ভূতের অনুসন্ধানে!
মঈদুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৮
দিন কয়েক আগে আমাদের প্রতিবেশী (আমাদের প্রতি তাদের কী যে বেশি, আর কী
যে কম!) এক দেশের টিভি চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে এক অংশগ্রহণকারিণীকে তার
'দাদাগিরি' দেখাতে দেখলাম, কেমন করে তারা অত্যাধুনিক সব ইলেকট্রনিক ডিভাইস
দিয়ে ভূতের ইনভেস্টিগেশন করেন! বাবা, ভূত আছে কি নেই তারই ঠিক নেই, তার
আবার ইনভেস্টিগেশন! তবে আমার অবস্থাটা একটু ভিন্ন। কেননা ঠিক ভূত নয়;
জিনের, তাও আবার হিন্দু জিনের (জিনের ধর্মবিশ্বাস বিষয়ে আমার সত্যিই কোনো
ধারণা নেই) মুখোমুখি পড়ে গিয়েছিলাম (ঘুটঘুটে অন্ধকারে তার মুখ-চোখ কিছুই
দেখিনি)। দীর্ঘকাল নিখোঁজ থাকা (তখনও 'গুম' শব্দ আসেনি) আমার এক চাচার
জন্য পুত্রশোকে কাতর আমার দাদি (পিতামহী) যেন কার পাল্লায় পড়ে নিখোঁজ জিন
হাজির করা এক কেরামত ফকিরকে হাজির করেন। দাদা (পিতামহ) তারাবির নামাজ পড়ে
আসার পর দরজা-জানালা বন্ধ করে বিছানার ওপর গোলাকারে আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে
বসে আলো নিভিয়ে কুলায় চাল ঘষে ঘষে মন্ত্রোচ্চারণযোগে ফকির সাহেব কেরামতি
শুরু করেন। নেহাতই নাবালক বয়সের কৌতূহলের প্রাবল্যে আমিও বসে ছিলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই যেন পশ্চিমের জানালার কপাটটা খটাস করে খুলে এক দমকা
হাওয়া ঢুকে জিনকে বসতে দেওয়া পিঁড়িটা সিলিং আর মেঝেতে ঠকাঠক করে শূন্যে
ঘুরিয়ে তাণ্ডব চালাতে থাকে। ফকির সাহেবের দেওয়া বিধানমতো সবাই নমস্কার
জানিয়ে মাফ চাইতে থাকেন। শান্ত হলে নিখোঁজের খোঁজ চাওয়ায় নাকিসুরে জানায়,
'ঐঁ দঁক্ষিণে আঁছে।' দক্ষিণের পূর্ণ ঠিকানা চাইলে বলে, 'বাঁরশ' টাঁকা
লাঁগবে।' দাদা দরাদরি করে ৬০০ টাকা পর্যন্ত উঠলেও জিনের তো একদর! রফা হলো
না। পরে দাদা বলেন, 'যতসব বুজরুকি!' দাদা হাজি নজিবুল্লা বিশ্বাসের
বিশ্বাসেই ঘাটতি ছিল, নাকি জিনের সঙ্গে ব্যবসা করার মতলব করেছিলেন, তার
সন্ধান এখনও পাইনি। জিনের সঙ্গে দরাদরি! জিন- ভূত বলে কি ব্যবসা বুঝবে না!
তবে কি জিন-ভূতেরা পেঁয়াজের ব্যবসাও করে! বাজারে এখন পেঁয়াজের যা চড়া দর,
ভূতের চড়ের চেয়ে এর চোটই-বা কম কীসে! ভাগ্যিস, পটোল নয়। না হলে বলতেন,
দুইশ' টাকা কেজি। খাবেন, নাকি তুলবেন! পেঁয়াজ সবজি জাতের বলে বাঙালি
একেবারে বস্তা বস্তা গেলে না। স্যুপ করে তো নয়ই, এমনকি আচার, চাটনি করেও
খুব একটা নয় অন্য সব দেশের মতো। তরিতরকারিতে মসলা হিসেবেই যা একটু-আধটু
দেয়। আর রোজার মাসেই কেবল একটু ধুম করে পেঁয়াজি খায়। কিন্তু সে রোজার মাস
তো 'হনুজ দুরস্ত'। পান্তা তো এখন শহুরে উৎসবের খাবার। এখন কেউ লিখতে
পারেন, 'পান্তা আমি খাই না/ পেঁয়াজ আমি পাই না/একটা যদি পাই/অমনি তারে
গাপুস গুপুস খাই।'
পেঁয়াজ আস্ত খেলে দুর্গন্ধ হয়। তা গালমন্দ তো খেতেই হবে। পেঁয়াজের মধ্যে
নাকি ৮৯ শতাংশই নির্জলা পানি; মাত্র ৯ শতাংশ কার্বোহাইড্রেট, যার আবার ৪
শতাংশ শর্করা, ২ শতাংশ আঁশ আর মাত্র ১ শতাংশ আমিষ, চর্বি। আর পুষ্টিগুণ
তেমন নেই। কুকুর-বিড়ালের কাছে তো তা রীতিমতো বিষ! এখন আমাদেরও তা অবশ্য
পরিহার্য বটে!
তবে
প্রাচীন মিসরীয়দের কাছে পেঁয়াজ ছিল অনন্ত জীবনের প্রতীক। সেকালে মিসরে লাশ
কবরস্থের কাজেও নাকি পেঁয়াজের ব্যবহার ছিল। প্রাচীন মিসরীয় সাম্রাজ্যের
২০তম রাজবংশের তৃতীয় ফারাও চতুর্থ রামেসেসের চক্ষুকোটরে পাওয়া পেঁয়াজের
নিশানা তা-ই বলে। এ তো দেখি মহার্ঘ্যই বটে। আমরা মসলা বানিয়ে মহাপাতকের কাজ
করেছি! ভোগান্তি ঠেকায় কে!
পেঁয়াজের কারবার একবার ভূতে পেয়েছিল মার্কিন মুলুকের শিকাগোতেও। ১৯৪০ সালের
দিক থেকে সেখানে চলছিল পেঁয়াজের 'ফিউচার্স ট্রেডিং' (ভূত নয়, একেবারে
ভবিষ্যৎ!) অর্থাৎ দরদাম ঠিক করে কেনাবেচার চুক্তি হবে, আসল কেনাবেচা হবে
পরে- 'বায়না-ব্যবসা', আসলে কম পুঁজির ফটকাবাজি। ১৯৫৫ সালের শরৎকালে স্যাম
সিজেল আর ভিনসেন্ট কসুগা নামে দুই পেঁয়াজ বেপারী হাজার হাজার টন পেঁয়াজ
কিনে গুদামে ভরে আর হাজার হাজার টন কেনার বায়না করে ফেলে। তাদের কেনা
পেঁয়াজ পানিজাহাজে করে (বিমানে নয়) পাঠাতে পাঠাতে আমেরিকার আর সব অঞ্চল পড়ে
ঘাটতিতে। এবার খেলল আসল চাল। তাদের কেনা সব পেঁয়াজে বাজার ভাসিয়ে দর
নামিয়ে দেবে বলে ভয় দেখিয়ে পেঁয়াজচাষিদের বাধ্য করল তাদেরই পেঁয়াজ আবার
কিনে নিতে। পচনশীলের পচন শুরু হলে কসুগারা গুদাম থেকে শিকাগোর বাইরে নিয়ে
সাফাই করে নতুনভাবে প্যাকিং করে আবার পানিজাহাজে শিকাগোতে আনতে থাকে। তাই
দেখে পেঁয়াজের আর সব বায়না-বেপারী ভাবে, এই ঢের পেঁয়াজে তো দর আরও পড়বে!
তারা বায়না থেকে বিরত থাকল। ওদিকে কসুগারা আসল সংগ্রহের চেয়ে বেশি বায়না
বেচে লাখ লাখ ডলার কামিয়ে নেয়। তারপর মওকামতো ১৯৫৬-এর মার্চে মৌসুম শেষে সব
পেঁয়াজ বাজারে ছেড়ে এ্যাইসা হাল করে যে, ২৩ কেজির এক বস্তা পেঁয়াজের দাম
ঠেকে ১০ সেন্টে, যা সাত-আট মাস আগেও ছিল ২ দশমিক ৭৫ ডলার। এমনই বেহাল যে,
বস্তাভর্তি পেঁয়াজের চেয়ে ওই বস্তারই দাম বেশি। চাষিরা চালানের চোতা ধরাহাত
মাথায় দিয়ে একেবারে পথে বসে যায়। অনেককে উল্টো খরচা করতে হয় নিজের উৎপাদিত
ও কেনা বিপুল পেঁয়াজ সরাতে।
এত কাণ্ড শেষে শিকাগোর 'কমোডিটি এক্সচেঞ্জ অথোরিটি' নামে অনুসন্ধানে,
কৃষিবিষয়ক সিনেট কমিটি আর হাউস কমিটিও শুনানি নিতে লাগে। শুনানিতে 'কমোডিটি
এক্সচেঞ্জ অথোরিটি' স্বভাবমতোই পেঁয়াজের দরের এই উদ্বায়িতার জন্য এর
পচনশীলতাই দায়ী বলে যুক্তি দেয়। তবে মিশিগানের কংগ্রেসম্যান জেরাল্ড
রুডল্ফ ফোর্ড (ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালের
আগস্টে পদত্যাগ করলে যিনি ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে প্রেসিডেন্ট পদে আসীন
হয়ে ১৯৭৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ১৯৭৪
সালের ৮ সেপ্টেম্বর ওই কেলেঙ্কারির ফৌজদারি দায় থেকে নিক্সনকে
প্রেসিডেন্টের ক্ষমা দেন) পেঁয়াজের এই বায়না-ব্যবসা বন্ধ করতে বিল তোলেন।
ব্যবসায়ীরাও ছাড়ার পাত্র নন। পেঁয়াজ মসলা বৈ প্রধান খাদ্য নয় বিধায় এর
ঘাটতি-পড়তি এমন বড় কোনো ইস্যু নয় বলে (বটেই তো!) যুক্তি তুলে সর্বশক্তি
নিয়ে নেমে পড়েন বিল ঠেকাতে। শিকাগো মার্কেন্টাইল এক্সচেঞ্জের প্রেসিডেন্ট
ই.বি. হ্যারিস এই বিলকে বলেন 'একটা সম্ভাব্য ইঁদুর খুঁজতে পুরো গুদাম
জ্বালিয়ে দেওয়া' বলে। তবে শেষাবধি বিল পাস হয় এবং ১৯৫৮-এর আগস্টে
প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার স্বাক্ষর করেন। হয়ে গেল 'অনিয়ন ফিউচার্স অ্যাক্ট,
১৯৫৮'। পেঁয়াজ কাটা পড়ল কমোডিটি এক্সচেঞ্জ অ্যাক্টের কমোডিটির সংজ্ঞা
থেকে। ব্যবসায়ীরা দমার নন। অন্যায়ভাবে তাদের ব্যবসা বন্ধ করা হয়েছে বলে
মামলা ঠুকে দিলেন ফেডারেল কোর্টে; রায় তাদের বিপক্ষে গেলে থামতেই হলো-
'হারি আর জিতি, পাঁচ-সাত বছর তো চলবে' বলে আপিল করার আইন সত্যিই নেই
সেখানে। টিকে গেল 'অনিয়ন ফিউচার্স অ্যাক্ট, ১৯৫৮', বহাল আছে এখনও। যারা এ
রকম আইন করার কথা ভাবছেন, তারা দেখে নিতে পারেন। আমি ভাবছি না। কেননা, আমার
আগের বারের গুড়ের আর আলুর ব্যবসার লোকসান তোলা বাকি। আইন মেনে তো আর
ব্যবসা হয় না! পেঁয়াজের বায়না-ব্যবসা আইনে বন্ধ হলেও এর দরের উদ্বায়িতা
নাকি এখনও থামেনি মার্কিন মুলুকে। আইন দিয়ে কি আর ব্যবসা ঠেকানো যায়!
আমাদের এখানে পেঁয়াজের এ বেহাল অবস্থার পেছনে কোন 'কসুগার' ভূত আছে, তাই
খুঁজতে আমাদের বাঘা বাঘা গোয়েন্দা গলদঘর্ম, হন্যে হয়ে খুঁজছেন; কিন্তু
কাগজি কোনো ছাপ মিলছে না! ডিজিটালের এই দেশে তো শুনি জিনে সোনাদানার 'ডবল
বেনিফিট স্কিম' দেয় মোবাইল ফোনে! তারা যদি পেঁয়াজের এই কারবার করেই থাকে,
তবে কি মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ রেখে কাগজে করবে!
মানুষেরাই যখন পেপারলেস অফিস চালানোর কথা ভাবছে, অনেক ক্ষেত্রে চালাচ্ছেও,
তখন জিন-ভূতেরা কি কাগজ দিয়ে কাজ চালাবে! আগে করেছে ইন্দ্রজালে, এখন তো
জুটেছে অন্তর্জালও (ইন্টারনেট)। অন্তর জ্বালায় অনুসন্ধানে লাগবে ডিজিটাল
চাল বা সরিষা। তবে কিনা, তুলা রাশি না হলে সনাতনের বাটিও চলে না।
সাবেক সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল)
[email protected]
- বিষয় :
- বাজার
- মঈদুল ইসলাম

