চারদিক
অনলাইন জুয়া ও ঋণের ফাঁদ
জুয়েল হাসান
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১০:২৪
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের সহজলভ্যতাকে পুঁজি করে ওয়ানএক্সবেট মেলবেট, বাজি লাইভের মতো শত শত আন্তর্জাতিক অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপস দেশীয় এজেন্টের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিয়েছে। এটি আর কেবল শহরের উচ্চবিত্তের ড্রয়িংরুমের খেলা নয়, বরং তা পৌঁছে গেছে গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুম পর্যন্ত।
বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো লোকাল মোবাইল ব্যাংকিং চ্যানেলগুলোকে ব্যবহার করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, এই জুয়ার নেশা ধরে রাখতে এবং প্রাথমিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তরুণরা জড়িয়ে পড়ছে অনুমোদনহীন ও অবৈধ ‘ইনস্ট্যান্ট লোন অ্যাপস’ বা চড়া সুদের অনলাইন ঋণের ফাঁদে। মাত্র কয়েক হাজার টাকা ঋণের বিপরীতে হাজার গুণ মানসিক নির্যাতন আর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে গত কয়েক বছরে অসংখ্য শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থী বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার পথ। ক্যাসিনোর ডিজিটাল সংস্করণ আজ আমাদের প্রতিটি ঘরে ঢুকে পড়েছে ‘গেমিং’ কিংবা ‘সহজ উপার্জন’-এর ছদ্মবেশে। কৌতূহল দিয়ে যে পথ শুরু হয়, তা শেষ হয় ঋণের অতল গহ্বর, পারিবারিক ভাঙন ও নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ে। এই নীরব মহামারি যদি এখনই রুখে দেওয়া না যায়, তবে ২০২৬ সালের এই জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের অহংকার অচিরেই এক জনমিতিক অভিশাপে পরিণত হবে।
অনলাইন জুয়া ও ঋণের এই মরণফাঁদ কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়, বরং এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধাক্কা। জুয়ার বোর্ডে বাজি ধরা টাকাগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা হুন্ডির মাধ্যমে নিমেষেই পাচার হয়ে যাচ্ছে দেশের বাইরে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, ক্ষণিকের উত্তেজনায় হেরে যাওয়া টাকা তুলতে তরুণরা যখন তথাকথিত ‘সহজ ঋণ’ অ্যাপগুলোর দ্বারস্থ হয়, তখন সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এই অ্যাপগুলো উচ্চ সুদের পাশাপাশি ব্যবহারকারীর ফোনের কন্টাক্ট লিস্ট ও গ্যালারির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। পরে ঋণের টাকা পরিশোধে সামান্য দেরি হলেই শুরু হয় পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের ফোন দিয়ে মানহানিকর ব্ল্যাকমেইল। ফলে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। কেউবা বেছে নিচ্ছে আত্মহননের পথ।
এই নীরব মহামারি থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করতে হলে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে জুয়ার সাইট ও লোন অ্যাপগুলো স্থায়ীভাবে ব্লক করতে হবে। বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো সেবাদাতাদের সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেন (এমএফএস) কঠোরভাবে মনিটর করতে হবে এবং এজেন্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
১৯ শতকের প্রাচীন ‘পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ সংশোধন করে অনলাইন জুয়াকে কঠোর শাস্তিযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমে এর কুফল নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। পরিবারে সন্তানদের ডিজিটাল আচরণের ওপর অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে।
এই অন্ধকারের শেষ সীমানায় দাঁড়িয়ে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রত্যেক আত্মহননকারী তরুণের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি পরিবারের আজীবনের কান্না এবং একটি রাষ্ট্রের সম্ভাবনার অকালমৃত্যু। তাই সময় এসেছে এই মরণফাঁদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার। প্রশাসনকে যেমন আইনের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি সমাজের প্রতিটি স্তরে ফিরিয়ে আনতে হবে নৈতিক শিক্ষার আলো। খেলার ছলে বা কৌতূহলের বশে শুরু হওয়া এই মরণ নেশাকে সমূলে উৎপাটন করতে না পারলে আমাদের তারুণ্যের সব অর্জন এই ডিজিটাল ক্যাসিনোর গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাবে।
জুয়েল হাসান: প্রকৌশলী
- বিষয় :
- চারদিক
