এক শাকিব, অনেক রূপ
‘প্রিয়তমা’ সিনেমায় বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় জর্জরিত একজন বয়স্ক মানুষের রূপে
অনিন্দ্য মামুন
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নায়ক এসেছেন, গেছেন। কেউ জনপ্রিয় হয়েছেন, কেউ হয়েছেন সময়ের নায়ক। কিন্তু কয়েক দশক ধরে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থেকে বারবার নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করার উদাহরণ খুব বেশি নেই। সেই বিরল তালিকার অন্যতম নাম শাকিব খান। দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক হিসেবে রাজত্ব করছেন তিনি। তবে শুধু জনপ্রিয়তা বা বক্স অফিস সাফল্য নয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজের লুক, চরিত্র নির্বাচন ও পর্দায় উপস্থিতিতে আমূল পরিবর্তন এনে তিনি যেন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।
১৯৯৯ সালের ২৮ মে মুক্তি পেয়েছিল শাকিব খানের প্রথম সিনেমা ‘অনন্ত ভালোবাসা’। সেই যাত্রার ২৭ বছর পর এসে মুক্তি পেয়েছে তাঁর ২৫৫তম সিনেমা ‘রকস্টার’। দীর্ঘ এই পথচলায় অসংখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। কিন্তু গত এক দশকে শাকিবের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। একঘেয়ে নায়ক ইমেজের গণ্ডি ভেঙে তিনি হয়ে উঠেছেন বহুরূপী তারকা।
শিকারি দিয়ে বদলের শুরু
শাকিব খানের ক্যারিয়ারে পরিবর্তনের বড় বাঁক হিসেবে ধরা হয় ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘শিকারি’ সিনেমাকে। এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মূলত প্রচলিত বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। শিকারি মুক্তির আগেই দর্শকের নজর কাড়ে তাঁর নতুন লুক। আধুনিক পোশাক, ফিট শরীর, সুন্দর উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মানের স্টাইলিং–সব মিলিয়ে সিনেমাটিতে নতুন এক শাকিবকে আবিষ্কার করেছিলেন দর্শক। ফলে ঈদুল ফিতরে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে একযোগে মুক্তি পাওয়া ‘শিকারি’ ছবিটি শুধু ব্যবসায়িকভাবেই সফল হয়নি, বরং শাকিবের ক্যারিয়ারের নতুন দিকও উন্মোচন করে। একই বছরের ঈদুল আজহায় মুক্তি পাওয়া ‘বসগিরি’ ও ‘শ্যুটার’ সিনেমাতেও সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। নবাগত বুবলীর সঙ্গে জুটি এবং নতুন স্টাইলিং দর্শককে হলে টেনে আনে। সে সময় ‘নাকাব’, ‘ভাইজান এলো রে’সহ কয়েকটি সিনেমায়ও ভিন্নধর্মী লুকে দেখা যায় তাঁকে।
প্রিয়তমায় সাহসী সিদ্ধান্ত
একজন তারকার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের প্রতিষ্ঠিত ইমেজের বাইরে যাওয়া। সেই দুঃসাহসিক কাজটি করেছিলেন শাকিব খান ‘প্রিয়তমা’ সিনেমায়। হিমেল আশরাফ পরিচালিত এই সিনেমায় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য বৃদ্ধ বয়সের একটি চরিত্রে দেখা যায় তাঁকে। সময়ের হিসাবে দৃশ্যটি ছোট হলেও প্রভাবের দিক থেকে ছিল বিশাল। দর্শক বিস্মিত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, দেশের সবচেয়ে বড় তারকা নিজের গ্ল্যামার ভেঙে এমন একটি চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হলেন কীভাবে। এই লুক তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয় জটিল প্রস্থেটিক মেকআপ [প্রস্থেটিক মেকআপ হলো স্পেশাল এফেক্টস মেকআপের একটি উন্নত রূপ, যা ভাস্কর্য ও ছাঁচনির্মাণের মাধ্যমে তৈরি করা হয়। এটি সরাসরি ত্বকে যুক্ত করে অভিনেতার মুখের বা শরীরের গড়ন আমূল বদলে ফেলা হয় বা কাল্পনিক চরিত্র (যেমন–এলিয়েন বা দানব), কৃত্রিম ক্ষত ও বার্ধক্যের ছাপ ফুটিয়ে তোলা হয়]। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেকআপ চেয়ারে বসে থাকতে হয়েছে তাঁকে। প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ধরে মেকআপ দেওয়া এবং আরও কয়েক ঘণ্টা ধরে তা অপসারণের প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। ফলাফল ছিল অসাধারণ। সিনেমা মুক্তির পর দর্শক ও সমালোচক উভয়েই প্রশংসা করেন।
সিনেমাটির পরিচালক হিমেল আশরাফ বলেন, ‘শাকিব খানকে এমন রূপে আগে দেখা যায়নি। তিনি রাজি হবেন কিনা, সেটি নিয়ে দ্বিধা ছিল। চিত্রনাট্য পড়ে তিনি নিজেই এই অংশটি করতে দারুণ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।’ এই লুকে সেট টিমের প্রধান ছিলেন মেকআপ আর্টিস্ট সবুজ খান। এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও মিলছে তাঁর ঝুলিতে। সবুজ খান বলেন, ‘প্রস্থেটিক মেকআপ খুবই কঠিন। একটানা বসে থাকতে হয়। ভুল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রতিদিন মেকআপ দিতে আমাদের ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় লাগত। মেকআপ তুলতে লাগত আরও প্রায় তিন ঘণ্টা।’ এই মেকআপ নিয়ে টানা তিন দিন কাজ করতে হয় পুরো টিমকে।
তুফানের দ্বৈত শাকিব
প্রিয়তমার পর রাজকুমার সিনেমায় আবারও ভিন্ন এক শাকিবকে দেখেন দর্শক। এখানে তিনি ফিরে যান তরুণ, রোমান্টিক এবং আন্তর্জাতিকমানের স্টাইলিশ নায়কের অবয়বে। সিনেমার লুক, পোশাক ও পর্দায় উপস্থিতি নিয়ে দর্শকের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। তবে সবচেয়ে বড় বিস্ময় আসে তুফান সিনেমায়। পরিচালক রায়হান রাফীর এই ছবিতে শাকিব খানকে দেখা যায় সম্পূর্ণ নতুন এক রূপে। লম্বা চুল, রোদচশমা, রুক্ষ চেহারা এবং ভয়ংকর এক গ্যাংস্টারের ব্যক্তিত্ব–সব মিলিয়ে এটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সাহসী রূপান্তর। সিনেমাটিতে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি নিজেকে শারীরিকভাবে প্রস্তুত করেন। নিয়মিত শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চরিত্রের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আয়ত্ত করার জন্য দীর্ঘ সময় কাজ করেন। শুধু বাহ্যিক পরিবর্তন নয়, চরিত্রের মানসিক গঠন, কথা বলার ধরন এবং উপস্থিতিতেও আনা হয় ভিন্নতা। তুফান প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও একজন তারকা কীভাবে নিজেকে সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন। ছবিটি শুধু ব্যবসায়িকভাবে সফল হয়নি, বরং নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও শাকিব খানকে নতুন করে পরিচিত করেছে।
বরবাদে তারকাখ্যাতির পূর্ণ ব্যবহার
শাকিব খানের সাম্প্রতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন ‘বরবাদ’। বলা হয়, বাংলা সিনেমাকে উচ্চস্কেলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয় এই সিনেমায় তাঁর তারকাখ্যাতির পূর্ণ ব্যবহার করেছেন। অ্যাকশন, রোমান্স এবং আবেগ–সব ধরনের উপাদানের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে একাধিক ভিন্ন লুক। সিনেমাটিতে কখনও তাঁকে দেখা গেছে পরিণত প্রেমিক হিসেবে, কখনও অ্যাকশন হিরো হিসেবে। পর্দায় তাঁর উপস্থিতি ছিল আত্মবিশ্বাসী ও পরিপক্ব। এই সিনেমা দেখিয়েছে, একজন তারকা শুধু জনপ্রিয়তার কারণে নয়, অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের কারণেও দীর্ঘ সময় শীর্ষে থাকতে পারেন।
রকস্টার নতুন অধ্যায়
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘রকস্টার’ সিনেমায় আবারও নতুন চমক দিয়েছেন শাকিব খান। আজমান রুশো পরিচালিত এই ছবিতে তিনি প্রথমবারের মতো একজন রকস্টার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ক্যারিয়ারের এত দীর্ঘ পথচলার পরও সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিচয়ে হাজির হওয়ার সাহস খুব কম তারকারই থাকে। মিউজিক্যাল ঘরানার এই সিনেমায় তাঁর পোশাক, হেয়ারস্টাইল, মঞ্চে পারফর্ম করার ভঙ্গি এবং শারীরিক ভাষা–সবকিছুতেই ছিল নতুনত্বের ছাপ। দর্শকও সেই নতুন রূপকে ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করেছেন। এই সিনেমায় শাকিব খানকে ৪০ বছরের যুবক নয়, ত্রিশ বছরের তরুণ হিসেবেই দেখানো হয়েছে।
পরিবর্তনের নামই যেন শাকিব
একসময় শাকিব খানকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল তিনি নিজেকে বদলান না। সময়ের সঙ্গে সেই সমালোচনাকে শক্তিতে পরিণত করেছেন তিনি। গত এক দশকে তাঁর ক্যারিয়ার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিনেমায় তিনি নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। প্রমাণ করেছেন এখনও তাঁর ভেতরে নতুন কিছু করার ক্ষুধা অটুট।
- বিষয় :
- বিনোদন
