উন্নয়ন
‘খাল খনন’ কর্মসূচি সফল করতে হলে...
শামসুল হুদা
শামসুল হুদা
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৫২
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৬ মার্চ খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। কৃষিজমিতে সেচের পানির প্রাপ্যতা, সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভরতা হ্রাস, পরিবেশ সুরক্ষা, প্রবহমান পানিতে মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধি; সর্বোপরি খাল ঘিরে বৃক্ষরোপণ অভিযান পরিচালনার নিরিখে কর্মসূচিটি বহুমাত্রিক সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কর্মসূচিকে যথাযথভাবে সফল করার পথে দৃশ্যমান বাধাগুলোও সংশ্লিষ্টদের নজরে রাখা জরুরি।
প্রথম বাধা হচ্ছে এর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ণয় প্রক্রিয়ায় আমলাতন্ত্রের প্রাধান্য এবং এক শ্রেণির শহুরে পরিকল্পনাবিদের মতামতের অকাট্য প্রভাব। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে গ্রামীণ সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষিজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা এবং অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর বিস্তারের ফলে গ্রামীণ সমাজের আর্থসামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে। এর প্রত্যক্ষ অভিঘাত আমাদের নদী, খাল, কৃষিজমি, জলাধারের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছে। এসব বিষয়ে শহুরে পরিকল্পনাবিদদের ধারণার সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
স্বীকার্য, খাল খননের সাধারণ জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ জাতীয় পর্যায়েই হবে। কিন্তু এর বাস্তবায়ন সফল করতে সার্বিক পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন কৌশল প্রণয়নের জন্য সাধারণ কৃষক, জেলে, নারী, বর্গাচাষি, আদিবাসী গোষ্ঠীর নারী-পুরুষের উপযুক্ত প্রতিনিধির মতামতও মূল্যবান।
মনে রাখতে হবে, বিগত ৪০-৫০ বছরে আমাদের দেশে কয়েক হাজার নদী, খাল, বিল, জলাধার হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে একাংশ প্রাকৃতিক কারণে ভরাট হয়েছে কিংবা পানি প্রবাহের অনুপস্থিতিতে বিলুপ্ত হয়েছে– সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনা ও পৃষ্ঠপোষকতায় শত শত নদী, খাল, জলাধার ভরাট হয়েছে। ধ্বংস হয়েছে, এটাও সত্য। সারাদেশে একসঙ্গে ওইসব খাল, নদী, জলাধার খনন বা উদ্ধার করা নিতান্তই অলীক কল্পনা, অবাস্তব। অবশ্যই ধাপে ধাপে এর অধিকাংশ উদ্ধারের পরিকল্পনা করতে হবে। শতভাগ উদ্ধারের চিন্তা বা চেষ্টা এই মুহূর্তে জরুরি নয়।
আশা করি, সরকার প্রায়োগিকভাবে বাস্তবধর্মী কর্মসূচিই বাস্তবায়নে উদ্যোগী হয়েছে। তা হলে অবশ্যই খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর ফয়সালা মাঠ পর্যায়ে কর্মকাণ্ড রূপায়ণের আগেই সেরে নিতে হবে।
১. আগামী চার-পাঁচ বছরে সরকার কতগুলো নদী, খাল, জলাধার খনন বা উদ্ধার করবে তার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। প্রথম বছর কতগুলো খাল খনন, নদীর ড্রেজিং করা সম্ভব, তাও সুনির্দিষ্ট করতে হবে। সেই খাল, নদীগুলো কোন জেলা-উপজেলায়, তা নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে জানাতে হবে।
২. এসব খালের অবস্থান, বিদ্যমান সংকট এবং খননের পর কীভাবে কৃষকরা, কৃষি ব্যবস্থা এবং সার্বিক পরিবেশে তার ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তার দ্রুত প্রাক-জরিপ হওয়া জরুরি।
৩. ধরে নিই, প্রথম বছরে ৩০টি জেলার ৬০টি উপজেলার ৬০টি খাল খনন করা হবে। তাহলে ওই ৬০টি খালের জন্যই সুনির্দিষ্ট প্রাক-জরিপ পরিকল্পনা আলাদাভাবে সম্পন্ন করতে হবে।
৪. এই পরিকল্পনা শুধু স্বেচ্ছাশ্রমের ওপর নির্ভর করে বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। স্বেচ্ছাশ্রমের ভূমিকা সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং একে একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ দেওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেটা এ কর্মসূচির একটি আবশ্যিক উপাদান হতে পারে। তবে পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নে শত শত গ্রামীণ শ্রমশক্তিকে এ কাজে নিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গ্রামে মাটি কাটার জন্য পুরুষ-নারী উভয় শ্রমজীবীই নির্ভরযোগ্য। গ্রামীণ বেকার, অর্ধবেকার শ্রমজীবীদের কর্মসংস্থানের একটা বড় আয়োজন বলেও এই কর্মসূচিকে বিবেচনা করতে হবে। আর সেটা করার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দও দিতে হবে। 
৫. পরিবেশবাদী সংগঠনগলো এবং ভূমিকর্মীদের তরফ থেকে দীর্ঘদিন থেকে একটি দাবি উত্থাপিত হয়ে আসছে। তা হলো– বুড়িগঙ্গা, তিস্তা, তুরাগ, করতোয়া, সোমেশ্বরী, বংশীসহ যেসব নদী দখলবাজদের আগ্রাসন কিংবা প্রাকৃতিক কারণে মৃতপ্রায়, সেগুলোকে সিএস রেকর্ডের ম্যাপ ধরে পুনরুদ্ধার করতে হবে। সেই দাবি এখনও বহাল। এটা মনে রাখা অপরিহার্য, খাল খননের পাশাপাশি নদী উদ্ধার কর্মসূচি না চালালে খালে পানির প্রবাহ মিলবে না। সেচের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
৬. খাল খনন কিংবা পুনর্খননের ক্ষেত্রেও সিএস রেকর্ডের ওই দাবি পুনরুত্থাপন করা যেতে পারে। তবে যেহেতু খালগুলোর দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা বিস্তার নদী বা কোনো শাখা নদীর তুলনায় অনেকটাই ছোট, সে কারণে এবং সাম্প্রতিক দশকগুলোর উন্নয়নের নানা প্রয়োজনীয় কিংবা অপ্রয়োজনীয় অর্থ লোপাটের প্রকল্পের সৃষ্ট বাধাগুলো খাল খননের সময় মাঠ পর্যায়ে অপসারণ প্রয়োজন জরুরি ভিত্তিতে। যেমন, যে খালটি সিএস রেকর্ড অনুযায়ী যেখান থেকে উৎপন্ন বা পতিত হয়েছে, সেই খাল বা নদীর অস্তিত্ব হয়তো এখন আর নেই। অথবা ওই খালের অংশবিশেষের ওপর গ্রামের স্থায়ী ঘরবাড়ি নির্মিত হয়েছে। যেগুলোর অপসারণ প্রায় অসম্ভব।
সেসব ক্ষেত্রে ওই খালের খনন বা পুনর্খননের জন্য যদি সিএস রেকর্ডের গতিপথে কিছু পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে হয়, সেটা বিবেচনায় নিতেই হবে। এ রকম সিএস রেকর্ডভুক্ত নয়, এমন ব্যক্তিমালিকানার জমির ওপর দিয়ে খাল নিতে হলে ওই জমির মালিকের পূর্বসম্মতির ভিত্তিতে তার জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সেই অধিগ্রহণ নিয়ম মেনে করতে হবে এবং দ্রুত মালিককে ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝিয়ে দিতে হবে। তার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে।
৭. খাল খনন কর্মসূচি কিছু আমলা, প্রকৌশলী, দলীয় লোক কিংবা ঠিকাদারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে এ কর্মসূচি প্রত্যাশিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যাবে। তাই এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রতিটি নির্দিষ্ট এলাকায় জেলা-উপজেলাভিত্তিক সরকার, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, পরিবেশকর্মী, এলাকার জনপ্রতিনিধি, কৃষক, নারী, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী তরুণ, শ্রমজীবী-কর্মজীবী সংগঠন এবং নদী আন্দোলনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে যৌথ বাস্তবায়ন তদারক কমিটি গঠন করতে হবে।
৮. সর্বোপরি খাল খনন ও পুনর্খনন কর্মসূচির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত থাকা জরুরি। এ জন্য যৌথ মনিটরিং সম্পন্ন হওয়ার পর তার প্রভাব বা ফলাফল মূল্যায়নও হওয়া উচিত কোনো স্বাধীন নিরপেক্ষ মূল্যায়ন সংস্থার মাধ্যমে।
৯. আর একটি কথা না বললেই নয়। যে কোনো সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, তার আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা এবং কম-বেশি দুর্নীতির প্রভাব। খাল খনন, পুনর্খনন কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং তার প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সেটা যথার্থই জাতীয় পর্যায় থেকে স্থানীয় স্তর পর্যন্ত সুসমন্বিত, সময়ক্ষেপণমুক্ত ও দুর্নীতিহীন, স্বচ্ছ হতে হবে।
খাল খনন কর্মসূচি মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নের সময় এমন অনেক দৃষ্টান্ত মিলবে, যেখানে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের রাস্তা, কালভার্ট কিংবা অন্য কোনো স্থাপনা বাধা হয়ে আছে। জনগণের ব্যাপকাংশ অপসারণ করতে চাইলেও মুষ্টিমেয় কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর লোক তার বিরোধিতা করছে। এসব ক্ষেত্রে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জরুরি হলে অপসারণও করতে হবে। তার জন্যই বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, যেমন স্থানীয় সরকার, সড়ক ও জনপথ, পানিসম্পদ, পরিবেশ, ভূমি, কৃষি, অর্থ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মধ্যে সব পর্যায়ে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমেই এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। তা হলেই তার ঈপ্সিত ফল দৃশ্যমান হবে। জনগণ উপকৃত হবে; কৃষির উন্নয়ন ও প্রসার ঘটবে। একই সঙ্গে পরিবেশ ও প্রতিবেশও সুরক্ষা পাবে।
শামসুল হুদা: মানবাধিকারকর্মী; নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
- বিষয় :
- উন্নয়ন
