ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

এক জীবন নাটক

এক জীবন নাটক
×

‘হেলেন কেলার’ নাটকের দৃশ্যে জুয়েনা শবনম

শরীফ নাফে আস-সাবের

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাস্তব কিংবা পরাবাস্তবতার দোলাচলে নাটক কি শুধুই কল্পনার সমাহার? নাকি মঞ্চের আলো-আঁধারিতে দর্শককে ক্ষণিকের আনন্দ দেওয়ার এক বিনোদন-আয়োজন মাত্র? আসলে নাটক এর কোনোটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নাটক জীবনেরই এক বহুমাত্রিক প্রতিফলন, যেখানে বাস্তবতার নির্মম সত্য, কল্পনার বিস্ময়, মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিবাদ, যুদ্ধ, ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা একসূত্রে গাঁথা থাকে। নাটক কখনও সমাজের আয়না, যেখানে মানুষ নিজেকেই নতুনভাবে দেখতে শেখে। কখনও আবার তা প্রচলিত বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
মঞ্চের আলো-আঁধারি কেবল দৃশ্য নির্মাণের কৌশল নয়, এটি মানুষের অন্তর্জগতের আলো ও অন্ধকারেরও প্রতীক। একজন অভিনেতার সংলাপ, একটি নীরব বিরতি, কিংবা ক্ষণিকের দৃষ্টি–এই সব কিছুর মধ্য দিয়েই দর্শক অনুভব করে এমন সব সত্য, যা অনেক সময় বাস্তব জীবনেও অনুচ্চারিত থেকে যায়। তাই নাটক কেবল বিনোদন নয়–এটি ভাবনার, অনুভূতির এবং আত্ম-অন্বেষণের এক শৈল্পিক প্রকাশ।
এই উপলব্ধিগুলো আরও গভীরভাবে অনুভব করার সুযোগ মিলল বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যসংগঠন স্বপ্নদল-এর প্রযোজনায় হেলেন কেলার-এর জীবন অবলম্বনে নির্মিত মনোলগের বিশেষ মঞ্চায়নে। গত ২৮ জুন, রোববার সন্ধ্যা ৭টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটারে অনুষ্ঠিত এই প্রযোজনা দর্শকদের জন্য ছিল এক অনন্য শিল্প-অভিজ্ঞতা।
জাহিদ রিপনের সংবেদনশীল নির্দেশনা, অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর সুচিন্তিত রচনা এবং জুয়েনা শবনম-এর শক্তিশালী অভিনয়–এই তিনের সমন্বয়ে মঞ্চে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল হেলেন কেলারের অদম্য জীবনসংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস এবং মানবিক দিগ্বিজয়ের এক অনবদ্য কাব্য। একক অভিনয়ের সীমিত পরিসরকে জুয়েনা নিখাদ দক্ষতায় ধারণ করেছেন, যার মাধ‍্যমে দর্শক কেবল একটি চরিত্রের রূপায়ণ দেখেননি, তাঁরা হৃদয়ঙ্গম করেছেন এক অসীম সাহস, অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং অনন‍্য সাধনার দীপ্ত ইতিহাস।
নিঃসন্দেহে এ ছিল এক অপূর্ব সৃষ্টি। একাধারে যা নান্দনিক, সংবেদনশীল এবং ঝর্ণার অঝোর ধারার মতো গতিময়। নাটকটি শুধু উপভোগের উপলক্ষই ছিল না, এটি দর্শককে ভাবিত করেছে, অনুপ্রাণিত করেছে এবং মানবিক শক্তির প্রতি নতুন করে আস্থা জাগিয়েছে। এমন প্রযোজনা প্রমাণ করে, নাটক কেবল মঞ্চে অভিনীত একটি কাহিনিই নয়; এটি মানুষ ও সমাজের চলমান সংলাপ, যেখানে নাটকের চরিত্র, দৃশ্য, কথা ও নীরবতা আমাদের অস্তিত্বকে নাড়া দিয়ে যায়। এই অসাধারণ প্রযোজনার ৬৫তম মঞ্চায়ন রজনিতে এমন একটি নান্দনিক ও মননশীল নাট্য-আয়োজনে উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার জন্য ছিল এক আনন্দময়, স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। আমি কায়মনোবাক‍্যে স্বপ্নদলের এই শিল্পযাত্রার বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি। উপভোগ্য একটি সুন্দর প্রযোজনা দর্শকদের উপহার দেওয়ার জন্য নাটকটির নির্দেশক জাহিদ রিপনকে       ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।  

লেখক: উপাচার্য, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ 

আরও পড়ুন

×