবনেই। ছাত্রদের বাইরে যারা ঘটনাটির ভিডিও করছিলেন, তারাও কেন এই তৎপরতায় বাধা দিলেন না? একজন অবশ্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় ফোন করায় পুলিশ এসে প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করে।
কেন এই নৈরাজ্য ঘটল প্রত্যন্ত গ্রামের এক হাই স্কুলে? শিক্ষার্থীরা যা করেছে, তা দুই বছর ধরে সারাদেশে ডালভাত হয়ে গেছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাই স্কুল, কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়– কোথায় হেনস্তা হননি শিক্ষকরা! ভাইস চ্যান্সেলরও নাকাল হয়েছেন ছাত্রদের হাতে। শিক্ষকদের শিক্ষা দিয়েছে ছাত্ররা। রাষ্ট্র দেখেও দেখেনি অথবা প্রশ্রয় দিয়েছে। বিলবয়রা গয়েশিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররা দুই বছর অপেক্ষা করে নিন্দনীয় কাজ করেছে। তাদের হেডস্যারকে আটকে রেখেছে; মোটরসাইকেল পুড়িয়েছে। সৌভাগ্য, কেউ ছাত্রদের উৎসাহ দেয়নি স্কুলটাই পুড়িয়ে দিতে বা শিক্ষকদের রোস্ট বানাতে।
এখন জাতি কী করতে পারে? এই ছাত্রদের মহান কীর্তিকে কুর্নিশ বীরের মর্যাদা দিতে পারে অথবা স্কুলটির পাঠদান বন্ধ করে বর্তমান ছাত্রদের ছাত্রত্ব চিরতরে বাতিল করতে পারে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন এমন শিক্ষকদের অন্যান্য স্কুলে নিয়োগের ব্যবস্থা করা হোক। ছাত্র ও যদি কোনো শিক্ষক জড়িত থাকেন, তাদের বিরুদ্ধেও ফৌজদারি অপরাধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অতীতের ভুল সংশোধন, শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে কি এখন তাহলে সকল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে স্থানীয়দের হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে? ম্যানেজিং কমিটি স্কুলের আয়ের উৎস তৈরি করবে; শিক্ষক নিয়োগ, বেতন-ভাতা দেবে; ভবন নির্মাণ-মেরামত প্রভৃতি করবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভালোমন্দ সব কিছুর দায় ম্যানেজিং কমিটির হাতে থাকবে। সরকার এখন যেমন শিক্ষার্থীদের বই জোগাচ্ছে, তেমনি বই জোগাবে, সিলেবাস দেবে, নীতিমালা তৈরি করবে, লেখাপড়ার মান তদারক করবে, পাবলিক পরীক্ষা নেবে? তাহলে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যাদা বুঝবে?
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
- বিষয় :
- আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী