ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

সরকারি অর্থের নিদারুণ অপচয়!

সরকারি অর্থের নিদারুণ অপচয়!
×

--

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২০ | ১৩:১৬

সরকারি প্রতিষ্ঠানে কেনাকাটা-আপ্যায়ন ইত্যাদিতে বড় বড় দুর্নীতির ঘটনায় আমরা হতাশ হলেও বিস্মিত নই। বিশেষ করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বালিশকাণ্ড কিংবা ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে পর্দার অস্বাভাবিক দামের ঘটনার পর এ রকম দুর্নীতি এখন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তারপরও মাঝেমধ্যে এমন কিছু দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে আসে, যা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- এক টাকাও ছাড় হয়নি, খরচ ২২ কোটি টাকা! এটি ঘটেছে সম্ভাবনাময় উদ্যোগে সহায়তা করতে গঠিত সরকারের ইইএফ বা ইক্যুইটি এন্টারপ্রেনারশিপ ফান্ডে; যার পরিবর্তিত নাম ইএসএফ বা ইক্যুইটি সাপোর্ট ফান্ড। এ তহবিলে অর্থ ছাড়ের আগেই সেখানে অবিশ্বাস্য দুর্নীতির খবর সামনে এলো। সেখানে দেড় বছরে বিভিন্ন কমিটির বৈঠকে সম্মানী ও আপ্যায়নে প্রতি কার্যদিবসে খরচ হয়েছে ৮৫ হাজার টাকা। যাতায়াত, মোটরগাড়ি রক্ষণাবেক্ষণসহ অন্যান্য খাতেও অবিশ্বাস্য খরচের হিসাব দেখানো হয়েছে।
সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেলে অনুষ্ঠিত ইইএফের একটি বৈঠকে নয় বক্স লাঞ্চ কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে নয় হাজার টাকা। আর নয়টি স্যুপ কেনা হয়েছে প্রায় পাঁচ হাজার টাকায়। বৈঠকে শুধু ফল খাওয়ানোর খরচ দেখানো হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা। সব মিলিয়ে নয়জনের আপ্যায়নে খরচ হয়েছে ১৬ হাজার ৩০০ টাকা। এর চেয়েও বিস্ময়কর তথ্য হলো, যে প্রতিষ্ঠানের নামে খরচের ভাউচার করা হয়েছে, সেখানে খোঁজ নিয়ে সমকাল প্রতিবেদক জেনেছেন, তারা স্যুপই বিক্রি করে না! এমনকি দেড় বছরে দুই লাখ ৬১ হাজার টাকার পত্রিকা কেনা হয়েছে; যে অর্থে দৈনিক গড়ে ৫০টির বেশি পত্রিকা কেনা সম্ভব। খরচের প্রায় সব খাতে এত বেশি পরিমাণ টাকা দেখানো হয়েছে যে, সেখানে অনিয়মের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। তারপরও বাংলাদেশ ব্যাংকে হিসাব জমা দেওয়ায় যেভাবে সহজেই ইইএফ খরচের অর্থ পেয়ে যাচ্ছে, সেটিও অবিশ্বাস্যই বটে। কেউ খরচের হিসাব দিলে তা যাচাই করা একটি স্বাভাবিক বিষয়। সঠিকভাবে যাচাই করলে নিশ্চয়ই অনিয়ম ধরা পড়ার কথা। অথচ এ ক্ষেত্রে সেটি কেন হয়নি?
'সরকারি মাল দরিয়া মে ঢাল' নামে সমাজে যে কথা প্রচলিত রয়েছে, আমরা সেখান থেকে এখনও বের হতে পারিনি। সরকারি প্রকল্প কিংবা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়মে এটা স্পষ্ট যে, আমাদের অনেকেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল তো ননই, উপরন্তু নানা কৌশলে পকেটে পুরতেই ব্যস্ত। আমরা জানি, সংবাদমাধ্যমে অনেক খবরই আসে না। যেগুলো আসে সেগুলো যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করছে, সেটি লক্ষণীয়। বালিশ ও পর্দাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখেছি। তারপরও দুর্নীতিবাজ অনেকের আচরণই এখনও বেপরোয়া। যে দুর্নীতির জন্য ইইএফ থেকে ইএসএফ নামকরণ করা, সেই দুর্নীতিই যে প্রতিষ্ঠানটিতে জেঁকে বসেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। একসময় এ তহবিলের সব দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর। কিন্তু ঋণ বিতরণের স্বচ্ছতা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে ২০০৯ সালে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা আইসিবিকে সাব-এজেন্সি নিয়োগ করে তহবিল পরিচালনার দায়িত্ব তাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। নতুন করে ইএসএফ গঠন করার পর এখনও কোনো অর্থ ছাড় দেওয়া হয়নি। তবে সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণ নেওয়ার জন্য এখন পর্যন্ত আবেদন জমা পড়েছে পাঁচ হাজারের বেশি। তাহলে দেড় বছরে ওই তহবিলের অর্জন কী? আইসিবির মহাব্যবস্থাপক রিফাত হাসান সমকালকে বলেন, 'অর্থ ছাড়ের আগে প্রকল্প মূল্যায়নসহ কিছু প্রক্রিয়া শেষ করতে হয়। যে কারণে দেড় বছরে এক টাকাও ছাড় হয়নি। তবে দু-একটি মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়েছে।' অথচ ইতোমধ্যে খরচ হয়ে গেছে ২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনিয়ম-দুর্নীতি তো রয়েছেই। সরকারি অর্থের একি নিদারুণ অপচয়! আমরা আশা করি, এই অনিয়মের তদন্তক্রমে যথাযথ প্রতিকার দ্রুত নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন

×