ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

শুভ নববর্ষ

করোনা থেকে শুচি হোক ধরা

করোনা থেকে শুচি হোক ধরা
×

সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে ১৪২৭ বাংলা নববর্ষে আমরা যখন সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি, তখন এই পঞ্জিকা অনুসরণকারী বঙ্গীয় ব-দ্বীপের সমাজ ও অর্থনীতি আগের নতুন বছরগুলোর মতো নেই। কেবল বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও

--

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২০ | ১২:৪৩ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

সমকাল পরিবারের পক্ষ থেকে ১৪২৭ বাংলা নববর্ষে আমরা যখন সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি, তখন এই পঞ্জিকা অনুসরণকারী বঙ্গীয় ব-দ্বীপের সমাজ ও অর্থনীতি আগের নতুন বছরগুলোর মতো নেই। কেবল বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা নয়; বাঙালি অধ্যুষিত সব ভূখণ্ডই এখন করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এক অস্বাভাবিক সময় অতিবাহিত করছে। বস্তুত বৃহত্তর বিশ্বই এখন এই ক্ষুদ্রাতি ভাইরাসের বিস্তার ও সংক্রমণে জেরবার। আমরা জানি, কেবল বাঙালি জাতি নয়; কমবেশি একই সময়ে নববর্ষ পালন করে এশীয় আরও অনেক জাতি। সবার নববর্ষই এবার কাটবে ঘরবন্দি অবস্থায়। নববর্ষ পালনের মূল তাৎপর্য সাংস্কৃতিক। আবহমানকাল থেকে পালিত হয়ে আসা এক আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা। করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও বিস্তার মানুষকে বাধ্য করছে নতুনতর আচরণ ও সংস্কৃতিতে। তারপরও আমরা আবহমানকালের সংস্কৃতি মেনেই সবাইকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাতে চাই।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে আকাঙ্ক্ষা করেছেন বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখে- 'মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।' আমরা বিশ্বাস করি, কবির এই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা অন্যান্য পহেলা বৈশাখের মতো আজও মত ও পথ নির্বিশেষে সব বাঙালি হৃদয়ে দোলা দেবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান বাস্তবতায় আমরা প্রত্যাশা করি, করোনাভাইরাসের আক্রমণ কাটিয়ে উঠেই শুচি হবে ধরা। শুচি হবে বাংলাভাষী ও বাঙালি সংস্কৃতি অধ্যুষিত বাংলা নববর্ষ উদযাপনকারী অঞ্চল। আমরা জানি, একই সময়ে পালিত হচ্ছে বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈসাবি তথা বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু উৎসব। আমরা তাদেরও জানাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আমরা দেখতে চাই, এবারের নববর্ষের আনুষ্ঠানিকতা ঘরে থেকেই পালন করবেন সবাই। সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে একই আহ্বান।
নববর্ষ সামনে রেখে আমরা প্রত্যয় ব্যক্ত করতে চাই- অতীতের আরও নানা দুর্যোগ ও মহামারির মতো করোনাভাইরাসকেও আমরা পরাস্ত করতে সক্ষম হবো। নতুন বাংলা বছরে নতুনতর উপলব্ধি আমাদের ভবিষ্যতের দুর্যোগগুলোতেও আরও সতর্ক ও সচেতন রাখবে। আমরা প্রত্যাশা করি- নতুন বছরের অরুণোদয় সবার জন্য নতুন আলো ও নবীন সম্ভাবনা নিয়ে আসবে। বিদায়ী বছরের শেষভাগে এসে করোনাবিরোধী যে লড়াই প্রশাসন, চিকিৎসক, শৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবাদিকসহ আমরা বিভিন্ন পেশাজীবী চালিয়ে যাচ্ছি, নতুন বছরে সে ক্ষেত্রে বিজয় দেখব। দেশের জনসাধারণ যে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করে যাচ্ছে, নতুন বছরে তার স্বস্তিদায়ক অবসান হবে।
আমরা প্রত্যাশা করি- চৈত্রের শেষ সময়ে এসে প্রকৃতিতে যে তীব্র তাপদাহ দেখা দিয়েছিল, বৈশাখের বিচ্ছিন্ন বর্ষণ তাতে কেবল প্রশান্তিই আনবে না; করোনা-তাপে দগ্ধ মানুষও সেরে উঠতে থাকবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ১৪২৬ সনের গাঢ় ছায়া অপসারিত হয়ে নতুন বছরের সূর্যোদয় বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য নিয়ে আসবে নতুন আলো। আমাদের স্বাস্থ্য গবেষকরা ইতোমধ্যে করোনাভাইরাস পরীক্ষার কিট তৈরির দ্বারপ্রান্তে। আমরা আশা করি, করোনা প্রতিষেধক টিকাও নতুন বাংলা বছরে আবিস্কৃত হবে এবং বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশও তার সুফল পাবে। প্রকৃতির জীর্ণ-শীর্ণ ঝরাপাতার মতো পুরাতন বছর শেষে ঝরে পড়বে দুঃস্বপ্নের দিন ও রাত্রিগুলো। করোনাকালে সৃষ্ট রোগ-শোক, ক্ষুধা কাটিয়ে স্বাস্থ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি নতুন সবুজ পাতার মতো অঙ্কুরিত হবে নতুন বছরে। আমরা জানি, করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন বছরে নতুন ফসলের হাসিতে যাতে কৃষকের এই অনিশ্চয়তা উড়িয়ে দেওয়া যায়, সে জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নতুন বছরে যেন গুঞ্জরিত হয় নতুন দিনের গান।
আমরা জানি, এবার বর্ষবরণের স্বাভাবিক আয়োজন নেই। কিন্তু আমরা এও জানি, বাংলার হাজার বছরের বহমান লোকজ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাতে মলিন হবে না। এই পরিস্থিতিতেও জাগ্রত থাকবে আমাদের শান্তি ও সম্প্রীতির ঐতিহ্য। জনসমাগম না হোক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিসরে নতুন বছরের উদযাপনে উড়ে যাবে সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতার সব অপশক্তি। দুঃসময় কেটে গিয়ে সুসময়ে বাংলা নববর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক উৎসব হয়েই থাকবে। ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র, জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাই আবারও বাংলা নববর্ষে মিলিত হবে। আগামী দিনগুলোতেও আমরা একত্র হয়ে গাইব বাঙালিত্ব তথা মানবতার জয়গান। আমরা চাই, নীরব উদযাপনের মধ্য দিয়েও বাংলা নববর্ষে বাঙালির সাংস্কৃতিক সংগ্রাম আরও শক্তিশালী হোক। সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধিতে ঋদ্ধ হবে বাংলাদেশ। শুভ নববর্ষ!

আরও পড়ুন

×