অর্থনীতি
বীমা খাতে আস্থার সংকট কাটাতে যা দরকার
মামুন রশীদ
মামুন রশীদ
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:২১ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:২১
বাংলাদেশে বীমাকে দীর্ঘদিন ধরে আস্থার সংকটে থাকা খাত বলে চিহ্নিত করা হয়। আমি মনে করি, এই আস্থাহীনতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। বরং বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত কিছু কাঠামো ও নীতিগত ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল এটি। সংকটের শুরু মূলত ক্লেইম (ইন্স্যুরেন্সের পলিসি অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট ক্ষতি বা দুর্ঘটনার পর বীমা গ্রহীতার ক্ষতিপূরণ বা পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর অর্থ পাওয়ার জন্য বীমা কোম্পানির কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদন) ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা থেকে। একজন গ্রাহক যখন নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করার পরও যৌক্তিক সময়ে ক্লেইমের টাকাটা হাতে পান না, তখন সেটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা থাকে না; পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
এ ক্লেইম জটিলতা আসলে একটি কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ, যার ওপর দুর্বল ব্যবস্থাপনা বাড়তি চাপ তৈরি করে। আমাদের বীমা খাতের ব্যবসায়িক মডেল শুরু থেকেই যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দায় ব্যবস্থাপনার ওপর দাঁড়ায়নি। বাজার দখলের প্রতিযোগিতায় অনেক কোম্পানি ঝুঁকি বিশ্লেষণ ছাড়াই পলিসি ইস্যু করেছে। ফলে ভবিষ্যৎ ক্লেইম দায় তাদের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকেনি। যে প্রিমিয়াম তহবিল দীর্ঘ মেয়াদে সুরক্ষিত ও তরল থাকার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রে ভুল বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত বা স্বল্পমেয়াদি স্বার্থে আটকে গেছে। ক্লেইম আসার সময় কোম্পানিগুলো তখন নগদ সংকটে পড়ে, আর সরাসরি ভুক্তভোগী হন গ্রাহক।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করপোরেট গভর্ন্যান্সের ঘাটতি। কাগজে-কলমে আমাদের গভর্ন্যান্স নির্দেশনা, পর্ষদের দায়িত্ব ও কমপ্লায়েন্স কাঠামো বিদ্যমান। বাস্তবে এসব গাইডলাইন অনেক ক্ষেত্রেই আনুষ্ঠানিকতার বাইরে যায় না। বহু পর্ষদে স্বাধীন ও পেশাদার সদস্যের উপস্থিতি সীমিত, মালিকানা ও ব্যবস্থাপনার সীমারেখাও স্পষ্ট নয়। ফলে পর্ষদ নীতিনির্ধারকের ভূমিকা পালন না করে দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ করে, যা পেশাদার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে দুর্বল করে দেয়। আমার মতে, নতুন গাইডলাইন প্রণয়নের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি বিদ্যমান নিয়মের কঠোর প্রয়োগ, পর্ষদের গঠন সংস্কার ও জবাবদিহিমূলক নিয়ন্ত্রণ।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়ম তৈরি করে, কিন্তু শাস্তি কার্যকর হয় না– এ অভিযোগও অনেক পুরোনো। এর মূল কারণ আইনের অভাব নয়, বরং স্বাধীনতা, সক্ষমতা ও প্রয়োগের দৃঢ়তার ঘাটতি। অনিয়ম শনাক্ত হলেও দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় বাজারে ভুল বার্তা যায়– নিয়ম ভাঙলেও বড় কোনো সমস্যা হয় না। জটিল বীমা পণ্য, বিনিয়োগ ঝুঁকি ও অ্যাকচুয়ারিয়াল বিষয় (বীমা, পেনশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক ঝুঁকি মূল্যায়ন) তদারকে যে বিশেষায়িত দক্ষতা প্রয়োজন, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থায় এখনও পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি। তার ওপর রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী ব্যবসায়িক স্বার্থের চাপ অনেক সময় কার্যকর সিদ্ধান্তকে দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, আমাদের খাত এখনও মূলত এজেন্টনির্ভর বিক্রয় ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে। এ মডেলে বিক্রয়ের প্রণোদনাই মুখ্য; পণ্যের উপযুক্ততা ও দীর্ঘমেয়াদি দায় গৌণ। অনেক এজেন্টের আয় কমিশননির্ভর হওয়ায় পলিসির শর্ত ও সীমাবদ্ধতা পুরোপুরি ব্যাখ্যা না করেই পণ্য বিক্রির প্রবণতা তৈরি হয়। তবে বাংলাদেশের মতো দেশে এ মডেল সম্পূর্ণ বাতিল করা বাস্তবসম্মত নয়। সমস্যা মডেলে নয়; নিয়ন্ত্রণ ও কাঠামোর দুর্বলতায়। এজেন্ট ব্যবস্থাকে লাইসেন্সিং, বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ও আচরণবিধির পেশাদার কাঠামোয় আনতে হবে এবং কমিশন কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি ধরে রাখার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকাস্যুরেন্স, ডিজিটাল ও করপোরেট চ্যানেলের মাধ্যমে বিক্রয় চ্যানেলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান বীমা পণ্যগুলোও দেশের প্রকৃত চাহিদা বিশেষত স্বাস্থ্য বীমা, পেনশন ও কৃষি বীমার মতো খাত পর্যাপ্তভাবে পূরণ করতে পারছে না। অথচ উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে এসব পণ্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হওয়ার কথা। দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান, অ্যাকচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণ ও পুনর্বীমা সক্ষমতার অভাবে অনেক কোম্পানি সহজ ও স্বল্পঝুঁকির পণ্যের দিকেই ঝুঁকে থাকে। সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ঘাটতি কাটানো সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে ডিজিটাল রূপান্তরে আমাদের ধীরগতির কারণ প্রযুক্তিগত অক্ষমতার চেয়ে বেশি নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা। স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক ডিজিটাল রোডম্যাপ নেই। কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ ও তথ্য ভাগাভাগির নীতিমালা নেই। তা ছাড়া ডিজিটালাইজেশন মানে স্বচ্ছতা, আর স্বচ্ছতা মানে জবাবদিহি– এ কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের নীরব অনীহাও লক্ষণীয়। প্রিমিয়াম তহবিল আসলে গ্রাহকের ভবিষ্যৎ ক্লেইমের জন্য সংরক্ষিত একটি বিশ্বাসভিত্তিক তহবিল। এর বিনিয়োগে স্বচ্ছতা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত না হলে তারল্য সংকট, স্বার্থের সংঘাত ও সিস্টেমিক ঝুঁকির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা গ্রাহকের ওপরেই এসে পড়ে।
সংস্কারের তালিকা দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু তিনটি সিদ্ধান্তকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে টেকসই পরিবর্তন আসবে না। প্রথমত, ক্লেইম সুরক্ষাকে আইনি অধিকার হিসেবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা– নির্দিষ্ট সময়সীমা, স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ও গ্রাহক ক্ষতিপূরণের বিধানসহ। দ্বিতীয়ত, নিয়ন্ত্রক শাসনের দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ– প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত, পর্ষদ পরিবর্তন কিংবা বাজার থেকে প্রস্থান পর্যন্ত। তৃতীয়ত, পেশাদার মানবসম্পদ ও প্রযুক্তিভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তোলা– ঝুঁকিভিত্তিক আন্ডাররাইটিং, ডিজিটাল ক্লেইম, কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ ও ই-কেওয়াইসিকে বাধ্যতামূলক করা।
এখনই অর্থবহ সংস্কার শুরু না হলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে এ খাত একটি প্রান্তিক, আস্থাহীন ও অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর খাতে পরিণত হতে পারে। কোম্পানির সংখ্যা থাকবে, প্রিমিয়াম আদায়ও চলবে। কিন্তু ঝুঁকি হ্রাস ও আর্থিক নিরাপত্তার মূল উদ্দেশ্য পূরণ হবে না। দুর্বল বীমা খাত মানে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প ও অবকাঠামোয় ঝুঁকি সুরক্ষার অনুপস্থিতি, বিনিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সরকারের ওপর বাড়তি চাপ। আস্থাহীনতা এক দিনে তৈরি হয়নি। তা ভাঙতেও হবে সমন্বিত ও কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। এ অবহেলার মূল্য ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও সমাজ উভয়কেই অনেক বেশি দিতে হতে পারে।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক; চেয়ারম্যান, ফাইন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেড
- বিষয় :
- অর্থনীতি
- মামুন রশীদ
