ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জন্মশত বার্ষিকী

তাজউদ্দীন আহমদের যথার্থ মূল্যায়ন হবে কবে?

তাজউদ্দীন আহমদের যথার্থ মূল্যায়ন হবে কবে?
×

তাজউদ্দীন আহমদ

মইনুল ইসলাম

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৫ | ০০:১৬

আরও কয়েক বছর আগে তাজউদ্দীন আহমদের ৯৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে চট্টগ্রামে এক আলোচনা সভায় আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি শুধু বিএনপি বা জামায়াত করে না; মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের দাবিদার আওয়ামী লীগও করে (প্রথম আলো, ২৪ জুলাই ২০২২)। বলেছিলাম, বাংলাদেশের ট্র্যাজেডি হলো, মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি তাজউদ্দীন আহমদের জন্মবার্ষিকী রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হয় না।

এরপর দেশে অনেক কিছু ঘটে গেছে; আওয়ামী লীগ সরকার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের ফসল হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, সেটাও এক বছর হতে চলল। এর মধ্যে অনেক কিছুই ‘সংস্কার’ করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্ব দেওয়া এবং দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের যথার্থ মূল্যায়ন আজও অধরা। এর মধ্যেই এসেছে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী।  

বরং কিছুদিন আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অবস্থিত শহীদ তাজউদ্দীন সরকারি কলেজের নাম পরিবর্তন করে কাপাসিয়া সরকারি কলেজ নামকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীনের নামে যে কলেজের নামকরণ করা হয়েছিল, সে কলেজের নাম পরিবর্তন ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কী? অবশ্য সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত ওই সিদ্ধান্ত বদল হয়। কিন্তু তাতে তাজউদ্দীনের যথাযথ মূল্যায়নের প্রশ্নটির মীমাংসা হয় না। 
অভিযোগ রয়েছে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যে ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে, তার সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী জামায়াত-শিবির গোষ্ঠী। তাদের অনেকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পরিচয় ধারণ করে নিজেদের ঠিকানা লুকাতে সমর্থ হয়েছিল। পরে তারা তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে এবং তাদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে খাটো করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। 

গণঅভ্যুত্থানের সময় ও পরের দিনগুলোতে মুখোশধারী সুবিধাবাদীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্যে ভাঙচুর চালালেও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ভাস্কর্যে ফুলের মালা পরিয়েছিল। কিন্তু, এখন যখনই সুযোগ পাচ্ছে তাজউদ্দীন আহমদের নামও মুছে ফেলতে চাইছে। আমরা জানি, শেখ হাসিনা সরকার কখনোই শহীদ তাজউদ্দীনের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি। মুক্তিযুদ্ধের কাণ্ডারি তাজউদ্দীনের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা প্রদানে অন্তর্বর্তী সরকারও বিস্ময়কর কৃপণতা দেখাবে কেন? 

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বিকেলে যখন ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করলেন তখনই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল– পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালি জাতির ওপর সশস্ত্র আঘাত হানতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বেরও এ ব্যাপারে প্রস্তুতি ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু এ ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছিলেন। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতে আক্রমণের জন্য ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাবাহিনীর রওনা হওয়ার খবর পেয়েই তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুর বাসায় গেলেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেতে। পুরান ঢাকার একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল আত্মগোপনের জন্য। কিন্তু ইতিহাসের ওই যুগসন্ধিক্ষণে শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বঙ্গবন্ধু কোথাও যেতে রাজি হলেন না। একজন জননেতা হিসেবে তিনি যে সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন– আন্তর্জাতিকভাবে মুক্তিযুদ্ধটি জনযুদ্ধ হিসেবে সমর্থন পাওয়ার মধ্য দিয়ে সেটা পরবর্তী সময়ে প্রমাণ হয়েছিল। 
২৫ মার্চের ওই রাতে বঙ্গবন্ধুকে আত্মগোপনে যেতে রাজি করাতে না পেরে বিক্ষুব্ধ চিত্তে ঘরে ফিরেছিলেন তাজউদ্দীন। এরপর কীভাবে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম তাজউদ্দীনকে বাসা থেকে নিজ গাড়িতে তুলে নিয়ে লালমাটিয়ার এক বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন এবং ২৭ মার্চ কারফিউ প্রত্যাহারের পর জীবন বাজি রেখে তিন দিন তিন রাতের কঠিন ও বিপৎসংকুল যাত্রাপথে ৩০ মার্চ কুষ্টিয়ার জীবননগর সীমান্তের টুঙ্গি নামক জায়গার একটি কালভার্টের ওপর পৌঁছে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং মাহবুব উদ্দিন আহমদকে বিএসএফ ক্যাম্পে আলোচনার জন্য পাঠিয়েছিলেন, তার শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা তাজউদ্দীনকন্যা শারমিন আহমদের বহুল আলোচিত বইটির ১০৬-১১০ পৃষ্ঠায় উল্লিখিত আছে। 

তাজউদ্দীন ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক সাক্ষাৎকারে জাতিকে জানিয়েছিলেন, ওই কালভার্টের ওপর অপেক্ষা করার সময়েই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন– একটা স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন এবং তার জন্য ভারতের সাহায্য কামনা করবেন। সফল আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তাজউদ্দীন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে বিএসএফ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন বিএসএফের পশ্চিমবঙ্গের আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদার। তাঁর মাধ্যমে বিএসএফ মহাপরিচালক রুস্তমজী খবর পেয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দীন ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সাক্ষাৎদানে সম্মত হওয়ায় তাদের নয়াদিল্লি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। 
দিল্লি পৌঁছানোর পর এপ্রিলের ৩ তারিখে শ্রীমতী গান্ধীর সঙ্গে তাদের সাক্ষাৎ ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একাধিক আলোচনার পর ১০ এপ্রিল তাজউদ্দীন বেতার ভাষণে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেন, যাতে মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত হাইকমান্ডের সদস্যদের মন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা ঘোষণার ওই ভাষণটির মুসাবিদা করেছিলেন তাজউদ্দীন, ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ও প্রফেসর রেহমান সোবহান। এ পরিপ্রেক্ষিতেই রচিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিলের মুজিবনগর দিবসের ইতিহাস। এই ইতিহাসের স্রষ্টাকে তাঁর প্রাপ্য সম্মান দিতে অপারগতা কেন?

মুক্তিযুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন থিয়েটার রোডের অফিস কক্ষের পাশের কক্ষে রাত কাটিয়েছেন। যদিও তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা পরে কলকাতায় গিয়েছিলেন, কিন্তু তাজউদ্দীন এক দিনও তাদের সঙ্গে বাসায় থাকেননি। মাত্র দুটো শার্ট-প্যান্ট ছিল তাঁর পরিধেয়। গোসলের সময় নিজ হাতে কাপড়গুলো ধুয়ে পরদিন তা পরে তিনি অফিস করতেন। দিনরাত ১৭-১৮ ঘণ্টা তিনি কর্মব্যস্ত থাকতেন। 
১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ক্রান্তিলগ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তির বিনিময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কনফেডারেশন গঠনের মার্কিন প্রস্তাবে সায় দিয়ে খন্দকার মোশতাকের ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে ‘স্বাধীনতা, শুধুই বাংলাদেশের স্বাধীনতা’র সপক্ষে তাজউদ্দীনের আপসহীন অবস্থান গ্রহণকে সম্মান জানানো কি জাতির অবশ্যকর্তব্য নয়?
বিজয় অর্জনের পর ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর তাজউদ্দীন ঢাকায় ফিরে এসে সরকারের হাল ধরেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর যখন প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তখন নীরবে ওই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন তাজউদ্দীন। দেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে সরকারে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মনি ও খন্দকার মোশতাক চক্রের ফাঁদে পড়ে (কিংবা পরিবারের অন্য কারও মাধ্যমে) তাজউদ্দীন সম্পর্কে উল্টাপাল্টা ধারণা পেয়ে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ফলে তাজউদ্দীন প্রথম থেকেই ওই সরকারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে সরকার থেকে পদত্যাগ করতে আদিষ্ট হয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর ওই চরম দুর্দশার দিনগুলোতে মন্ত্রিসভার সবচেয়ে মেধাবী ও কর্তব্যপরায়ণ সদস্য হিসেবে সবার শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন তাজউদ্দীন। যেদিন বঙ্গবন্ধু তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করলেন, সেদিন এক বন্ধুর গাড়িতে তিনি অফিস থেকে বাসায় ফিরেছিলেন; অফিসিয়াল গাড়ি ব্যবহার করেননি।
বই বা গবেষণাপত্রে যতবার মুক্তিযুদ্ধে তাজউদ্দীনের অবদানের কথা পড়ি, ততবার শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। গর্ব অনুভব করি। তিনি এমন ব্যক্তি, যিনি সারাজীবন তাঁর কথা, কাজ ও দায়িত্ব পালনের সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে যাননি। কখনও সমঝোতা করেননি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি। যদি পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারে যোগ দেওয়ার চাপ মেনে নিতেন, তাহলে হয়তো ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাঁকে কারাগারে নির্মমভাবে নিহত হতে হতো না।
তাজউদ্দীন আহমদের জন্মশতবার্ষিকীতে আমি মনে করি, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য এই মহান নেতার প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা উচিত। 

অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম: একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি

আরও পড়ুন

×