ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

'কে তাহারে চিনতে পারে'

'কে তাহারে চিনতে পারে'
×

জয়া ফারহানা

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪৬

অল্টার ইগো, ডুয়ালিটি বা দ্বৈতসত্তার কথায় প্রথমেই চলে আসে সেই বিখ্যাত বিজ্ঞানী চরিত্র ড. জেকিলের কথা। কেন আসে, সে এক প্রশ্ন। কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই তো একাধিক মুখ। মুখে উচ্চারণ না করলেও মন জানে। আবার অনেক সময় নিজেদের বহুসত্তা আমরা ঠিক বুঝতেও পারি না। স্কটিশ লেখক রবার্ট লুইস স্টিভেনসন ড. জেকিলকে এমন জীবন্তভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, দ্বৈতসত্তা বা বহুসত্তার কথায় নিজেদের আগে ড. জেকিলের কথাই মনে পড়ে। নিতান্ত-নিরীহ একজন বিজ্ঞানী এক ওষুধ সেবনে কীভাবে নৃশংস নরঘাতকে রূপান্তরিত হতেন, কিছুতেই তা ভুলতে পারে না পাঠক, দর্শক। আমরা প্রত্যেকেই কি একেকজন ড. জেকিল নই? শক্তিশালী কোনো ড্রাগ ছাড়াই আমরাও কি দ্বৈতসত্তা কখনও বহুসত্তাকে লালন করি না? যাকে ভালোবাসি তাকে আঘাত দিই, কেউ অন্যায্য কাজ করছে বুঝেও তার তোষামোদি করি, বাইরে খুবই ওয়ার্কোহলিক, ঘরে ঢুকে কুটোটুকু দু'ভাগ করতে চাই না। একই মানুষের দুটি মন কি একই সঙ্গে সক্রিয় নয়? যে সংবেদনশীল মন শীতার্ত মানুষের কষ্ট সহ্য করতে না পেরে নিজের গায়ের শীতের কাপড় অনায়াসে দান করে, ওই একই মানুষ আবার ভিন্নমত সহ্য করতে না পেরে কাউকে পিটিয়ে মেরেই ফেলে। যে মন যারপরনাই গঠনশীল, সেই মনই আবার ধ্বংসাত্মক।


এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে, আমাদের প্রত্যেকেরই একাধিক সত্তা আছে। এমন সত্তাও আমাদের ভেতরে ঘুমন্ত আছে, যা আমরা ব্যবহার করিনি। সত্তার এই টানাপোড়েন সারাক্ষণই চলে আমাদের ভেতর। মানুষের ভেতরের এই বহুসত্তার কথা ভেবে হয়তো লালন লিখেছিলেন, 'এক মন বসে বসে ছবি আঁকে, আরেক মন বসে বসে রং মাখে, আবার সেই ছবিটাই সম্পন্ন হয়ে গেলে নষ্ট করে দেয় আরেক মন।' আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'পিতৃবিয়োগ' গল্পের আশরাফ আলীর চরিত্রটি স্মরণ করতে পারি। যিনি একই সঙ্গে দুটি সমান্তরাল জীবনযাপন করে গেছেন। একটি সত্তায় আশরাফ আলীর ভূমিকা মধ্যবিত্ত পরিবারের গম্ভীর স্বল্পভাষী দায়িত্বশীল পিতার; আরেকটির ভূমিকায় তিনি আড্ডাবাজ, প্রগলভ, ছন্নছাড়া। ইয়াকুব আলীর পিতা আশরাফ আলী কখনও হাসেন না এবং সবসময় উচ্চস্তরের চিন্তা করেন। আরেকটি ভূমিকায় তিনি নিজে তো হাসেনই, অন্যদেরও হাসি-আনন্দে ইয়ার্কি-ঠাট্টায় মাতিয়ে রাখেন। 'পথের পাঁচালী'র মা অন্তপ্রাণ অপু যখন অপরাজিত উপন্যাসে মাকে হারায়, পাঠক হিসেবে ভেবেছিলাম, অপু হয়তো এই জীবনে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। বিস্ময় নিয়ে আমরা পাঠকরা লক্ষ্য করি, মায়ের মৃত্যুর পর অপুর প্রথম অনুভূতি, বন্ধনের কষ্ট থেকে মুক্তির স্বাদ। সাধারণ মানুষের দ্বৈতসত্তা বা বহুসত্তায় ক্ষতির পরিসর সীমিত। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণদের সত্তার বিরোধ যখন প্রকট হয়ে দাঁড়ায়, তখন তার পরিণতি ভোগ করতে হয় অনেককে।

রোম পুড়ে যাচ্ছে, নিরো বাঁশি বাজাচ্ছে- এ কথাটি কমবেশি আমরা সবাই শুনেছি। নিরো যে নিষ্ঠুর শাসক ছিলেন, সেটাও হয়তো অনেকেই জানি। কিন্তু হয়তো কমসংখ্যক জানি, কিশোর নিরো ছিলেন অসম্ভব অনুভূতিপ্রবণ। সংগীতের প্রতি প্রবল টান ছিল নিরোর। অসাধারণ বাঁশি বাজাতেন কিশোর বয়সেই। সেই সংবেদনশীল কিশোর নিরো কেমন করে রোমের পুড়ে যাওয়া দেখে অবলীলায় বাঁশি বাজিয়েছিলেন, সেটা ভেবে দেখার বিষয়। কোনো ঐতিহাসিক গবেষকের লেখায় হয়তো একদিন তা বেরিয়েও আসবে। যা হোক, দৈতসত্তা ততক্ষণ পর্যন্ত নির্দোষ, যতক্ষণ তা অন্যের ক্ষতির কারণ না হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের অনেকেরই মনে পড়ে যাবে চ্যাপলিনের মঁসিয়ে ভের্দ্যুর কথা। যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দা, তারপর পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য খুনকে জীবিকা হিসেবে নেওয়া ভের্দ্যুর বিপক্ষে অনেক আদর্শবাদী কথা বলা যেতে পারে। কিন্তু পরিস্থিতি বিরূপ হলে কে যে ভের্দু্য হবো আর কে যে হবো না, তা বলাও মুশকিল। আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা দেয় দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট উপন্যাসের মিশকিন চরিত্রটি। বিদগ্ধ মিশকিন মস্কো নগরীর এলিট শ্রেণির অন্যায়-অবিচার দেখে দেখে পরিণত হয়েছিল ইডিয়টে। কিংবা অধিকতর সত্যি বোধহয় এটাই যে- সমাজে অন্যায়ই ন্যায়, সেখানে মিশকিনরা ইডিয়টই। মিশকিনরাই পরিগণিত হয় অপ্রকৃতস্থ হিসেবে, শেষ পর্যন্ত তাদেরই যেতে হয় পাগলা গারদে।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়কে নাকি তার ঘনিষ্ঠ একজন বলেছিলেন, আপনাকে দেখে এত শান্তশিষ্ট মনে হলে কী হবে, আপনি প্রয়োজনে খুনও করতে পারেন। উত্তরে শীর্ষেন্দু বলেছিলেন- হবেও-বা, আমার ভেতরে হয়তো এক ঘুমন্ত খুনি রয়েছে; তবে সে জেগে উঠুক, তা আমি কস্মিনকালেও চাই না। ঘুমন্ত খুনি জেগে না উঠুক, কাজী নজরুলের মতো যাদের বঞ্চিত বুকে দিন দিন পুঞ্জিত অভিমান ফেনিয়ে ওঠে, তাদের অভিমানের পরিণতিও খুব সুখকর হয় না। আমাদের চারপাশটা একটু লক্ষ্য করলে এমন অভিমানী মানুষের খোঁজ মিলবে। আসলেই তারা ভীষণ একা, সামাজিক জীবনে ত্রুটিহীন ভূমিকা পালন করতে করতে ক্লান্ত; কিন্তু সমাজচ্যুত হওয়ার চাপ নিতে অপারগ বলে একরকম মেনে নিয়ে মানিয়ে চলছেন। মানুষের জন্মগত ঝোঁক হয়তো একদিকে, সামাজিক প্রথা ও অনুশাসন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অন্যদিকে। কেউ হয়তো সংগীতশিল্পী হতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারিপার্শ্বিক ও পারিবারিক চাপে প্রবেশ করেছেন করপোরেট পেশায়। কেউ হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী, হয়েছেন ব্যাংকার। এমন পরিস্থিতিতে জন্মগত প্রবৃত্তির সঙ্গে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের একটা চাপা সংঘাত থাকে, সেই চাপা সংঘাতকে চেপে রাখার চাপও থাকে।

দুই

ইচ্ছা, আবেগ ও চিন্তার জন্ম কোথায়? কে নিয়ন্ত্রণ করে এসব? জিন পরিবেশ নাকি অভিজ্ঞতা? মুক্তিযুদ্ধে যিনি স্বজন হারিয়েছেন আর যিনি হারাননি, মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে এই দু'জনের আবেগ কখনও একরকম হবে না। দ্বিতীয়জনের আবেগ কখনই প্রথমজনের আবেগের মাত্রাকে ছুঁতে পারবে না, যতই চেতনার কথা বলা হোক না কেন। সড়ক দুর্ঘটনায় যিনি প্রত্যক্ষ ক্ষতির শিকার এবং যিনি নন, সড়কের বিশৃঙ্খলা নিয়ে এই দু'জনের ক্ষুব্ধতা কিছুতেই একরকম হবে না। সবাই আমরা একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি না, যে কারণে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের আবেগের রকমফের ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু আমরা যদি প্রত্যেকের আবেগকে সম্মান করি, তাহলে অনেক সামাজিক সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। অন্যের মতকে গুরুত্ব দিলে, প্রতিটি মানুষকে আবেগ প্রকাশের সুযোগ করে দিলে, ভিন্ন মতের প্রতি দমন-পীড়ন না চালালে, অনেক পরস্পরবিরোধী সত্তার সংঘাত কমেও আসে। কিন্তু এসব নিয়ে যে একটু থিতু হয়ে ভাবা দরকার, তা কি গুরুত্বপূর্ণরা ভাবেন? আমরা যখন অমীমাংসিত যানজটের মধ্যে বসে হাঁসফাঁস করি, তখন থাকি বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, অসহিষুষ্ণ। আবার যখন পূর্ণিমা রাতে গীতা দত্তের 'নিশি রাত বাঁকা চাঁদ আকাশে' বা 'ঐ সুরভরা দূর নীলিমায়', 'ছায়াঘেরা স্বপ্নসীমা'র মতো মায়াবী সুরেলা গান শুনি, তখন মন থাকে প্রসন্ন, স্নিগ্ধ, শান্ত। প্রায় নিশ্চিত করে বলতে পারি, টেলিভিশন এখনও যে কোনো নির্ধারিত অনুষ্ঠানের পরিবর্তে 'হারানো সুর', 'সপ্তপদী', 'অবুঝ মন', 'ময়না মতি' দেখালে বহু দর্শক কাজ ফেলে টিভির সামনে বসে যাবেন। এর মানে এই সংঘাতপ্রবণ সময়ও মানুষের ভেতরের শান্তিপ্রিয় রোমান্টিক সত্তাটিকে কেড়ে নিতে পারেনি। অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেমওয়ালা অ্যানোডাইজিং ডোরের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের নস্টালজিক মন খোঁজে পেল্লাই কাঠের দরজা, খড়খড়িওয়ালা শিকের জানালা। কোন সে অদৃশ্য সুতো আমাদের সামনে যাওয়ার পথে পেছনে টেনে ধরে? পৌষ-মাঘের এই শীত সময়ে গ্রামবাংলার যাত্রাপালা সার্কাসে একসময় দেখা মিলত বহুরূপীদের। সেই পেশাটি বোধহয় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। রঙ্গমঞ্চের বহুরূপীরা বাস্তব জীবনে অনুপ্রবেশ করলে সার্কাস আর যাত্রাপালার বহুরূপীদের প্রয়োজনই-বা কী?

কলাম লেখক



আরও পড়ুন

×