সমকালীন প্রসঙ্গ
নবায়নযোগ্য জ্বালানি আনতে পারে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সৌরবিদ্যুৎ
আবুল কালাম আজাদ
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১৭:১৫
বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক প্রবণতা পর্যালোচনা করলে এটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের কোনো বিকল্প নেই। সময় যত গড়াবে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও দুর্বল হতে থাকবে। কারণ বিশ্বের অবশিষ্ট জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ক্ষমতাধর দেশগুলো একের পর এক যুদ্ধ ও আগ্রাসন চালাতে শুরু করেছে। ইউক্রেন, ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ঘটনাপ্রবাহ ও তার প্রভাব আমরা দেখছি এবং উপলব্ধি করছি। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির সরবরাহে অস্থিরতা ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিজনিত জ্বালানি সংকট দেখিয়ে দিয়েছে যে আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা কখনোই দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। তা ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নির্গত কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান হুমকি। ফলে পৃথিবী দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। ২০২৫ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ জীবাশ্ম জ্বালানিকে ছাড়িয়ে গেছে। এ রকম বাস্তবতায় যে দেশ যত দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করবে, সে দেশ তত দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যাবে। কারণ জ্বালানি ও বিদ্যুৎ আধুনিক অর্থনীতি ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫, ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য, সৌর প্রযুক্তিতে কর অব্যাহতি, বৈদ্যুতিক যানবাহনে প্রণোদনা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। এ জন্য সরকার অভিনন্দনের দাবিদার। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, পরিবেশ আন্দোলন, গবেষক এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের নিরলস প্রচেষ্টাও এ অগ্রগতির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, দেশে উল্লেখযোগ্য জীবাশ্ম জ্বালানির মজুত নেই অথচ আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর ভিত্তি করে। দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ফলে ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানি জাতীয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। অন্যদিকে সৌর, বায়ু ও বায়োগ্যাসের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আমরা এখনও সেই সম্ভাবনাকে পর্যাপ্তভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এই খাতে তেমন কোনো বিনিয়োগ করিনি।
বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর কেবল জ্বালানির উৎস পরিবর্তনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব, নিরবচ্ছিন্ন ও মানবসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থাৎ এটি শুধু একটি জ্বালানি নীতি নয়; এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতা স্বতন্ত্র ও বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভিন্ন। এটি নদীবেষ্টিত একটি ব-দ্বীপ ও প্রচুর জলাশয় রয়েছে, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, বিশাল যুব জনগোষ্ঠী থাকলেও তীব্র বেকারত্ব রয়েছে, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এবং পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন, গ্রামপ্রধান এবং গুচ্ছবদ্ধ বসতি, অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও পর্যাপ্ত উৎপাদন ইউনিট গড়ে ওঠেনি, কৃষিনির্ভর কিন্তু ভূমি দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে, মাথাপিছু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ব্যবহার নিম্নস্তরে কিন্তু চাহিদা বাড়ছে দ্রুতগতিতে।
শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে নয়, বাংলাদেশের যে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করার আগে উপরোক্ত আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি। কিন্তু আমাদের উন্নয়ন ভাবনায় এই প্রেক্ষাপটকে কখনোই তেমনভাবে বিবেচনা করা হয় না। আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলকে অনুসরণ করা হয়েছে বুঝে না বুঝে। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে অন্য দেশের মডেল হুবহু অনুসরণ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একই ভুল করা যাবে না। বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতে একটি বিকেন্দ্রীভূত ও অংশগ্রহণমূলক মডেল।
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা সৌরবিদ্যুৎ। পাশাপাশি বায়ু ও বায়োগ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে আমাদের গ্রাম ও পরিবারভিত্তিক বিকেন্দ্রীভূত ও সমন্বিত মডেল গ্রহণ করতে হবে। যেমন– গ্রামভিত্তিক অফগ্রিড ও পরিবারভিত্তিক সৌরব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি যথাসম্ভব বায়োগ্যাস ও বায়ুবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হবে। যাতে গ্রামগুলো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর জন্য ও সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য উদ্ভাবনীমূলকভাবে কাস্টমাইজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন ও গ্রামভিত্তিক উৎপাদন ইউনিট গড়ে তোলাকে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। যেমন– সৌর সেচ ব্যবস্থাকে এমনভাবে কাস্টমাইজ করতে হবে, যাতে সেচের কাজ শেষ হয়ে গেলে সোলার প্যানেলগুলো বসে না থেকে কাজে লাগে। এ ক্ষেত্রে ঠাকুরগাঁয়ের কৃষক সোলেমান আলীর মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োগ করার বিষয় বিবেচনা করা যেতে পারে। তিনি নিজস্ব উদ্ভাবিত সোলার ট্র্যাকার ব্যবহার করার পাশাপাশি সৌর সেচ ব্যবস্থাকে এমনভাবে কাস্টমাইজ করেছেন, যাতে ভূমি ব্যবহার না করেই সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছেন। সেচ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে ভূপৃষ্ঠের সঞ্চিত পানি ব্যবহারের দিকে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের খাল কাটা কর্মসূচি দারুণ সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। খাল কাটা কর্মসূচি, সেচ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ঘিরে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা করা দারুণভাবে সময়োপযোগী হবে।
এভাবে সৌরবিদ্যুতের কাস্টমাইজ ব্যবহারের সমন্বিত পরিকল্পনা করা গেলে ভূমির ব্যবহার না করেই আমরা বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হবো। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শুধু প্রাথমিক আলোর উৎস হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; যেমনটা ছিল ইতোপূর্বেকার ‘হোম সোলার সিস্টেমে’। বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি হয়ে উঠবে আবাসন ও বাণিজ্যিক বিদ্যুতের উৎস, গ্রাম সমাজে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উৎপাদন ইউনিট গড়ে ওঠার শক্তি। এর মধ্যে গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি ও কৃষিনির্ভর উৎপাদন ইউনিট দ্রুত সম্প্রসারিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণসঞ্চার আর বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে যা আমাদের চিরায়ত গ্রামীণ সমাজের চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
বস্তুত আমাদের গ্রামীণ সমাজে উৎপাদন ইউনিট গড়ে না ওঠার প্রধান কারণ নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্পন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ না থাকা। যে কারণে সারাদেশে জাতীয় গ্রিড লাইন ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হলেও তা মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সমন্বিত উদ্যোগে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীও নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা পাবেন। বিশেষত রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এসব খাতে বিনিয়োগ হতে পারে। রেমিট্যান্সের টাকার একটি বড় অংশ বিনিয়োগ হয়ে থাকে জমি ক্রয়ে। যে কারণে বাংলাদেশে বিগত তিন-চার দশকে জমির দাম আকাশচুম্বী হয়ে গেছে, জমির উৎপাদন ক্ষমতা না বাড়া সত্ত্বেও।
অনেক বছর ধরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির আলাপে মূল ইস্যু হয়ে রয়েছে ভূমি। ভূমির অভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি করা যাচ্ছে না, দীর্ঘদিন ধরে এমনটাই ছিল নীতিভাষ্য। এটা সত্য, বৃহৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করার জন্য আমাদের জমি নেই। বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন হয় না বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলে না এ রকম অব্যবহৃত জমি খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে ভূমি ব্যবহার ব্যতীত আমাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের বহু বিকল্প রয়েছে। কিন্তু সে বিষয়ে তেমন কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়নি বা বিনিয়োগ করা হয়নি। জীবাশ্ম জ্বালানি অনুসন্ধানের জন্য যে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার করার উপায় অনুসন্ধানে তেমন কোনো বিনিয়োগই করা হয়নি।
বস্তুত, এ মুহূর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের জন্য ভূমির প্রয়োজনীয়তা নেই। জমি ছাড়াই আমরা বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারি। তার জন্য কিছু মূল্যায়ন ও জরিপ কার্যক্রম চালাতে হবে। আমরা দুটো গ্রাম নিয়ে একটি জরিপ চালিয়ে দেখেছি যে কোনো কৃষিজমি ব্যবহার না করেই ওই দুটি গ্রামে এক মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা সম্ভব, যা ওই গ্রামের বর্তমান বিদ্যুৎ চাহিদার চাইতে বহুগুণ বেশি। এ রকম জায়গা বাংলাদেশের প্রায় সব গ্রামেই কমবেশি পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছে। আমরা চাইলে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি প্রযুক্তি হিসেবে দেখতে পারি। আবার এটিকে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প, পরিবেশ এবং সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হিসেবেও গ্রহণ করতে পারি। দ্বিতীয় পথটিই আমাদের জন্য বেশি টেকসই ও ফলপ্রসূ হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত আমাদের শিখিয়েছে যে প্রথাগত উন্নয়ন মডেল দিয়ে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। উন্নয়নকে নতুনভাবে ভাবতে হবে, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান, স্থানীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ হবে মূল ভিত্তি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তর তাই কেবল একটি জ্বালানি রূপান্তর নয়; এটি একটি নতুন উন্নয়ন প্রকরণ। সঠিক পরিকল্পনা, অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি এবং স্থানীয় উদ্ভাবনের মাধ্যমে এই রূপান্তরই বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী, ন্যায়ভিত্তিক, কর্মসংস্থানমুখী ও টেকসই অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে।
আবুল কালাম আজাদ : উন্নয়ন ও পরিবেশকর্মী
[email protected]
- বিষয় :
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি
