ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ছাত্রদল নেতার কিশোর নির্যাতন

ক্ষমতার দম্ভের নগ্ন প্রদর্শনী

ক্ষমতার দম্ভের নগ্ন প্রদর্শনী
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:৩০

সম্প্রতি ঢাকার সাভারে তুচ্ছ এক ঘটনার জেরে ক্ষমতাসীন বিএনপির এক দল নেতাকর্মী কিশোর রিপন দাসের উপর যেই বর্বর নির্যাতন চালাইয়াছে, তাহা শুধু গুরুতর ফৌজদারি অপরাধই নহে; ক্ষমতার দম্ভের এক নগ্ন প্রদর্শনীও বটে। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ মে অপরাহ্ণে সাভারের রাজাসন এলাকায় এক ছেলের সহিত রিপনের ধাক্কা লাগিলে দুইজনের মধ্যে বচসা হয়।

ইহার জেরে ২ জুন অপরাহ্ণে কয়েকজন যুবক রিপনকে সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব হোসেন সামির অফিসে তুলিয়া লইয়া গিয়া ঘরের দেওয়ালে তাহার মাথা ঠুকায় এবং লাঠি দিয়া বেধড়ক প্রহার করে। ফলস্বরূপ, রিপন শুধু গুরুতর আহতই হয় নাই; এখন তাহার চক্ষু দুইটি কোনো কার্যই করিতেছে না। তদুপরি অর্থাভাবে সুচিকিৎসা না হওয়ায় স্থায়ীভাবে তাহার চক্ষুর আলো নিভিয়া যাইবার উপক্রম। কোনো বিতর্কের অবকাশ নাই, একজন দরিদ্র ও অসহায় তথা সমাজের প্রান্তিক স্তরভুক্ত কিশোরের উপর কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ এহেন নির্যাতন চালাইতে পারে না। কেবল ক্ষমতার দম্ভে ধরাকে সরাজ্ঞান করা ব্যক্তিদের পক্ষেই এমন ভয়াবহ নজির সৃষ্টি সম্ভবপর। স্মরণ করা যাইতে পারে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই বিএনপির বিশেষত মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটা অংশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও জলমহাল, বালুমহাল, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড ইত্যাদি দখলের অভিযোগ উঠিয়াছিল। হতাশাজনক, অদ্যাবধি সেই সকল অপকর্ম তো বন্ধ হয়ই নাই, উপরন্তু তাহারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সাধারণ মানুষের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন চালানোর ঘটনা ঘটাইয়া চলিয়াছে। আলোচ্য ঘটনা তাহারই ধারাবাহিকতা মাত্র।

উক্ত কিশোর নির্যাতনের ঘটনায় কেহ বিগত সময়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নানা অপকর্মের ছায়া দেখিলে তাহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এবং ক্যাম্পাসের বাহিরে সেই সময় ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব, খুন, জখম ইত্যাদি অপরাধের কারণে ছাত্রসমাজের সহিত জনজীবনেও ত্রাহি মধুসূদন রব উঠিয়াছিল। এখনও সেই পর্যায়ে না গেলেও লাগাম টানিয়া না ধরা হইলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হয়তো সেই রেকর্ডও অতিক্রম করিবে। ইহা সত্য, থানায় মামলা হওয়ার পর সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের পদ কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে। কিন্তু এই সকল বহিষ্কার যে দিবাবসানে কার্যকর থাকে না– তাহারও ভূরি ভূরি প্রমাণ রহিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন অপকর্মে সংশ্লিষ্ট হইবার দায়ে যে সকল বিএনপি নেতাকে বহিষ্কার করা হইয়াছিল, তাহাদের অনেকেই বিগত সংসদ নির্বাচনের সময় দলে পুনর্বাসিত হইয়াছেন। ইহাও সত্য, আলোচ্য ঘটনায় বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা এবং অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হইয়াছে। কিন্তু এই মামলা দায়ের করিতে গিয়া ভুক্তভোগীর স্বজনদের যে কাঠখড় পোড়াইতে হইয়াছে, তাহা দেখিয়া এই সন্দেহই দানা বাঁধে, সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ সরিলে ক্ষমতাসীন ও প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়েরকৃত অন্য অসংখ্য ফৌজদারি মামলার ন্যায় এই ক্ষেত্রেও বিচারের বাণী হয়তো নীরবে ক্রন্দন করিবে।

উল্লেখ্য, মামলার বাদী স্বপন সূত্রধর সমকালকে বলিয়াছেন, মামলা করার পর অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হওয়া দূরের কথা, বরং তাহারা মামলা তুলিয়া লইতে চাপ প্রয়োগ করিতেছেন। অধিকন্তু ঐ ছাত্রদল নেতার মামা আনোয়ার হোসেন শনিবার রিপন দাসের রাজাসনের বাসায় গিয়া চিকিৎসা বাবদ ১০ সহস্র টাকা দিয়া থানা হইতে মামলা তুলিয়া লওয়ার জন্য বলিয়া গিয়াছেন। এই অবস্থায় ভুক্তভোগীরাই বরং প্রাণভয়ে তটস্থ। 

সরকার তৎসহিত বিএনপিরও দায়িত্বশীল পর্যায় হইতে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করা জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। জরুরি ভিত্তিতে রিপনের সুচিকিৎসার সহিত অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতকরণ তাহাদেরই দায়িত্ব। এভাবেই দলীয় উচ্ছৃঙ্খল নেতাকর্মীদের প্রতি সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া সম্ভব। ইহাতে ব্যর্থ হইলে শুধু দলীয় নেতাকর্মী অধিকতর হারে অপরাধে সংশ্লিষ্টই হইবে না; জনপরিসরেও সরকার ও দলকে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হইতে হইবে।

আরও পড়ুন

×