ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার : ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কূটনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে
×

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা

মাহফুজুর রহমান মানিক 

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

ড. ইশরাত জাকিয়া সুলতানা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি কানাডার ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি থেকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার ব্রক ইউনিভিার্সিটি থেকে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতিসংঘের এফএও, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ ছাড়াও  উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করেছেন। পিএইচডি গবেষণায় তাঁর ফোকাস ছিল রোহিঙ্গাদের পরিচয় বিনির্মাণ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক 

সমকাল: ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট, রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর পূর্ণ হলো। ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে এই সংকটকে আপনি কীভাবে দেখছেন? 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: ২০২৬ সাল রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর বটে, তবে রোহিঙ্গা সংকট চলছে কয়েক দশক ধরেই। খুব বেশি পেছনে না গেলেও ১৯৭৮ সাল থেকে এ দেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের রেকর্ড আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। বিষয়টিকে শুরুতে দ্বিপক্ষীয়ভাবে দেখা হতো বলে এবং বাংলাদেশ এককভাবে এ সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মহল এ বিষয়ে ততটা জানতে পারেনি। কিন্তু ২০১৬-১৭ সালে যা হয়েছে, তা অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে।
সমকাল: ২০১৭ সালে রাখাইনে ব্যাপক গণহত্যার প্রেক্ষিতেই রোহিঙ্গারা প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তখন আশ্রয় দিতে অনুরোধ করে। সে জন্য শুরুতে বিশ্বের দৃষ্টি এ সংকট ঘিরে থাকলেও এখন কি রোহিঙ্গা বিষয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অগ্রাধিকার হারিয়েছে?

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: ২০২৪ পর্যন্ত লোক দেখানো কিছু সংলাপ হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের চিড়িয়াখানার প্রাণী বা জাদুঘরে সংরক্ষিত জড়ো বস্তুর মতো প্রদর্শনীর উপযোগী সামগ্রীতে পরিণত করা হয়েছে। ফলে তারকা থেকে শুরু করে বাদশাহ-রানী-নোবেলজয়ী-রাজনৈতিক নেতা সবাই তাদের ‘দেখতে’ এসেছেন; সেলফি তুলেছেন। দান-খয়রাতও করেছেন সাধ্যমতো। পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে তাদের ক্যাম্প পরিদর্শনের ঘটনা। তারপর কী? রোহিঙ্গারা যে অনিশ্চয়তায় ছিল, সেখানেই রয়ে গেছে।  
সমকাল: বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক বরাদ্দও কমছে…।

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: আমরা উভয় সংকটে আছি। দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর না করলে এক ধরনের বিপদ। আর নির্ভর করলে বিপদ আরেক ধরনের। এটা ঠিক, বাংলাদেশের পক্ষে এত বিপুল অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং ক্যাম্প ব্যবস্থাপনায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু এ পরিস্থিতি যে হতে পারে, সেটা আমাদের দূরদর্শী কূটনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক এবং নীতিনির্ধারকদের সময় থাকতে ভাবা উচিত ছিল। বৈশ্বিক পরিস্থিতি কখনও স্থিতিশীল থাকে না। যার যার স্বার্থ অনুযায়ী দেশগুলোর সম্পর্কের রূপরেখা বদলে যায়। কিন্তু আমাদের মতো সীমিত সম্পদের এবং দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ যদি ধরেই নেয়– সারাজীবন বাইরে থেকে তহবিল আসবে আর এভাবেই চলবে, তা মহাভুল। আমরা নিজেদের স্বার্থ দেখিনি; রোহিঙ্গাদের স্বার্থও দেখিনি। সম্ভবত এখনও ধারণা করতে পারছি না, সামনে কী চাপ অপেক্ষা করছে।

সমকাল: বাংলাদেশ তো এ সংকটের সমাধান হিসেবে শুরু থেকেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা বলে আসছে। এত দীর্ঘ সময়েও প্রত্যাবাসন কার্যকর না হওয়ার পেছনে কি বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতা আছে?

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: আমরা জাতি হিসেবে অনেক মানবিক। পৃথিবীতে আপনি দ্বিতীয় উদাহরণ পাবেন না, এভাবে জিরো প্রিপারেশনে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত কয়েক লাখ মানুষকে একটা রাষ্ট্র কোনো রকম সহিংস ঘটনা না ঘটিয়ে আশ্রয় দিয়েছে, খাওয়াচ্ছে এবং আশ্রিতদের সংখ্যা হোস্ট কমিউনিটি অর্থাৎ স্থানীয় জনগণের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেলেও সেটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হচ্ছে না। আমাদের মানবিকতা পরিণত হয়েছে দুর্বলতায়। তাই প্রত্যাবাসন তো দূরের কথা, এর উদ্যোগও নিতে পারিনি। একজন রোহিঙ্গাও যায়নি ২০১৭ সালের পর। বরং প্রতিদিন আসছে।

সমকাল: বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল প্রশ্নবিদ্ধ তাহলে? 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যর্থতার সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের সীমাবদ্ধতাকে আমরা অবশ্যই এক করে দেখব। সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় বুঝতে হবে, মিয়ানমার আমাদের নিকটতম প্রতিবেশীদের একটি। কিন্তু আমরা কি আমাদের এই প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক নির্মাণ করতে পেরেছি? আমরা মিয়ানমারকে মূল্যায়ন করি রোহিঙ্গা সংকট দিয়ে। কিন্তু মিয়ানমারের সঙ্গে সংস্কৃতি, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে মতবিনিময় বা সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা কি করেছি কখনও? এটা ঠিক, জাতিগতভাবে মিয়ানমার যথেষ্ট রক্ষণশীল এবং একগুঁয়ে। কিন্তু আমরাও তো চেষ্টা চালাইনি তাদের কাছে যেতে। অথচ দেখুন, বাণিজ্য কিন্তু ঠিকই চলছে দুই দেশের মধ্যে। তারা সার, সিমেন্ট, ওষুধ নিচ্ছে। আমরা আনছি ইয়াবা। করিডোর তো আনঅফিসিয়ালি চালুই আছে। এই পরিস্থিতিতে কূটনীতি যতটুকু কৌশলী হওয়া দরকার ছিল, তা হয়নি কখনও।   

সমকাল: রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যকরে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে এখন কী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন? 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: বিষয়টি বেশ জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে। এখন কোনো একক ব্যবস্থায় নয়, বহুমুখী ব্যবস্থায় বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে পরিবর্তন আনার কথা ভাবতে হবে। প্রথমত, চীনের সঙ্গে শুধু এই বিষয়টি নিয়ে কার্যকর আলোচনা করতে হবে। মিয়ানমারের সামরিক সরকারের টিকে থাকা এবং সশস্ত্র আরাকান আর্মির যুদ্ধ– দুটোতেই চীনের ব্যাকআপ আছে। মিয়ানমারের ওপর চীনের প্রভাবের কারণেই চীনের সঙ্গে বসতে হবে। আবার এ-ও ঠিক, কেবল চীনের সঙ্গে কথা বললেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের অপর প্রতিবেশী দেশকে পাশে পাওয়া যাবে না– এটা নিশ্চিত। সুতরাং সরাসরি মিয়ানমারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। জাতিসংঘ অনেক আগেই নখদন্তহীন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। সম্মেলন বা বৈঠকের জন্য খুব ভালো জায়গা হতে পারে। কিন্তু এই জটিল সমস্যার সমাধান তাদের কাছ থেকে আসার সম্ভাবনা নেই। জান্তা ও আরাকান আর্মি; উভয়ের সঙ্গেই কথা বলতে হবে আমাদের জাতীয় স্বার্থ সামনে রেখে। 

সমকাল: প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি কতটা অনুকূল?

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও প্রত্যাবাসন উপযোগী নয়। কবে হবে, তাও অনিশ্চিত। রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এখন আর জান্তার হাতে নেই। সুতরাং ভেরিফিকেশন গেমে তারা সময় নষ্ট করতেই পারে। আরাকানের নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে। জান্তা তালিকা চূড়ান্ত করলেও আরাকান আর্মি রাজি না হলে প্রত্যাবাসন হবে না। আবার সেখানকার রাখাইনরা যদি বিরোধিতা করে, তাহলেও প্রত্যাবাসন নিরাপদ ও টেকসই হবে না। আর রোহিঙ্গারা যাওয়ার আগে যদি ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন মিয়ানমার সংশোধন না করে, তাহলে প্রত্যাবাসিত হয়েও তারা নিজ ভূমে পরবাসীর মতো থাকবে এবং পরিস্থিতি জটিল হলে আবার তারা বাংলাদেশে আসবে। মিয়ানমার কোন স্বার্থ থেকে তাদের আইন বদলাবে? কী লাভ তারা পাবে? বাংলাদেশ কি এসব দিক বিবেচনায় রাখছে?  

সমকাল: মিয়ানমার সম্প্রতি বাংলাদেশে থাকা প্রায় তিন লাখ ৯ হাজার রোহিঙ্গাকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে স্বীকার করেছে। কিন্তু আপনার বক্তব্য অনুসারে তো এই প্রক্রিয়াকে প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি হিসেবে দেখা যাবে না, তাই না?  

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: পরিতাপের বিষয়, বাংলাদেশ কখনও প্রশ্ন করেনি– কীসের ভিত্তিতে এই ভেরিফেকেশন? এতদিন রোহিঙ্গারা ছিল ‘অবৈধ বাঙালি’ এবং বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী। তাহলে আরেক দেশের মানুষের ভেরিফিকেশন মিয়ানমার এখন কেন করবে? বাংলাদেশ কোনোদিন জানতে চেয়েছিল– কবে, কোন পথে, কতজন বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে মিয়ানমারে? আবার রোহিঙ্গারা যদি মিয়ানমারেরই হয়, তাহলে কেন ভেরিফিকেশন লাগবে? এটাকে বরং ট্রাস্ট ট্র্যাপ বলতে পারেন। আমাদের এবং রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস আদায়ের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনকে আরও পিছিয়ে দেওয়ার একটি ছল হতে পারে।  

সমকাল: চীন, ভারত, আসিয়ান, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ– প্রতিটি পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত? চীনের কথা আপনি কিছুটা বলেছেন। 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: আপনি যাদের কথা বললেন, তারা কেউ আসলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পক্ষে নয়– এমন প্রমাণ অতীতে তারা রেখেছে। বাংলাদেশকে তাদের প্রত্যাবাসনের পক্ষে আনতে কৌশল ঠিক করতে হবে। বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি, বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুবিধা, নাকি অন্য কোনো কিছু– যার মাঝে তাদের লাভ রয়েছে; রয়েছে বাংলাদেশেরও স্বার্থ। সে রকম বিষয় সামনে নিয়ে আসতে হবে। চীনের সঙ্গে যে সাম্প্রতিক বৈঠক হলো, এত এজেন্ডার ভিড়ে রোহিঙ্গা ইস্যু স্থানই পেল না। অথচ এটা ছিল মোক্ষম সুযোগ। নাকি আমরা আমেরিকাকে খুশি করতে গিয়ে চীনকে সম্পৃক্ত না করার কথা ভাবছি? সেটাও খুব কাজের হবে না। আসিয়ানকে চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে মালয়েশিয়াকে দিয়ে। তাদের প্রিন্সিপল অব নন-ইন্টারফেয়ারেন্সের মতো বিচিত্র নীতিতে সংশোধন আনার জন্য। যেখানে গণহত্যা ঘটছে, সেখানে হস্তক্ষেপ না করা কেন মানবাধিকারের বিরোধী হবে না?  

সমকাল: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে গাম্বিয়ার করা মামলাকে সমর্থনের পাশাপাশি বাংলাদেশ কীভাবে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে? 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: এই জায়গায় বাংলাদেশের দুর্বল পারফরম্যান্স বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বাংলাদেশ ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসি কাজে লাগানো, লবিস্ট নিয়োগ; এসব দিক থেকে পিছিয়ে। অথচ গণহত্যার বিচারে বাংলাদেশের কৌশলের অংশ হওয়া উচিত ছিল এগুলো। আমরা এখন পর্যন্ত মিয়ানমারকে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটিই উচ্চারণ করাতে পারলাম না। উল্টো নতুন শব্দগুচ্ছ আবিষ্কার করেছি: এফডিএমএন (ফোর্সফুলি ডিসপ্লেসড মিয়ানমার ন্যাশনালস)। মিয়ানমারকে খুশি করার জন্য ২০১৭-১৮ সালের স্বাক্ষরিত বন্দোবস্তে রোহিঙ্গা শব্দটিও উল্লেখ করা হয়নি। এ মানসিকতা ছেড়ে গাম্বিয়ার মামলাকে সমর্থনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা অন্যান্য বিচারিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য বাংলাদেশকে অনেক সাহসী হতে হবে।

সমকাল: রোহিঙ্গা সংকট এখন মানবিক সমস্যার পাশাপাশি অর্থনীতি, পরিবেশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি কী এবং সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের কী প্রস্তুতি থাকা উচিত? 

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা:  ২০১৭ সালে যে ১০ বছরের শিশুটি বাংলাদেশে এসেছিল, আজ সে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ। এ তরুণদের একটা বিরাট অংশ মাদক পাচার ইত্যাদির সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। টেকনাফ থেকে নৌকায় করে ঝুঁকিপূর্ণ সাগর পাড়ি দিয়ে ক্যাম্পের বন্দিদশা থেকে মুক্তির জন্য মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা দিয়ে মাঝসাগরে গিয়ে ডুবে মরছে। আর ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুগুলো লেখাপড়া থেকে বঞ্চিত থাকছে। রোহিঙ্গা পরিচালিত সশস্ত্র কিছু সংগঠন ক্যাম্প দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ক্যাম্পের ভেতরে অন্যান্য নিরাপত্তাহীনতার কথা নাই-বা বললাম। গণহত্যার ৯ বছরে রোহিঙ্গাদের সংকট জটিলতর রূপ ধারণ করেছে তাদের নিজেদের জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য, যা ঢাকায় বসে নীতিনির্ধারকদের পক্ষে, যাদের রোহিঙ্গা ক্যাম্প সম্পর্কে ধারণা নেই– বোঝা সম্ভব নয়।  

সমকাল: তাহলে করণীয় কী?

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি মোকাবিলায় প্ল্যান বি হাতে রাখতে হবে। সেটি হলো, শরণার্থী হিসেবে এসব মানুষকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে তাদের কাজ ও লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া। শুধু কক্সবাজার নয়; চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং অন্যান্য জেলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে রোহিঙ্গা তরুণরা কিন্তু জাল জন্মনিবন্ধন সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে ভর্তি হয়ে অনার্স-মাস্টার্সে পড়ছে। সুতরাং বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ– এই ঘোষণা দিয়ে আপনি যদি ভাবেন যে আপনি সঠিক কাজ করেছেন, তাহলে বলতে হবে, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। অসহায় অবস্থায় দীর্ঘ সময় মানুষকে থাকতে বাধ্য করা হলে সে নিজেই নিজের পথ খুঁজে নেয়– সেটা ন্যায্য-অন্যায্য যাই হোক। তাদের একটা পরিচয় দেওয়ার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান কিছুটা করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত, আমাদের একটা শরণার্থী নীতি থাকা উচিত। নীতি ছাড়াই অ্যাডহক ভিত্তিতে কয়েক দশক ধরে শরণার্থী পালন করে আসছি আমরা। এবার অন্তত একটা নীতি হোক, যার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন ইত্যাদি কীভাবে হবে; বিলম্ব হলে বাংলাদেশ কী করবে ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ অনুযায়ী নির্দেশনা থাকবে। 

সমকাল: বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ কী হওয়া উচিত?

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: আগামী ১০ বছরও যদি রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে থাকতে হয়, এতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। প্রত্যাবাসন, আন্তর্জাতিক চাপ, গণহত্যার বিচার এবং রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা– এই চারটি লক্ষ্য একই কৌশলে আনা দরকার। এটি সম্ভব জাতীয় শরণার্থী নীতির মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, চারটি লক্ষ্য পরস্পর যুক্ত এবং ভূ-রাজনৈতিক কৌশল, সামরিক শক্তি, মানবাধিকারের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। আমাদের প্ল্যান এ যদি হয় প্রত্যাবাসন, প্ল্যান বি হতে হবে রোহিঙ্গাদের পরিচয়দানের মাধ্যমে কাজ ও শিক্ষায় সুযোগ দান। কিন্তু তখন আবার মিয়ানমার বলবে, আমরা বলেছিলাম– কোনো গণহত্যা হয়নি। এর প্রমাণ বাংলাদেশ তাদের নিজেদের মানুষকে একীভূত করে নিচ্ছে। গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়াও তখন হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এর বাইরে আমাদের বিকল্প আছে কিছু? পরিচয় না দিলেও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের এ দেশে বসবাসের প্রায় পাঁচ দশক আর মিয়ানমারের গণহত্যার শিকার হয়ে রোহিঙ্গাদের এ দেশে বসবাসের প্রায় এক দশক কিন্তু চলে যাচ্ছে। মাঝখানে বাংলাদেশের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে। আমাদের বাক্সবন্দি চিন্তা থেকে বের হয়ে বাস্তবতা অনুযায়ী কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ সামনে রেখে কৌশল নিলে রোহিঙ্গা সংকটের জট খুলতে শুরু করবে।  

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ইশরাত জাকিয়া সুলতানা: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×