মাইকেল মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় চাই
এম আর খায়রুল উমাম
প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:০৯
যশোরবাসী দীর্ঘদিন মাইকেল মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের
আন্দোলন-সংগ্রাম করছে। কিন্তু মাইকেলের স্মৃতিধন্য সাগরদাঁড়িতে কপোতাক্ষ
নদের তীরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি এখনও পর্যন্ত সরকারের দৃষ্টি
আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। তবে যশোরবাসীর এ আন্দোলনের সঙ্গে দেশ-বিদেশের বহু
স্বনামখ্যাত প্রাজ্ঞজনের একাত্মতা রয়েছে। যশোরে একসময় স্থানীয় উদ্যোগে
মধুজয়ন্তীর সূচনা হলেও অচিরেই তা সরকারি উদ্যোগে রূপান্তরিত হয়ে যায়।
সরকারি উদ্যোগ যুক্ত হওয়ার ফলে মধুজয়ন্তীর ব্যাপকতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পেতে
থাকে। দেশ-বিদেশের প্রচুর অনুগামী ব্যক্তির অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানকে নতুন
মাত্রায় নিয়ে যায়। এখান থেকেই প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আবেদন উঠে আসে।
দেশ-বিদেশের গুণীজনের আবেদন বাস্তবায়নে যশোরবাসী নাগরিক কমিটি নির্বাচিত
করে কাজ শুরু করে, যা আজও চলমান। আন্দোলনের সময় প্রাথমিকভাবে দেখা যায়,
সরকার বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছে। তাই যশোরবাসী আশান্বিত হয়েছিল, তাদের
দাবি পূরণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হবে। কারণ, এই দুই দিকপালের পর
যে নামটি আসে তা হচ্ছে, মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আর কিছুদিন পর মহাকবি
মাইকেলের জন্মজয়ন্তী। তাই সেখানে আবার মাইকেল মধুসূদন সংস্কৃতি
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি সামনে আসবে। তবে এখন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের
যৌক্তিকতার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেছে।
আমাদের উচ্চশিক্ষার মান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দিন দিন প্রশ্নের মুখে
দাঁড়াচ্ছে। তার চেয়েও আশঙ্কার কথা, আমাদের শিক্ষা কৃষ্টিসম্পন্ন পরিশীলিত
মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থতার পরিচয় রেখে চলেছে। প্রায় প্রতিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়। বর্তমানে
আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর হানাহানি, মারামারি, কাড়াকাড়ির
প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে শিক্ষার্থীরা যে মানবিক গুণের
অধিকারী হতে পারে, তা মনে করতে পারাই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। এ রকম পরিস্থিতি
থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানো। তাই যশোরবাসীর দাবি,
সাগরদাঁড়িতে মাইকেল মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা
গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
আমাদের দেশে বিদেশি সমীক্ষা প্রতিবেদন খুব গুরুত্ব পেয়ে থাকে। তবে সেসব
প্রতিবেদন হতে হবে সরকারের পক্ষে। সরকারের বিপক্ষে কোনো প্রতিবেদন এলেই
সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা মিথ্যা বলে ঘোষণা দিতে। কোনোটাই প্রমাণ করার
প্রয়োজন পড়ে না, মৌখিক উচ্চারণই যথেষ্ট। কিছুদিন আগে ইউনেস্কো দেশের
নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। সারাদেশে
প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল প্রাপ্তির আনন্দ প্রকাশের এবং কে বা কারা প্রথম
মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি নেবে, সে বিষয়ে। কিন্তু কোনো
জায়গায় আলোচনা শুনতে পেলাম না যে কবে, কখন, কোথা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা
বাঙালির ঐতিহ্য? আমাদের বাংলা নববর্ষের অতীত ইতিহাসে মঙ্গল শোভাযাত্রার
স্থান কোথায়? ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে, তাই বাঙালি মঙ্গল শোভাযাত্রার
ধারক-বাহক হয়ে আপ্লুত। বিশ্বব্যাংক বলছে, বাংলাদেশ অর্থনীতির সব সূচকে
এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আপ্লুত হয়ে ঢাকঢোল বাজাচ্ছি। কিন্তু প্রতিবেদন যখন
প্রকাশ করছে বিশ্বব্যাংক, তাতে দেখা যাচ্ছে, মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার
আগের বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৭,
যা এখন ১৬৮-তে। এ ব্যাপারে কিন্তু আমাদের মন্তব্য নেই। কৈফিয়ত একটা শোনা
যায়, পরিসংখ্যান আপ-টু-ডেট না থাকার কারণে এ বিপর্যয়। যেমনটা ঘটছে আমাদের
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মান নিয়েও। বিশ্ব তালিকায় গর্বের
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থান লজ্জাজনক। লজ্জার কারণ অনুসন্ধানের কোনো দায়
নেই কোনো মহলেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
মানক্রম নির্ধারণে শিক্ষার পরিবেশ, গবেষণার সংখ্যা ও সুনাম, গবেষণার
উদ্ৃব্দতি, এ খাত থেকে আয়, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বা সংশ্নিষ্টতা ইত্যাদি
বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বৃদ্ধির
জন্য এসব বিষয়ের দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কেউ অনুভব করে বলে মনে হয় না।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের পদ-পদবি রক্ষায় নিবেদিত
থেকে সময় পার করে চলেছে। উচ্চাশী এসব ব্যক্তি রাজনৈতিক আশ্রয়ে ও প্রশয়ে
শুধু নিজেদের সীমাবদ্ধ করে রাখেনি। শিক্ষার্থীদেরও তাদের পাশাপাশি নিয়ে
চলেছেন। সমন্বিত এ উদ্যোগের মধ্যে শিক্ষার কোনো জায়গা আছে, তা আজকাল কেউ
খুঁজে পাচ্ছে না। সর্বত্র কোন্দলে ভরা। এসব কোন্দল নিরসন করে পরিবেশকে
শিক্ষা ও প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়নের উপযোগী করে তোলার গরজ কোথাও লক্ষ্য করা
যায় না। শিক্ষকরা পদ-পদবিপ্রাপ্তির জন্য জীবনের অর্জন বিসর্জন করে পদ
রক্ষায় নিবেদিত এবং শিক্ষার্থী নেতারা আগামী আভিজাত্যময় জীবন অন্বেষায়
বিকল্প পথের যাত্রী। সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটা সনদ হাতে পায়। অনেকে সনদকে
পণ্য বিবেচনায় প্রাপ্তির বিরাজমানতাও দাবি করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব
দর্শন ও বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গিয়ে এক অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বিদেশের কাছে নয়, দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
গুণগত মান প্রশ্নসাপেক্ষ। সঠিক মূল্যায়ন গবেষকদের ওপর ন্যস্ত থাক। তবে
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রথমে মানবিকতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জরুরি।
মানবিকতার উন্নয়ন ছাড়া কোনো মানের উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।
আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি বা রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বেড়াজাল
থেকে বের করে এনে নিজস্ব রাজনীতির সুযোগ ও পরিবেশ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। এ
পরিবেশ সৃষ্টিতে সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। আমাদের সংস্কৃতি খুব পুরোনো
বলে জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করলেও আবার তার
বিরোধিতাও দেখা যায়। তবে সেই পুরোনো সংস্কৃতির পথ ধরে কালের বিবর্তনে নানা
নতুন উপাদানে ঋদ্ধ হয়েই আজকের বাঙালি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। নতুন উপাদানে গড়ে
ওঠা এ সংস্কৃতি কিন্তু পূর্বের অনেক কিছুকে ত্যাগ করতে পারেনি। যেমন
বাঙালির মাছ-ভাতের সংস্কৃতি। মোগল-পাঠান-পর্তুগিজ-আরব-ইংরেজ ইত্যাদি সবাই
নতুন অনেক খাবার নিয়ে এসেছিল। এতে বাঙালির মাছ-ভাতের প্রতি আকর্ষণ
বিন্দুমাত্র বদলায়নি। এমন বহুধা উপচারে সজ্জিত বাঙালি সংস্কৃতির অতীত
ধারাবাহিকতার পথ ধরেই আজকের বাঙালি সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে। দুর্ভাগ্য এই যে,
বাঙালি সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে সামনে নিয়ে আসার এখন কোনো কার্যক্রম লক্ষ্য করা
যাচ্ছে না। কিন্তু আজকে সর্বত্র যে মূল্যবোধের সংকট, তা থেকে বের হওয়ার
জন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সমাজ-পরিবার-ব্যক্তি জীবনে ফেরত আনা অত্যন্ত জরুরি।
সে কারণে মাইকেল মধুসূদন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলে সংস্কৃতি চর্চা করার
সুযোগ সৃষ্টি ও বিস্তৃত হতে পারে।
মানুষ জীবনযাপনের লক্ষ্যে জীবিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে পরিবারের সেবায় নিবেদিত
হয়ে থাকে। সারাদিনের কর্মক্লান্তির অবসরে সাংস্কৃতিক বোধের জায়গা থেকে
মুক্তির পথ খুঁজতে সামান্য শান্তির আশায় আকাশের দিকে তাকায়। প্রকৃতির কোলে
চাঁদের জোছনার খোঁজে মুক্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে, আগামীর জন্য শক্তি সঞ্চয় করে।
কিন্তু আজকের মানুষরা দিন দিন সাংস্কৃতিক বোধহীনতার দিকে এগিয়ে চলেছে।
সামাজিক মানুষ হিসেবে পরিবারের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনও যে তার
কর্তব্যের মধ্যে পড়ে, তা আজ ভুলতে বসেছে। সমাজের একজন সদস্য হিসেবে
প্রাত্যহিক জীবনে অবসর সময়ে মানুষের, সমাজের আর রাষ্ট্রের প্রতি
দায়িত্ব-কর্তব্য স্বীকার করার মানসিকতা সৃষ্টি প্রয়োজন। প্রতিজন তার
সাধ্যের মধ্যে নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি প্রয়োগে পথ তৈরি করে নেবে। সবার মধ্যে
একটা চেষ্টার তৃপ্তির মহল তৈরি হবে, এটাই কাম্য। অতীতে আমাদের
রাজনীতিবিদ-শিক্ষক-চিকিৎসক-সাংবাদিক-সাহিত্যিক সবার মধ্যে সমাজসেবার এ
প্রবণতা দেখা যেত। জনহিতকর কাজে অংশগ্রহণে উৎসাহ ছিল, যা সাধারণ লোকের মনে
শ্রদ্ধা জাগাত আর বিস্ময়ের ভাব সৃষ্টি করত। মানুষকে আরও উদ্বুদ্ধ করত
সমাজকর্মে। অতীতের জনহিতৈষণার যেসব ছবি আমাদের সামনে আছে, তা যেন ধীরে ধীরে
ধূসর হচ্ছে, এখন আর তেমন ছবি আমরা দেখতে পাই না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার
পর বহু লোক কোটি টাকা রোজগার করলেও তাদের জনহিতকর কাজে উৎসাহ দেখা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাতব্য তহবিলের সংখ্যা এ কথাই প্রমাণ করে।
বাঙালি হুজুগে, বাঙালি ভাবপ্রবণ বলে নেতিবাচক কথা বললেও বাঙালির অবস্থান
মননশীলতায় উপমহাদেশের সব অঞ্চলের তুলনায় এগিয়ে ছিল। আজ মধ্যম আয়ের দেশ,
উন্নয়নের রোল মডেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ ইত্যাদি বলে পরিসংখ্যানের অবয়ব তৈরি
করা হচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন প্রশ্নের মুখেই থেকে
যাচ্ছে। সামগ্রিক পরিবেশের কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ঘুষ,
দুর্নীতি, সন্ত্রাস, সিন্ডিকেট বাণিজ্য, ব্যাংক জালিয়াতির মতো কর্মকাণ্ড
নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় বেড়েই চলেছে। মুক্তির জন্য যে মানসিকতার পরিবর্তন
প্রয়োজন, তার জন্য যে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসার, প্রচার ও গবেষণা
করে ঐতিহ্য রক্ষার ধারাবাহিকতাকে ফিরিয়ে আনতে হবে, তা সাধারণ মানুষ
গভীরভাবে অনুভব করছে। দেশ ও জাতির কল্যাণ বিবেচনায় সংশ্নিষ্ট সবাই আশা
করছে, আগামী মধুজয়ন্তীতে সরকার মাইকেল মধুসূদন সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়
স্থাপনের ঘোষণা দিয়ে সার্বিক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা গ্রহণ
করবে। জাতি অপসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে মুক্ত হোক। জাতির পিতার কাঙ্ক্ষিত
সোনার বাংলা গড়ে উঠুক।
প্রাবন্ধিক। সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]
- বিষয় :
- শিক্ষা
- এম আর খায়রুল উমাম
