আইন-আদালত
স্বাধীন বিচারব্যবস্থার পথে উল্টো যাত্রা
মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:২৭ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:১৪
বিএনপি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা-সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের দুটি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত না করে তামাদি করে দিয়েছে। এই দুটি অধ্যাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ-সংক্রান্ত। বিএনপির দাবি, সরকার নতুন আইনের মাধ্যমে অনতিবিলম্বে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করবে, যে আইন ওই অধ্যাদেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। কিন্তু গত চার মাসের অভিজ্ঞতা অন্য কিছু বলছে।
সরকার নিজেদের রাজনীতির প্রয়োজনে বিচার বিভাগকে অন্যায়ভাবে ব্যবহার করার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ শিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভুয়া মামলা দিয়ে মাসের পর মাস জেলে আটকে রাখার যে ভয়ংকর খেলা অন্তর্বর্তী সরকার পুরো দেড় বছর চালিয়ে গেছে; সেখান থেকে বের হয়ে আসার কোনো আলামত বিএনপি দেখাচ্ছে না। অদূর ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য কোনো আইনি পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে তারা যে কাজ করছে না– সেটাও একেবারে পরিষ্কার।
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি অঙ্গীকার করেছিল– ‘বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচার ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন পৃথক সচিবালয়কে আরও শক্তিশালী করা হবে।’ সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার অধ্যাদেশটি তামাদি করে বিএনপি বরং উল্টো পথে হাঁটছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করে পরে যে কোনো উন্নততর সংশোধনী আনা যেত। তা করা হলে ইশতেহার লঙ্ঘনের কোনো অভিযোগ উঠত না। প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন বর্তমান বিএনপি সরকারের আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। সাবেক প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদকে সুপ্রিম কোর্টের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাঁর একাগ্র প্রয়াসের জন্য তিনি গ্রিক পুরাণের ‘প্রমিথিউস’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ব্যাপক তৎপর ছিল। বিএনপি মনে হয় তাদের ওই অবস্থান বদলাতে চাইছে না! আওয়ামী লীগের গ্রেপ্তারকৃত নেতা-নেত্রীদের ব্যাপারে বিচারকরা যাতে ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্ত নিতে না পারেন সে জন্যই কি পুরোনো খেলায় মেতে রয়েছে বিএনপি সরকার?
১৯৭২ সালে প্রবর্তিত আমাদের সংবিধানের ২২ ধারায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও গত ৫৪ বছরে দেশের কোনো সরকারই এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে প্রয়াস চালায়নি। এর মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাবলি সুপারিশ করে বিখ্যাত মাসদার হোসাইন মামলার রায় হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক দলিল বলে বিবেচিত ওই রায় প্রদানের পরও তিন দশক চলে গেছে। অথচ এই তিন দশকের মধ্যে একাধিকবার ক্ষমতাসীন বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ ব্যাপারটির সমাধান না করে বরং একেবারেই উল্টো পথে হেঁটেছে। এর ফলস্বরূপ সুপ্রিম কোর্টের উচ্চতম আপিল বিভাগ থেকে শুরু করে নিম্নতম আদালতের বিচারক নিয়োগ, পদোন্নতি, ট্রান্সফার– সবই দলীয়করণের করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। এমনকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কবল থেকে নিম্নতর বিচার ব্যবস্থাকে নিষ্কৃতি প্রদানের বিষয়টি পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের ঘোরতর বিরোধিতার শিকার হয়ে বছরের পর বছর আটকে ছিল।
সৈয়দ রেফাত আহমদকে সরাসরি হাইকোর্টের বিচারপতি থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার।
গণঅভ্যুত্থানের পর মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে প্রধান বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির পদ থেকে বিতাড়িত সবাই সৈয়দ রেফাত আহমদের জুনিয়র ছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট ডিগ্রির অধিকারী সৈয়দ রেফাত আহমদ হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবেও ব্যাপক দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। তথাপি শেখ হাসিনার শাসনামলে তাঁকে ডিঙিয়ে অন্য অনেককে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। কারণ, সৈয়দ রেফাত আহমদ (দেশের স্বনামধন্য ব্যারিস্টার প্রয়াত সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদ ও প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সুফিয়া আহমদের সন্তান) কখনোই সরকারের খয়েরখাঁ হতে রাজি হননি। এটা বলা হলো বিচার বিভাগ পরাধীন হওয়ার পরিণাম কী হতে পারে তা বোঝানোর জন্য। 
সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে বিএনপি সরকার কট্টর রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। অতএব, শিগগির বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তাদের বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত না হওয়ারই কথা! তবে এই দুটো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশকে তামাদি হতে দিয়ে বিএনপি সরকার একটি ঐতিহাসিক ভুল করেছে। তাদের এর ভবিষ্যৎ নেতিবাচক অভিঘাত সম্পর্কে সাবধান হতে বলব।
২০০৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার বিচার বিভাগকে চরম দলীয়করণের গভীর গিরি খাতে নিমজ্জিত করেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি সবাই আওয়ামী লীগের ধামাধরা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর। তখন উচ্চ আদালতে যে পরিবর্তন হয় তার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হলো বিএনপি। দেশের বিচার বিভাগকে যদি সেই ধ্বংসের গহিন গিরি খাতেই রাখা হয়, তাহলে তার খেসারতও দিতে হবে এই দলকে।
সৈয়দ রেফাত আহমদ দুটো ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ প্রণয়নের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে এই গিরি খাত থেকে বিচার ব্যবস্থাকে উদ্ধারের পথে টেনে তোলার পথ দেখিয়েছেন– তা ভুলে গেলে চলবে না। এই স্বনামধন্য প্রধান বিচারপতির উদ্যোগের ফলস্বরূপ স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রস্তাব-সংবলিত অন্তর্বর্তী সরকারের দুটো অধ্যাদেশ জারি হলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি কলামে আমি তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। সে কলামে বলেছিলাম, ‘এই ব্যাপারটাতে সদ্য-অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের ঐতিহাসিক অবদানকে জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। … অবসর গ্রহণের মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় প্রতিষ্ঠার কাজটি সম্পন্ন করে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতার রক্ষাকবচটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।… ভবিষ্যতেও যাতে কোনো সরকার আমলাতন্ত্রের ফাঁদে পড়ে আবার বিচার বিভাগকে কুক্ষিগত করার অপতৎপরতা চালাতে না পারে সে ব্যাপারে জাতিকে সদাজাগ্রত থাকতে হবে।’ জাতির প্রতি আমার সেই আহ্বান আমি আবারও জানাতে চাই।
ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
