পাঁচ শোয়ে উৎসবের আমেজ
‘দমের মাদার’ সিনেমার পোস্টার
রেজাউল করিম
প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাদারিয়া সম্প্রদায়ের জীবনকে আশ্রয় করে নাটক ‘দমের মাদার’ দিয়ে ২০১০ সালে পেশাদারি থিয়েটার ‘নাট্যম রেপার্টরি’ যাত্রা শুরু করে। সাধনা আহমেদ রচিত নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছেন আইরিন পারভীন লোপা।
এরপর ১৬ বছর দেশের বাইরে ১৬টি আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসবে অংশগ্রহণসহ দেশে ৭৫টি প্রদর্শনী করে গত ৬ থেকে ৮ মে তিন দিনে মোট ৫টি প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ৮০টি যাত্রা শেষ করেছে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় উৎসবের। নাটকটির পাঁচ মঞ্চায়নকে ঘিরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে ছিল উৎসবের আমেজ। নানা সাজে সেজেছিল প্রাঙ্গণ।
উৎসবে নাটক দেখতে আসা কলেজছাত্রী সুরাইয়া আক্তার বলেন, ‘একটি নাটকের ৮০ প্রদর্শনী মানে বড় ব্যাপার। পরপর পাঁচটি শো হয়েছে। বন্ধুদের নিয়ে বেশ আনন্দ নিয়ে নাটকটি দেখেছি। নাটক নিয়ে পরপর প্রদর্শনী হলে দর্শকের সংখ্যা বাড়বে বলে মনে করি। নাট্যম রেপার্টরি সফল একটি প্রযোজনা উপহার দিয়েছে দর্শককে।’
মাদার পীরের আখ্যান অবলম্বনে রচিত এ নাটকে উঠে এসেছে বাংলার লোকরীতিভিত্তিক মাদার পীরের পালাগান। এমন একটি সম্প্রদায়কে ঘিরে নাটকের কাহিনির সূত্রপাত ঘটে।
নাটকে দেখা যায়, জগৎ সংসারের সমস্ত কিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে মাদার পীরের সাধনায় মগ্ন যে জরিনা বিবি; তাঁরই উত্তরসূরি নূরবানু পীরত্বে নয়, আত্মাহুতি দিতে চান নারীত্বে। নূরবানু পীর-অলি-আউলিয়া, লাহুত মোকাম হতে চান না। নূরবানুর উত্তর ‘জননী হতে চাই কম কিসে?’ সাধন নামের বৈরাগ্যে নয়, নারীত্বের পূর্ণতায় মুক্তি পেতে চান। তাইতো প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক গায়েনের আকস্মিক মৃত্যু হলে নূরবানু নিজেই বেছে নেন স্বেচ্ছামৃত্যুর পথ। একদিকে শরিয়াপন্থিদের আক্রমণ, অন্যদিকে মানবিক দ্বন্দ্ব, অস্তিত্বের সংগ্রাম। দীর্ঘ সাধনা ও সম্প্রদায়কে রক্ষা করতে গিয়ে বঞ্চিত জরিনা বিবিও তখন বলে ওঠেন, ‘যে রক্ষিতে পারে না আপন আশেক তার তরে কিসের বন্দনা’। তারপরও আত্মমুক্তির সাধনাই মানবজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ‘যারে আমি দেখি না, তার তরে কিসের সাধনা’ নাটকে এমন এক মানবিক প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে; যা প্রচলিত দার্শনিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে। মাদারিয়া সম্প্রদায়ের অস্তিত্বের সংগ্রাম, বিশ্বাস-সংস্কার, ভক্তি-দর্শন এবং নারীর চাওয়ার সঙ্গে সাধনার বিপরীতমুখী দ্বন্দ্ব দর্শকের সংবেদনে অভিঘাত না করে পারে না। মাদারিয়াদের অস্তিত্ব আজ বিপন্নের পথে। সাম্প্রতিক বাংলাদেশে যেভাবে মাজার-আখড়া ভাঙচুর হচ্ছে সে পরিপ্রেক্ষিতে ‘দমের মাদার’ নাটকটি এ সময়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। নাট্যকার জীবনের একটি নিগূঢ় সত্যকে অনুসন্ধান করেছেন, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্দেশক সকল কলাকুশলী নিয়ে নাটকের প্রতিটি ছত্রে সেই পরমের সন্ধান করেছেন।
নাটকটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয়ে রয়েছেন–শিশির রহমান, শুভাশীষ দত্ত তন্ময়, পারভীন আখতার পারু, লিটা খান, মনোহর দাস, শাকিল আহমেদ, অমিতাভ রাজিব, বিউটিসহ আরও অনেকে। দর্শক নাটকটিকে দারুণভাবে গ্রহণ করেছেন বলে গত ১৬ বছর ধরে নাটকটি করা সম্ভব হচ্ছে। আলো পরিকল্পনায় আরও একটু যত্নবান হলে আরও ভালো হতো। পরিমল মজুমদারের সংগীত পরিচালনায় নাটকের সুর ও সংগীত করেছেন শিশির রহমান। মঞ্চ ও আলো পরিকল্পনা করেছেন জুনায়েদ ইউসুফ। নাটকটির প্রযোজনা অধিকর্তা শুভাশীষ দত্ত তন্ময়।
- বিষয় :
- বিনোদন
