সমকালীন প্রসঙ্গ
তথ্য কমিশনে কানা মামাও থাকবে না?
চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ না দিয়ে তথ্য কমিশনকে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে
ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ | ১৭:৪২
আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তথ্যের অবাধ সরবরাহ। গত কয়েক দশক ধরে অপতথ্যের ব্যাপকতা পৃথিবীময় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এটি একুশ শতকের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ বলা যায়! আপনার চারপাশে মিলিয়ন মিলিয়ন তথ্য ঘুরপাক খাচ্ছে, কিন্তু আপনি জানেন না কোনটি সঠিক কিংবা বেঠিক। তথ্য দিয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ভাষ্য। কোথাও ন্যায্যতার পক্ষে, কোথাও সহিংসতার পক্ষে। এই তো ক’দিন আগে বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংবাদমাধ্যমের গোমর ফাঁস করে দিয়েছে আরেকটি প্রতিষ্ঠান। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে বিবিসি গাজা হত্যাকাণ্ডে ইসরায়েলের পক্ষে বয়ান তৈরি করে যাচ্ছে। শুধু বিবিসি নয়, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টের মতো সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। আলজাজিরা এ নিয়ে একাধিক কলাম প্রকাশ করেছে।
তাহলে এই সংকট কী বার্তা দেয়? এর মানে হলো আমাদের সামনে যেসব মাধ্যম সত্য ও বাস্তবতা তুলে ধরত, তাই এখন মিথ্যা ও অপতৎপরতার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এতে করে বিদ্যমান তথ্য সরবরাহের মাধ্যমগুলো নিয়ে মানুষের অবিশ্বাস ও অনাস্থার পত্তন ঘটেছে। বিষয়টির প্রভাব এতটা নিরীহ নয়, যতটা আমরা কয়েক শব্দে বলে ফেলছি। দুনিয়ার বহু জায়গায় অপতথ্য কিংবা গুজবের ভিত্তিতে জাতিনিধনের মতো কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে!
এখন আপনি হয়তো পাল্টা উত্তর দেবেন যে, চারপাশে যেমন অপতথ্য বেড়েছে, তেমনি তা যাচাই করার টুলসও তৈরি হয়েছে। যেমন, ফ্যাক্টচেকিংয়ের কথাই বলা যাক। স্বীকার করছি, আধুনিক মানুষ মাত্রই তথ্য যাচাই করে নেবে। বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলো যখন প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে ভাষ্যনির্মাণ ও অপতৎপরতায় ইন্ধন দেয়, তাহলে সেই ‘আধুনিক মানুষ’ কী করবে? স্পষ্টত, এখানে নতুন দায়, চ্যালেঞ্জ ও সংকটের সৃষ্টি হয়।
প্রায় সারা দুনিয়াতে এখন তথ্য পাওয়ার অধিকারের আইনি স্বীকৃতি রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে ৭০টির বেশি রাষ্ট্রে এই স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৭৬৬ সালে প্রথম সুইডেনে এ ধরনের আইন কার্যকর হয়, যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আইন বলে পরিচিত। মূলত এই আইনের অধীনে সরকার নাগরিকদের তথ্য সরবরাহ করে। এখন নতুন বার্তা যুক্ত করা জরুরি। কেবল তথ্য দিলেই চলবে না, সঠিক তথ্য যাচাই করে তারপর নাগরিকদের কাছে সরবরাহ করতে হবে।
সার্কভুক্ত বেশির ভাগ রাষ্ট্রই তথ্য অধিকার আইন প্রবর্তন করেছে। ২০০২ সালে পাকিস্তান তথ্য স্বাধীনতা অধ্যাদেশ বলবৎ করে। ভারতে এ ধরনের আইন ২০০৫ সালে গৃহীত হয়; যা তথ্য অধিকার আইন নামে পরিচিত। বাংলাদেশ ২০০৯ সালে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর করে। সংবিধানেও চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০০৯ সালে বাংলাদেশে আলাদা করে তথ্য কমিশন নামে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এটি বর্তমানে সক্রিয় নয়। বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানতে পেরেছি যে, এখনও সরকার তথ্য ও মানবাধিকার কমিশন গঠন করেনি। টিআইবি এ ব্যাপারে উদ্বেগ জানিয়েছে।
এটা ঠিক, কেবল কমিশন গঠন করে কার্যকরী কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর কোথাও এত কমিশন ও প্রতিষ্ঠান আছে কিনা আমার সন্দেহ, যেগুলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে কাজ করে। অথচ এখানেই পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় দুর্নীতি হয়, অস্বচ্ছ লেনদেন ঘটে। তার চমৎকার উদাহরণ হলো, দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক। অদ্ভুত হলেও সত্য যে, আমরা স্বয়ং দুদকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। সুতরাং প্রতিষ্ঠান কিংবা কমিশন প্রতিষ্ঠা করাটা বড় কথা নয়, সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে গড়ে তোলা এবং আইন প্রয়োগে যথাযথ প্রক্রিয়াগুলো মেনে চলা। তথ্য কমিশনের ক্ষেত্রে অবশ্য গোড়ার কাজটিই বাকি। অর্থ্যাৎ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ না দিয়ে অকার্যকর করে রাখা হয়েছে। বাংলা প্রবাদ আছে, নাই মামার চেয়ে কানা মামাই ভালো। তথ্য কমিশনে কানা মামাও যে নেই!
ইফতেখারুল ইসলাম: সহসম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- তথ্য কমিশন
