ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পতি পত্নী অউর ও দো

এক স্বামী তিন নারী অগণিত বিপত্তি

এক স্বামী তিন নারী অগণিত বিপত্তি
×

পতি পত্নী অউর ও দো সিনেমার পোস্টার

উপমা পারভীন

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯ সালের ব্লকবাস্টার কমেডি ‘পতি পত্নী অউর দো’ দর্শকদের মনে দাগ কেটেছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন আর হাস্যরসের মিশেলে। মধ্যবিত্ত দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি, গোপন আকর্ষণ আর মিথ্যার জালকে ঘিরে তৈরি সেই সিনেমা বক্স অফিসেও পেয়েছিল বড় সাফল্য। সাত বছর পর সেই জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিই ফিরছে নতুন মোড়কে। এবার নাম ‘পতি পত্নী অউর ও দো’। 
এবার যুক্ত হয়েছে ‘ও’। ফলে সম্পর্কের সমীকরণও আগের চেয়ে অনেক বেশি গোলমেলে, বিভ্রান্তিকর এবং মজাদার। প্রথম সিনেমার মতো এবারও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মুদাস্সর আজিজ। রোমান্টিক কমেডি ঘরানায় তাঁর আলাদা মুনশিয়ানা রয়েছে। সম্পর্কের সংকটকে হালকা হাস্যরসের ভেতর দিয়ে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে তিনি বরাবরই স্বচ্ছন্দ। ‘হ্যাপি ভাগ যায়েগি, ‘পাগলপন্তি’ কিংবা ‘খেল খেল মে’র মতো ছবিতেও সেই দক্ষতার পরিচয় মিলেছে। এবার তিনি আরও বড় ক্যানভাসে সম্পর্কের বিশৃঙ্খলাকে তুলে ধরেছেন। 
১৯৭৮ সালে নির্মিত বি আর চোপড়ার ক্ল্যাসিক ছবির আধুনিক সংস্করণ হিসেবেই শুরু হয়েছিল ‘পতি পত্নী অউর ও দো’ ফ্র্যাঞ্চাইজির যাত্রা। সেই ছবিতে এক সাধারণ স্বামীর পরকীয়ার প্রতি আকর্ষণকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের সংস্করণে পরিচালক শুধু প্রেমের ত্রিভুজে আটকে থাকেননি; বরং সম্পর্কের বহুমাত্রিক জটিলতা এবং আধুনিক শহুরে জীবনের বিভ্রান্তিকেও গল্পে যুক্ত করেছেন। ফলে এটি শুধু কমেডি নয়; বরং সমকালীন সম্পর্কের এক রসাত্মক প্রতিচ্ছবিও হয়ে উঠেছে। 

এবারের গল্পের কেন্দ্রবিন্দু প্রজাপতি পাণ্ডে  চরিত্রে অভিনয় করেছেন আয়ুষ্মান খুরানা। প্রয়াগরাজের বন বিভাগের কর্মকর্তা তিনি। সিনেমার শুরুতেই দেখা যায় এক চিতা বাঘ ধরার অভিযানে তিনি রীতিমতো সিনেম্যাটিক নায়ক। বাঘটিকে আটকে শান্তভাবে বলেন, ‘শান্ত হও!’ বাঘও শান্ত হয়ে যায়। কিন্তু বনের হিংস্র প্রাণীকে সামলাতে পারলেও নিজের জীবনের জটিল সম্পর্ক সামলাতে গিয়ে বারবার ভুল করেন তিনি। তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন নতুন আরেকটি বিপদ ডেকে আনে। আয়ুষ্মান খুরানা সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করছেন। সামাজিক বার্তাধর্মী সিনেমা থেকে শুরু করে থ্রিলার কিংবা কমেডি–সব জায়গাতেই নিজেকে প্রমাণ করেছেন তিনি। এই ছবিতে আবারও তাঁকে দেখা যাবে সেই পরিচিত কমিক টাইমিংয়ে। এক সাক্ষাৎকারে আয়ুষ্মান বলেন, ‘প্রজাপতি এমন একজন মানুষ, যে কাউকে কষ্ট দিতে চায় না। কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে সে এমন সব ভুল করে বসে, যেখান থেকে হাস্যকর বিশৃঙ্খলার জন্ম হয়। এই সরলতাটাই চরিত্রটাকে আলাদা করেছে।’ প্রজাপতির স্ত্রী অর্পণার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ওয়ামিকা গাব্বি। এই সময়ে ওটিটি এবং সিনেমা–দুই মাধ্যমেই নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। অর্পণা একজন সাংবাদিক। আত্মবিশ্বাসী, আধুনিক এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী। স্বামীর প্রতি বিশ্বাস থাকলেও ধীরে ধীরে নানা ঘটনার কারণে সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরে। চরিত্রটি নিয়ে ওয়ামিকা বলেন, ‘অর্পণা শুধু একজন সন্দেহপ্রবণ স্ত্রী নন, তিনি নিজের পেশাগত স্বপ্ন নিয়েও খুবই সিরিয়াস। সম্পর্কের ভেতরে থাকা নারীর মানসিক দ্বন্দ্বটা আমাকে এই গল্পে কাজে আগ্রহী করেছে।’ গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিলুফার খান। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাকুল প্রীত সিং। তিনি প্রজাপতির সহকর্মী এবং প্রাণীদের অবশ করার বিশেষজ্ঞ। সাহসী, স্বাধীনচেতা এবং প্রাণবন্ত এই নারী ধীরে ধীরে প্রজাপতির জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠেন। তবে সম্পর্কের জটিলতা তিনি নিজেও বুঝে উঠতে পারেন না। রাকুল প্রীত সিং বলেন, ‘নিলুফার খুব আধুনিক এক চরিত্র। সে কারও জীবনে সমস্যা তৈরি করতে চায় না, কিন্তু পরিস্থিতি তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যায় যেখানে সবকিছু জট পাকিয়ে যায়।’ আরেক দিকে আছেন চঞ্চল কুমারী। এই চরিত্রে অভিনয় করেছেন সারা আলি খান। প্রাণবন্ত, অগোছালো এবং আবেগপ্রবণ এই তরুণী গল্পের সবচেয়ে বড় ‘ট্রিগার পয়েন্ট’। ব্যক্তিগত সংকটে পড়ে সে প্রজাপতির সাহায্য চায়। প্রেমিক সানিকে নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করে চঞ্চল। কিন্তু সানির প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবার সেই সম্পর্ক মেনে নেয় না। ফলে কিছুদিনের জন্য প্রজাপতিকে নিজের ভুয়া প্রেমিক সাজতে অনুরোধ করে চঞ্চল। সেখান থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। সারা আলি খান বলেন, ‘চঞ্চল এমন একটি চরিত্র, যে সবকিছু খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁর এনার্জি আর বিশৃঙ্খলাই গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যায়।’ সানির চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশাল বশিষ্ঠ এবং তাঁর প্রভাবশালী বাবা গজরাজ তিওয়ারির চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিগমাংশু ধুলিয়া। রাজনীতিক বাবার দাপট, ক্ষমতার ভয় এবং প্রেমিক যুগলের পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা–সব মিলিয়ে গল্পে তৈরি হয় বাড়তি উত্তেজনা। এ ছাড়া সিনেমাটির অন্যতম চমক বিজয় রাজ। পুলিশের চরিত্রে তাঁর উপস্থিতি যেন পুরো সিনেমার কমেডিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। সংলাপ বলার বিশেষ ধরন, মুখভঙ্গি এবং পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলার দক্ষতা দর্শকদের হাসির বড় কারণ হতে পারে। টিজারে তাঁর কয়েক সেকেন্ডের উপস্থিতিই ইতোমধ্যে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সিনেমার গল্প শুরু হয় প্রয়াগরাজের শান্ত, সুখী এক দাম্পত্য জীবন দিয়ে। প্রজাপতি ও অর্পণার সংসার বেশ স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন চঞ্চল এসে উপস্থিত হয় প্রজাপতির জীবনে। প্রেমিকের সঙ্গে পালানোর আগ পর্যন্ত কয়েকদিন তাঁকে সাহায্য করার অনুরোধ করে সে। স্ত্রীকে কিছু না জানিয়েই প্রজাপতি রাজি হয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় একের পর এক মিথ্যা, গোপনীয়তা আর ভুল বোঝাবুঝির খেলা। অন্যদিকে সাংবাদিক অর্পণা একটি ছবি প্রকাশ করেন, যেখানে চঞ্চল ও তাঁর প্রেমিক সানিকে দেখা যায়। সেই ছবির সূত্র ধরেই গজরাজ তিওয়ারি মেয়েটিকে খুঁজতে শুরু করেন। বিনিময়ে অর্পণাকে নিজের নিউজ চ্যানেল তৈরির অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। ফলে একদিকে স্বামী চঞ্চলকে লুকিয়ে রাখতে ব্যস্ত, অন্যদিকে স্ত্রী সেই মেয়েটিকেই খুঁজে বের করতে মরিয়া। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন অর্পণা একসময় নিজের স্বামীকে চঞ্চল এবং নিলুফার দুই নারীর সঙ্গেই আলাদা আলাদা অবস্থায় দেখে ফেলেন। তাঁর মনে জন্ম নেয় গভীর সন্দেহ। তিনি ভাবতে শুরু করেন, প্রজাপতির জীবনে হয়তো একাধিক সম্পর্ক রয়েছে। এই ভুল বোঝাবুঝির ভেতর দিয়েই সিনেমার গল্প এগিয়ে যায় দ্রুতগতিতে। কখনও পালিয়ে বেড়ানো, কখনও মিথ্যা লুকাতে গিয়ে নতুন মিথ্যার জন্ম, কখনও পুলিশের জেরা, আবার কখনও স্বামী-স্ত্রীর আবেগঘন দ্বন্দ্ব। সম্প্রতি প্রকাশ পাওয়া টিজারেও সেই দ্বন্দ্বের আভাস মিলেছে। পুরোনো সিনেমার জনপ্রিয় আবহ বজায় রেখেই নির্মাতা এবার যোগ করেছেন আরও বড় মাত্রার বিভ্রান্তি। বিশেষ করে আয়ুষ্মান, সারা, রাকুল এবং ওয়ামিকার পারস্পরিক রসায়ন ইতোমধ্যে প্রশংসা পাচ্ছে। প্রথম ছবিতে কার্তিক আরিয়ান, ভূমি পেডনেকার আর অনন্যা পাণ্ডে দর্শকদের মন জয় করেছিলেন। এবার নতুন তারকাদের নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি আরও বড় সাফল্য পায় কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আগামীকাল প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে সিনেমাটি। সম্পর্কের জটিল সমীকরণ, ভুল বোঝাবুঝি, প্রেম, সন্দেহ আর টানা হাসির মিশেলে ‘পতি পত্নী অউর ও দো’ দর্শকদের কতটা আনন্দ দিতে পারে, তার উত্তর মিলবে মুক্তির পরই। 

আরও পড়ুন

×