আত্মজের পরিচয় সন্তান, পুত্র-কন্যা নয়
নাছিমা বেগম
প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২১
গত বছর ২৪ অক্টোবর সমকালে প্রকাশিত দোলার গল্প পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, একুশ
শতকের বাংলাদেশে এখনও দোলার বাবার মতো বাবারা রয়েছেন। দোলা একজন ইয়ং
লিডার। বয়স ১৫। রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের রাজাবাজার আইডিয়াল কলেজের
ছাত্রী। বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিকে প্রথম বর্ষে পড়ে। সে বাংলাদেশ জাতীয় শিশু
ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই
দোলা এই সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। শিশুকাল থেকেই সামাজিক দায়িত্ববোধ তাকে তাড়িয়ে
বেড়াত। সে তার বন্ধুদের সহায়তায় পাশের এলাকার ১২ বছর বয়সী এক শিশুর
বাল্যবিয়ে বন্ধ করে। গত ৮ থেকে ১৪ অক্টোবর সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে
ওয়ার্ল্ড ভিশন গ্লোবালের আয়োজনে সাত দিনব্যাপী 'হাউ চিল্ড্রেন আর
পার্টিসিপেটিং অ্যান্ড কন্ট্রিবিউটিং টু অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ' অর্থাৎ
শিশুরা কীভাবে শিশু বিয়ে বন্ধে ভূমিকা রাখতে পারে- এ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ
সম্মেলনে বাংলাদেশ থেকে শিশুদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য দোলা অংশ নেয়।
অবশ্য এ জন্য তাকে বাছাই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নির্বাচিত হতে হয়েছে।
মিষ্টি চেহারার দোলা সুদৃশ্য পডিয়ামের সামনে দৃপ্ত চোখে, প্রচণ্ড
আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বক্তৃতা দেয়। তার আগামী চলার পথ প্রশস্ত
করে। সবার অকুণ্ঠ প্রশংসায় বিদেশের মাটিতে নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবতী মনে হয়।
এত কিছুর পরও দোলার খুব মন খারাপ। বন্ধুদের অনেকের বাবা ফোন করে দোলাকে
অভিনন্দন জানিয়েছেন; কিন্তু নিজের বাবা একটিবারের জন্যও ফোন করেননি। দেশে
ফিরে বাবার কুশল জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। দোলার বাবার কাছে আমার
বিনীত প্রশ্ন- তিনি কি বুঝতে পারেন তার কন্যার অসামান্য প্রতিভার কথা? আমি
তো দিব্যি চোখে দেখতে পাচ্ছি, আগামীর নেতৃত্বে এ শিশু একদিন বড় জায়গা করে
নেবে। এ রকম একটি সন্তানকে কোন বিবেচনায় তিনি অবহেলায় ঠেলে দিচ্ছেন! তার
উত্তর তিনিই ভালো জানেন। কারণ দোলা কন্যা হয়ে জন্মেছে। এর দায় তো দোলার নয়।
এ দায় কিন্তু দোলার বাবার। বিজ্ঞানে এটি পরীক্ষিত সত্য। মাতৃগর্ভে
পুত্রসন্তানের আগমনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব যেমন পিতার, তেমনি পুত্রসন্তান না
জন্মানো, এর দায়ও পিতার। নারী-পুরুষের সমতার এই যুগে তিনি এখনও মান্ধাতার
আমলের মানসিকতা নিয়ে একটি পুত্রসন্তানের আশায় কার্যত জনসংখ্যা বৃদ্ধি
করছেন। তিনি হয়তো জানেন না, আমাদের দেশে বহু দম্পতি রয়েছেন, যারা শুধু একটি
কন্যাসন্তান নিয়েই মহাখুশি। তাদের সব আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু তাদের
এই আদরের সন্তান। তারা পুত্রের আশায় দ্বিতীয় সন্তানের জন্য চেষ্টাও করেননি।
অনেকের আবার দুটি কন্যাসন্তান রয়েছে। তারা সেখানেই থেমে গেছেন। তৃতীয়
সন্তান নিয়ে পরিবারে জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটাননি।
দোলার বাবাকে অনুরোধ করছি, দোলার দিকে একবার চোখ তুলে তাকান। দেখবেন, নিজের
অজান্তেই চোখের কোণ ভেসে যাবে। মনে হবে, কী ভুল করেছেন এতদিন! স্নেহবঞ্চিত
করেছেন শুধু দোলাকে! নাকি নিজের অজান্তেই কন্যাকে আদরে আদরে ভরিয়ে দেওয়ার
পিতৃহৃদয়ের সুখের যে তৃপ্তি, তা থেকে বঞ্চিত করেছেন নিজেকে। অনেক দেরি হয়ে
গেছে বাবা! আর বিলম্ব নয়। একে একে সবাইকে, একসঙ্গে সবাইকে স্নেহের
মায়াডোরে বুকে টেনে নিন। তা না হলে অনেক বড় খেসারত দিতে হতে পারে। আর যে
ক্ষতি, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
আমি
এখানে একটি গল্পের কথা তুলে ধরতে চাই। অনেকটা দোলার গল্পের কাছাকাছি। সময়
সঠিক মনে নেই। সম্ভবত ২০-২৫ বছর আগের ঘটনা। টিভিতে দেখা একটি সিরিয়াল।
যতটুকু মনে আছে, এক দম্পতির পরপর পাঁচটি মেয়ে। একটি পুত্রের আশায় স্ত্রীকে
পরপর গর্ভবতী হতে হয়। পাঁচ কন্যার পর তারা আর কন্যাসন্তানের জন্ম দিতে
চাননি। কিন্তু পুত্রের প্রত্যাশা শেষ হয় না। এবার নতুন ব্যবস্থা। সন্তান
গর্ভে আসার একটি নির্দিষ্ট সময় পরে তারা টেস্ট করে যখনই জানতে পারেন, অনাগত
সন্তান কন্যা হবে, তখন তারা বিলম্ব না করে গর্ভপাত ঘটান। এ রকম বেশ ক'বার
গর্ভপাত ঘটানোর পর তাদের জীবিত কন্যাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা
দেয়। তারা ভাবে, তাদের পিতা-মাতার পুত্রের দরকার; কন্যা নয়। প্রতিবাদ
হিসেবে পাঁচ বোন মিলে এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। তারা বাবা-মার কাছে একটি
চিরকুট লেখে- 'তোমাদের পুত্রের দরকার; কন্যা নয়। তাই আমরা স্বেচ্ছায়
তোমাদের ছেড়ে চলে গেলাম।' এই চিরকুট লেখা শেষ করে পাঁচ বোন একসঙ্গে বিষপানে
আত্মহত্যা করে।
বর্তমানে নারী-পুরুষ সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল।
আর এটা কিন্তু শুধু কথার কথা নয়; বাস্তবতা। শতবর্ষ আগে বেগম রোকেয়া নারীর
ক্ষমতায়নের জন্য যে স্বপ্ন বুনে গেছেন, সে স্বপ্নের আজ অতিক্রমণ ঘটেছে।
১৯৯১ সাল থেকে অদ্যাবধি মাঝখানে দু'বছরের তত্ত্বাবধায়কের আমল বাদ দিলে
পুরোটা জুড়েই সরকারপ্রধান, বিরোধীদলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা- সবাই নারী। ২০১৩
সাল থেকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সংসদ পরিচালনা করছেন একজন নারী স্পিকার।
বিচার বিভাগের আপিল বিভাগের ৭ জন বিচারপতির মধ্যে একজন নারী বিচারক রয়েছেন।
হাইকোর্ট বিভাগ এবং অধস্তন আদালতের বিচারকরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে
বিচারকার্য সম্পাদন করছেন। আপিল বিভাগের মর্যাদাসম্পন্ন তিনটি
কমিশনপ্রধানের মধ্যে একজন নারী দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া প্রশাসনে সিনিয়র
সচিব-সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, মাঠ প্রশাসনের
সর্বক্ষেত্রে, বিশেষ করে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী
অফিসারের মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারী কর্মকর্তারা অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে
তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
একটু চোখ-কান খোলা রেখে একবার ভাবুন তো, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত কোন
পেশায় নারীরা কাজ করছে না? কোথায় নারীরা ব্যর্থ হচ্ছে? আমি সেদিন খবরের
কাগজে ছবিসহ একটি প্রতিবেদনে দেখতে পেলাম, একজন নারী রীতিমতো পুরুষের সমান
তালে গরু জবাই করছেন। তিনি গরুর চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কেটে বিক্রি করেন। খাঁটি
বাংলায় যে পেশাদারকে কসাই বলা হয়। একজন নারী সেই সাহসী পেশা বেছে নিয়েছেন।
নারীরা আজ মাছ ধরছেন, কেউ কেউ বাজারে বসে মাছ বিক্রি করছেন। কেউবা ছেলেদের
চুল কাটার মতো চ্যালেঞ্জিং পেশা বেছে নিয়েছেন। যেসব নারী সাহসের সঙ্গে
এগিয়ে এসে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে এসব পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদেরকে আমি সালাম
জানাই। এসব কাজে সমাজের কুসংস্কারের আগল ভাঙার কাজটি করার সাহস তারা
দেখিয়েছেন। আমরা যারা সিভিল সার্ভিসের কর্মী, তাদের চেয়ে তৃণমূলের নারীদের
এসব চ্যালেঞ্জিং পেশাকে কোনো অংশেই খাটো করে দেখা যাবে না। এত কিছু দেখার
পরও কেন এখনও বাবাদের পুত্রের প্রত্যাশায় দিন গুনতে হয়? কেন বাবারা চোখ
খুলে সামাজিক বিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন না, তা আমার বোধে আসে না। এখনও সমাজে
এমন পিতা রয়ে গেছেন- ভেবে নিজের কর্মদক্ষতার ওপরেই প্রশ্ন আসে।
আমরা কেন বাবা-মাকে শেখাতে পারলাম না- সন্তানকে পুত্র-কন্যা হিসেবে নয়,
সন্তান হিসেবে পরিচিতি দিতে। একটি পুত্রসন্তান জন্মের অপেক্ষায় থাকেন পিতা।
সন্তান ভূমিষ্ঠের পর পুত্র না হলে তার চারপাশ ঘিরে থাকে নিকষ কালো
অন্ধকার। বিষণ্ণতায় ভোগেন। স্ত্রী-কন্যার ওপর খÿহস্ত হতে দ্বিধা করেন না।
কেন? কেন? কেন? এই প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়ায় আমাকে। বেগম রোকেয়া তার লেখনীতে
নারীর পাশে পুরুষকে সহযাত্রী হিসেবে চেয়েছেন। অবস্থার উত্তরণে কন্যাদের
শিক্ষিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষের সর্বক্ষেত্রে
নারীর যোগ্যতাকে সামনে নিয়ে এসেছেন। বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকারের
সর্বজনীনতায় নারী-পুরুষ সবাই সমান। জন্ম থেকেই মানুষের যে অধিকার জন্মায়,
তা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন
- বিষয় :
- সমাজ
- নাছিমা বেগম
