এই শতকের শেষে মানুষ থাকবে তো?
আশরাফুল মকবুল
প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৪:৫৪
লেখার শিরোনাম দেখে আঁতকে না উঠতে এবং পত্রপাঠ অধমের ওপর হামলে না পড়তে অনুরোধ জানাই। নিবেদন থাকবে, পুরো আলোচনা দয়া করে পড়ূন; তারপর চাইলে না হয় মুণ্ডুপাত করুন। আপত্তি করব না।
তিনটি কারণে ওপরে বর্ণিত আশঙ্কা আমার মনে দানা বেঁধেছে। প্রথম কারণ হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী জলবায়ুর দৃশ্যমান ও ব্যাপক পরিবর্তন। মাত্র কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রলয়ঙ্করী দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল; বলিউডের ফিল্মপাড়া কপালগুণে রক্ষা পেয়েছে। এরপর শুরু হলো অস্ট্রেলিয়ায়; এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। কয়েক কোটি পশুপাখি পুড়ে মরেছে, সঙ্গে অর্ধশতাধিক মানুষও মৃত্যুবরণ করেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ গাছগাছালির ক্ষয়ক্ষতি তো বর্ণনার বাইরে, অকল্পনীয়। অস্ট্রেলিয়া সরকার দশ হাজার বুনো উটকে গুলি করে মারতে বাধ্য হয়েছে আদিবাসী মানুষের পানীয়জলের সম্ভাব্য সংকট মোচনের জন্য। ঝড়ঝঞ্ঝা-সুনামি-ভূমিকম্প-অগ্ন্যুৎপাত অল্প বিস্তর লেগেই আছে কোথাও না কোথাও। মেরু অঞ্চলে জমাট বরফ দ্রুত গলে যাচ্ছে, তাতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে নিচু এলাকা (যার মধ্যে নিউইয়র্ক নগরী, আঞ্চলিক রাষ্ট্র মালদ্বীপ এবং বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল রয়েছে) প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। নতুন নতুন রোগব্যাধি (ইবোলা, সার্স ও সর্বশেষ চীনের করোনাভাইরাস) জনমনে অস্থিরতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এগুলো অ্যাডাম স্মিথের বলা সেই 'পজিটিভ চেক' নয়তো? এত কিছুর পরও বিচিত্র ব্যাপার, কার্বন নির্গমন কমানো তথা পরিবেশ সুরক্ষার গ্লোবাল চুক্তির প্রতি অনীহা দেখিয়ে কেউ কেউ সেখান থেকে সরে যেতে চাচ্ছেন।
পরিবেশ দূষণের ফলে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে, আরও অনেক প্রজাতি বিপন্ন অথবা ঝুঁকিতে। কয়েকদিন আগে পত্রিকায় পড়লাম- পোকামাকড়, কীটপতঙ্গ বিলুপ্ত হয়ে গেলে তাতে মানুষের কী ধরনের ক্ষতি কিংবা বিপদ হতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। অপচনশীল প্লাস্টিক ও পলিথিনের কারণে নদীর প্রবাহে বাধা সৃষ্টি, নদীর তলদেশ ভরাট হওয়া, মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস, সমুদ্রদূষণ ও কচ্ছপ, স্পঞ্জের মতো সামুদ্রিক জীবের ব্যাপকহারে মৃত্যুর কথা প্রায়ই আলোচনায় আসছে। ওজোন স্তর ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ক্ষতিকর অতি বেগুনি রশ্মি সরাসরি প্রাণীর শরীরে পৌঁছে চামড়ায় ক্যান্সার হওয়ার সতর্কবাণী চিকিৎসকরা উচ্চারণ করছেন। অথচ অপ্রিয় সত্য বলার জন্য সেটা থুনবার্গকে আগে অর্থনীতি বিষয়ে পড়াশোনা করে (তাতে ভণ্ডামি মিলে প্রকৃত শত্রুকে কীভাবে আড়াল করতে হয়, তা ভালো করে তার শেখা হবে বৈকি) তারপর মুখ খোলার নসিহত শুনতে হচ্ছে। হরিয়ানার খড় পোড়ানোর ধোঁয়া এসে নয়াদিল্লি এবং সাভার-আশুলিয়ার ইটভাটার ধোঁয়া থেকে ঢাকার বায়ুদূষণের কথা তো এখনও কেউ ভুলতে পারেনি। এদিকে আবার ডেঙ্গু আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে দরজায় কড়া নাড়ার অপেক্ষা না করে সোজা ঘরে ঢুকে পড়তে চাইছে করোনাভাইরাস। দম ফেলার ফুরসতটুকুও যেন দিতে চায় না।
দ্বিতীয়ত, বিশ্বব্যাপী অপরিপকস্ফ, অদূরদর্শী, লোকরঞ্জনবাদী নেতৃত্বের উত্থান এবং তার দ্রুত বিস্তার। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তার একের পর এক বিদঘুটে কাণ্ডকারখানা আর টুইটার অনুরাগ দেখে চার বছরের মেয়াদ পুরো করতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করছিলেন। কিন্তু শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তিনি দিব্যি বহাল আছেন; এমনকি অভিশংসনকে তুড়ি মেরে দ্বিতীয় মেয়াদে তার তুঘলকশাহি প্রলম্বিত হতে যাচ্ছে বলে মনে হয়। আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপও পিছিয়ে নেই। বরিসের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্য তুমুল গতিতে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করে চলেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প 'যুক্তরাষ্ট্র প্রথম' ধুয়া তুলে মার্কিন জনমানসকে উগ্র, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের স্রোতে ভাসিয়েছেন; ঠিক তেমনি যে বরিস জনসনের ব্রেক্সিটের মূল সুরও প্রায় অভিন্ন- সাদা মানুষের দ্বীপরাজ্যে আমরা দরকার হলে নুন-ভাত খেয়ে থাকব, তবু ইউরোপের বাকি অংশ কিংবা অন্য মহাদেশের মানুষ এসে আমাদের এ সভ্য পুণ্যভূমি ছেয়ে ফেলুক, তা কোনোমতে হতে দেব না- এমনি গোঁ আর কি। সমাজতান্ত্রিক ধারার দুই বিশ্ব মোড়ল রাশিয়া ও চীন এখন আর গণতন্ত্রের পরোয়া করে না, বরং একনায়কতন্ত্র সাধনে মুক্তি অন্বেষণ করছে। নিকট প্রতিবেশী মিয়ানমার কিংবা ভারতই-বা কম যাবে কেন? জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা বেয়াড়া-অপছন্দনীয় অংশটিকে ঘাড় ধরে বের করে দিতে চক্ষুলজ্জার ধার কেউ বড় একটা ধারতে চাইছে না।

একদিকে প্রসার ঘটছে অসহিষুষ্ণতা এবং স্বার্থপরতার, বিপরীতে ব্যাকফুটে চলে যাচ্ছে মানবিকতা ও সহনশীলতা। নীতি-নৈতিকতার চর্চা এখন ভালো কিছু নয়; ব্যাকডেটেড মূল্যবোধ আঁকড়ে থাকার মতো। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বাড় বেড়েছে; তাই 'ব্যাপক বিধ্বংসী মারণাস্ত্র আয়ত্ত করেছে'- এই অজুহাতে দাও হামলা চালিয়ে ধ্বংস করে। ইরানের মোল্লাতন্ত্র কথা শুনছে না, ওদের সঙ্গে কীসের আবার শান্তিচুক্তি? ড্রোন পাঠিয়ে ধুলোয় মিশিয়ে দাও পালের গোদা ওদের সেনাপতি সোলাইমানিকে। মার খেয়ে হজম করার দায় চিরকালই তো দুর্বলের। ধনতন্ত্র, বস্তুতান্ত্রিকতার বাড়বাড়ন্ত সমাজ কাঠামোকে দুর্বল করছে; দেশে দেশে, মানুষে মানুষে বৈষম্য বাড়ছে, ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে বোধশক্তিহীন যান্ত্রিক খোলসে পরিণত করছে। জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য খুঁজে না পেয়ে উদ্ভ্রান্ত তারুণ্য নিজেকে অপচয়ে নিঃশেষ করছে, মাদকে মুক্তি পেতে চাইছে; তারপর একসময় হতাশা থেকে অস্ত্র হাতে নিরীহ স্কুলশিশুদের নিশানা করছে। সমাজ-সংসারের এমন গুরুতর সংকট নিয়ে বিশ্ব মোড়লদের কারও মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। অত্যাচার-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা ঘটে যাচ্ছে; কিন্তু প্রতিকার চোখে পড়ছে না। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালত, অন্যায়ের প্রতিকার দিতে সবাই অসহায়, অপারগ, অকার্যকর। দেখেশুনে তাই মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছি? ধাবিত হচ্ছি আস্তে আস্তে রসাতলের পানে?
তৃতীয়ত, প্রযুক্তির বিকাশ ইদানীংকালে এত দ্রুত ঘটছে, যার সঙ্গে তাল মেলানো মানুষের জন্য ক্রমে কঠিন হয়ে উঠছে। তথ্যপ্রযুক্তি আমাদের অনেক কাজকে সহজ করেছে আবার পারিবারিক-সামাজিক বন্ধনকে আলগা করেও দিয়েছে। পরস্পর কথাবার্তা বা যোগাযোগ এখন সামনাসামনি, চোখে-মুখে যতটা হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে ফেসবুকে, কম্পিউটার-মোবাইলের স্ট্ক্রিনে। মানুষ সামাজিক জীব- এ কথার বদলে মানুষ যান্ত্রিক জীব- এমনটি বললে বোধহয় আরও বেশি সঠিক বলা হবে। বিশেষ করে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) অগ্রগতি মানুষ নামক রক্ত-মাংসের প্রাণীকে ক্রমশ যেন কোণঠাসা, অপ্রাসঙ্গিক করে তুলছে। গবেষক-সমাজবিজ্ঞানীরা সতর্ক করতে শুরু করেছেন, অদূর ভবিষ্যতে শ্রমিক-কর্মচারীর অনেককে সরিয়ে এআই তথা রোবট একই কাজ দ্রুত এবং নামমাত্র খরচে করে দেবে। এতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির ভয় রয়েছে। হতাশ, পলায়নপর, নিজেকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে থাকা ধ্বংসোন্মুখ মানুষ অন্যের ভালোমন্দ বা অস্তিত্ব নিয়ে ভাববে না, এটাই স্বাভাবিক। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এ ধরনের অসুস্থ মানুষ যদি পরমাণু অস্ত্রের কাছে-পিঠে কোথাও দায়িত্ব পেয়ে যায়, তাহলে পরিণতি কী দাঁড়াবে?
বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং মৃত্যুর আগে পৃথিবী দ্রুত বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে মন্তব্য করে ভিন্ন গ্রহে বাসস্থান খুঁজে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছিলেন। এতক্ষণ যেসব কথা বললাম তার পাশাপাশি দায়িত্বশীল পদে আসীন মানুষের দায়িত্বহীন আচরণ বিশ্নেষণ করলে এ ধরাধামে আমাদের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে- তা অস্বীকার করা যাবে না। ধেয়ে আসা মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ভেবে ভুল করে ইউক্রেনের যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস করে প্রায় দুইশ' নিরীহ মানুষের প্রাণহানি যেভাবে ঘটানো হলো, তেমনটি ভবিষ্যতে আরও হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? এমন দুর্ঘটনা অতীতে আরও অনেক ঘটেছে। আগামী ৮০ বছরে (প্রযুক্তির এই রমরমা আবহে) আরও কত ঘটতে থাকবে, কে জানে!
ঘনায়মান বিপদের আভাস থেকেই বিষয়গুলো পাঠকের গোচরে আনা। সমাধানসূত্র জানা নেই। প্রত্যাশা, চিন্তাশীল মানুষরা এ সম্পর্কে ভাববেন এবং প্রয়োজন যেহেতু আবিস্কারের প্রসূতি, সবার মস্তিস্কে ঝড় উঠলে অস্তিত্ব রক্ষার কিছু না কিছু উপায় বেরিয়ে আসতেও পারে।
সাবেক সচিব
- বিষয় :
- বিশ্বব্যবস্থা
- আশরাফুল মকবুল
