সাক্ষাৎকার
নারীদের মাইনাস করার তৎপরতা কোনোভাবে মেনে নেব না
সামান্তা শারমিন
সামান্তা শারমিন
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩২ | আপডেট: ০২ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০৬
সামান্তা শারমিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক। আগে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। গত এক দশকে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের প্রাপ্তি, এনসিপির জুলাই যাত্রা, ভবিষ্যৎ কর্মপ্রণালি এবং রাজনীতিতে নারীদের অবস্থান বিষয়ে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সমকালের সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
সমকাল: গতকাল আপনাদের জুলাই পদযাত্রা শেষ হয়েছে। কেমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন?
সামান্তা শারমিন: জুলাই পদযাত্রা নতুন দল হিসেবে এনসিপির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচি ছিল, যেটির পরিকল্পনা আমাদের দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। আর সেটি জুলাই-আগস্টে হওয়া রাজনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বের দাবি রাখে। পদযাত্রার সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দুটি দিকের গুরুত্ব নিয়েই কথা বলব। আমরা একটার পর একটা জেলা ঘুরে দেখেছি, এতে প্রতিটি জেলা সম্পর্কে একটা তুলনামূলক বোঝাপড়া আমাদের হয়েছে। একটা জেলার বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্র্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর ব্যাপারে আমাদের একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। আমাদের বক্তৃতায় প্রতিটা জেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সমস্যা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আর ওইসব জেলার প্রারম্ভিক সংগ্রাম ও লড়াইয়ের ইতিহাস নিয়ে আমরা পড়াশোনা করেছি। এটার মধ্য দিয়েও আমাদের মধ্যে দেশব্যাপী একটা ইউনিফিকেশন তথা ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা ছিল। এটা সাংগঠনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সমকাল: পদযাত্রার রাজনৈতিক গুরুত্ব কোথায়?
সামান্তা শারমিন: এত স্বল্প সময়ে কর্মসূচিটি গৃহীত হয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একেবারেই নজিরবিহীন। সেই জায়গা থেকে জুলাই পদযাত্রা এনসিপির একটি মাইলফলক বলে মনে করি। আর জুলাই-আগস্ট মাসে আমাদের অসংখ্য শহীদ হয়েছেন এবং অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অনেকে আহত হয়েছেন। আমরা প্রতিটি জেলা পর্যায়ে সেসব শহীদের পরিবার ও আহতদের সাক্ষাতের সুযোগ পেয়েছি। এটাও আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল এবং নিজেদের ঝালাই করে নিতেও এটি দরকার ছিল, যাতে আমাদের স্মৃতিবিভ্রম না ঘটে। সামনের দিনে যেহেতু এসব তরতাজা, জীবন্ত অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি পাথেয় হয়ে থাকে।
সমকাল: মাসব্যাপী এই পদযাত্রায় নারী ইস্যু কেমন ছিল?
সামান্তা শারমিন: বাংলাদেশের ইতিহাসে নারীর কথা চিন্তা করে রাজনৈতিক ইশতেহার দেওয়া, রাজনৈতিকভাবে জাতীয় লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা– এটা কখনও দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়; তত্ত্বায়নের দিক থেকেও নারীর কথা মাথায় রেখে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা গড়ে ওঠেনি।
সমকাল: নারীদের নিয়ে আলাদাভাবে ইশতেহার প্রণয়ন ও তত্ত্বায়নের প্রয়োজন কেন?
সামান্তা শারমিন: আমি মনে করি, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রায় ৫২ শতাংশ নারীর কথা বিবেচনায় নিয়ে যদি রাজনৈতিক তত্ত্ব ও কর্মসূচির এন্তেজাম না হয়, তাহলে এই জনগোষ্ঠীর আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজনৈতিক উত্তরণ ঘটানো সম্ভব নয়। আমরা পরবর্তী সময়েও দেখেছি, নারীদের আসনসংখ্যা নির্ণয়কালে সম্মানজনক উপায়ে কোনো পথ বের করতে পারিনি। এটা আমাদের জাতির জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ব্যর্থতা বলে চিহ্নিত করা উচিত। সুতরাং এত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিকভাবে উত্তরণ ঘটাতে চাইলে নারীদের জন্য সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।
সমকাল: নারীদের ব্যাপারে জাতীয় নাগরিক পার্টি কি আলাদা কোনো নীতিকৌশল গ্রহণ করেছে?
সামান্তা শারমিন: জাতীয় নাগরিক পার্টি ওয়াদা করেছে– তার রাজনীতি হচ্ছে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর উত্থান ঘটানো। সেটি নিশ্চয় ৫২ শতাংশ নারীকে বাদ দিয়ে হতে পারে না। নারীদের কথা চিন্তা করে আলাদাভাবে তাদের জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যেখানে আমাদেরও ঘাটতি রয়েছে। রাজনীতিতে সর্বস্তরের নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, তরুণ, প্রবীণ সবাইকে মাথায় রাখতে হবে। আমি অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক উত্তরণের একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এটা যদি আমরা কাজে লাগাতে না পারি, আবারও দেখা যাবে নারীদের এখনও সংরক্ষিত আসনে বন্দি থাকতে হবে এবং নারী সদস্যদের মূলধারার রাজনীতিতে আনা সম্ভব হবে না।
সমকাল: বিদ্যমান রাজনৈতিক বন্দোবস্তে নারীদের অংশগ্রহণ তো রয়েছে।
সামান্তা শারমিন: বাংলাদেশে যে কয়টি রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের যেসব কর্মসূচি দেখছেন, সেখানে আমরা নারীর উপস্থিতি দেখি। কিন্তু সেগুলো নামে মাত্র। আমার নিজের উদ্বেগের ব্যাপারটি হলো, এসব রাজনৈতিক কর্মসূচির পরিকল্পনা যেখান থেকে আসে, যাকে আপনি ‘কন্ট্রোর রুম’ বলতে পারেন, সেখানে নারীর কোনো উপস্থিতিই নেই। কথিত ডিপ স্টেট কিংবা এস্টাবলিশমেন্টের কোথাও নারীদের খোঁজ পাবেন না। এটা পুরোটাই নারীকে উপেক্ষা করার পরিকল্পিত বন্দোবস্ত। কিন্তু আবহটা এমনভাবে দেওয়া হয়, নারীদের শরিকানা রয়েছে। এটা লুকানোর জন্য তারা কর্মসূচিতে নারীদের সামনের কাতারে রাখে। বাস্তবতা হলো, আমার নিজের পার্টির ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। নারীদের ব্যবহার করার এক ধরনের মনোবৃত্তি বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে রয়েছে। আমি মনে করি না, এনসিপি পুরোপুরি এ পরিস্থিতির বাইরে যেতে পারছে।
পদযাত্রাকালে আমরা প্রতিটি জেলায় অভ্যুত্থানের শরিক নারীদের সঙ্গে দেখা করেছি, আলাপ করেছি। অভ্যুত্থানের নারীদের অনেকাংশে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের কিছু দুর্বলতা থাকতে পারে। দুর্বলতা সবার আছে। পরিকল্পিতভাবে অনেক জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। জেলা, মহানগর কমিটিগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ যথেষ্ট কম। প্রতিযোগিতা কমিয়ে ফেলতেই নারীদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার এই দৌড়ে সবার আগে বাদ পড়ে নারীরা। কিন্তু যখনই আমরা মাঠ পর্যায়ে বিচরণ করেছি, দেখেছি অসংখ্য নারীর উপস্থিতি। যুদ্ধটা যে নারীরা করেছেন, তাতে বহু ক্ষেত্রে সেটি স্পষ্ট হয়েছে, কিন্তু তাদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে না। তারা আমাদের কাছে এসেছেন, নিজেদের কথা তুলে ধরেছেন। আমরা কেন্দ্রীয় জায়গায় এ ধরনের সমস্যার অনেকটা নিরসন করতে পারছি, যা প্রান্তিক পর্যায়ে সম্ভব হয়নি। এনসিপিতে নারীদের ব্যাপারে আমার এই সংগ্রাম সব সময় থাকবে। আত্মসমালোচনা না করলে আমরা এগোব কী করে? তবে আমি মনে করি, এই জায়গায় এনসিপির একটা বড় সুযোগ রয়েছে।
সমকাল: কোন ধরনের সুযোগের কথা বলছেন?
সামান্তা শারমিন: এনসিপিতে যেসব নারী এসেছেন, তারা শুধু নিজেদের এখানে পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হতে আসেননি। তারা যদি দেখেন যে, পলিটিক্যাল নিউক্লিয়াসে নারীদের উপেক্ষা করা হচ্ছে এবং মূল নীতিনির্ধারণী জায়গায় তাদের কোনো অবস্থান নেই। আমার ধারণা, এনসিপির নারী নেতৃত্বরা সেটি মেনে নেবে না। সুতরাং এখানে একটা প্যারাডাইম শিফট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। নারীদের মাইনাস করার এই তৎপরতা আমরা কোনোভাবে মেনে নেব না।
সমকাল: আপনারা নতুন বন্দোবস্তের ডাক দিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে লুটেরা শ্রেণিগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ। নতুন বন্দোবস্ত কতটা বাস্তব, কতটা অলীক?
সামান্তা শারমিন: দেশে যে গণঅভ্যুত্থান আমরা দেখেছি, সেটির প্রভাব ও মাত্রার দিকটা বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের জন্য এটি যথেষ্ট। বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো বদলে ফেলতে এই গণঅভ্যুত্থান অত্যন্ত শক্তিশালী একটি হাতিয়ার। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্র-জনতা ফ্যাসিবাদী শাসকের উৎখাত ঘটিয়েছে। এর প্রধান ও তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হলো, এ দেশের মানুষ বিদ্যমান সিস্টেম তথা ক্ষমতা ও রাষ্ট্র কাঠামোতে আস্থা হারিয়েছেন। তারা এটি ভেঙে ফেলতে চান। এবারের আন্দোলনের লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, তারা ক্ষমতা কাঠামো বদলে ফেলার কেবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেননি বরং নিজেদের কর্তাসত্তা হিসেবে হাজির করেছেন। এটা ৬৯ কিংবা ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানেও এত ব্যাপক পরিসরে দেখা যায়নি। গণমানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মর্মার্থ রাষ্ট্র যদি ধারণ করতে না পারে, তাহলে গণঅভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে। ইতোমধ্যে এটা স্পষ্ট, ক্ষমতার বলয়গুলো তথা এস্টাবলিশমেন্ট পুরোনো নিপীড়নমূলক কাঠামো জারি রাখতে চায়।
সমকাল: শ্রেণিগত ধারণা থেকে তরুণরাও একই লুটেরা শ্রেণিগোষ্ঠীর বাইরে নয়। এরই মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে। তাহলে আপনাদেরও কি লুটেরা পথে হাঁটার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে?
সামান্তা শারমিন: প্রথমত, আমাদের বেশির ভাগই তরুণ; অভিজ্ঞতাও কম। সেই সঙ্গে রাজনীতিতে যে দূরদর্শিতা দরকার, সেটিরও ঘাটতি রয়েছে। রাজনীতিতে ২০-২৫ বছরের একটা পরিকল্পনা মাথায় নিয়ে এগোতে হয়। সেই সুযোগ ও অভিজ্ঞতা আমাদের মধ্যে অনেকেরই নেই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এনসিপির নেতৃত্ব পর্যায়ে সেই ঘাটতি আমাদের রয়েছে। সেই জায়গা থেকে তরুণদের বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র করে বেকায়দায় ফেলে দেওয়ার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। কাউকে কাউকে প্রাণের ভয় দেখানো হচ্ছে। জুলাই সনদের মতো একটা মৌলিক দলিল প্রণয়নের জন্যও আমাদের লড়াই করতে হচ্ছে। এর চেয়ে বড় আফসোস কী হতে পারে! গণঅভ্যুত্থানের যোদ্ধাদের আপনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেবেন। এগুলো তো ন্যূনতম দাবি। এটার জন্য দাবি তোলার কোনো দরকার ছিল না। কিন্তু পুরো ব্যবস্থা গণঅভ্যুত্থানবিরোধী একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। যখন নিরাপত্তাটাই বিঘ্নিত হয়, তখন ব্যক্তি এগুলো নিয়ে শঙ্কিত হবেই। আর এই উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য চারপাশে অনেক মানুষ রয়েছে। এই শঙ্কা থেকে কেউ কেউ এই লোভে পা ফেলতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দলের মধ্যে এটি উত্তরণের কোনো পথ আছে কিনা, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
সমকাল: বিশেষত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর তরুণদের মধ্যেও বিভক্তি বেড়েছে। এটা স্পষ্টত নেতৃত্বের জায়গা থেকে এনসিপিরই দুর্বলতা নয় কি?
সামান্তা শারমিন: এনসিপির বয়স তো বেশি নয়। তার আগে নাগরিক কমিটি ছিল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছিল। এ রকম অনেক সংগঠন ছিল। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোতে তরুণদের কীভাবে রাখা হয়? এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। উপেক্ষিত করে তরুণদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর তরুণ কর্মীরা এটা বুঝতে পারলে তারা এই রাজনীতিকে ছুড়ে ফেলে দিত। কিন্তু আফসোস, তারা এটা বুঝতে পারছে না! একজন কর্মী কত বছর পর বিএনপির একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে পারবে? কত বছর রাজনীতি করে জামায়াতের একটা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব নিতে পারবে? দেখবেন, কত কাঠখড় পুড়িয়েও অনেকে মাঝে মাঝে রাজনীতিতে স্বপ্ন দেখতে ব্যর্থ হয়। বিএনপির অন্তঃকোন্দলগুলো কেন হয়? কারণ ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে, জায়গা দিতে বিএনপি কিংবা জামায়াতের কাঠামো যথেষ্ট নয়। সুতরাং আমাদের এমন একটি কাঠামো দরকার, যেখানে আপনি তরুণ ও প্রবীণ উভয়কে ধারণ করতে পারেন। এটার মিশেল না হলে আপনি গণমানুষের রাজনৈতিক দল গড়ে তুলতে পারবেন না। বিদ্যমান রাজনৈতিক দল বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখবেন, তারা তরুণদের ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করে মাত্র। তরুণদের অভিজ্ঞতা কম হতে পারে, কিন্তু তাদের স্পিরিটকে গ্রহণ করা এবং এটাকে ক্রাইটেরিয়া হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সিস্টেম বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোতে নেই। আর ঐতিহাসিকভাবে তরুণদের বিভেদের ব্যাপারটি এনসিপিকে কোনো না কোনো মাত্রায় নিতে হবে। কারণ গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে তরুণ অনেকেই নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রধান করে দেখেছেন। এটা বাস্তবতা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা হঠাৎ অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এসব তরুণের ধারণ করার মতো রাজনৈতিক দলগুলোর কোনো মেকানিজম নেই।
সমকাল: গণঅভ্যুত্থানের শরিক হওয়া সত্ত্বেও বিএনপির সঙ্গে এনসিপির সংঘাত বাধছে কেন?
সামান্তা শারমিন: এটার অনেক কারণ রয়েছে। গত ১৫ বছর আমরা চাঁদাবাজি করতে পারিনি, এখন আমরা করবই– বিএনপির মধ্যে এ ধরনের ভাষা ব্যবহার করতে আমরা দেখেছি। তৃণমূলে এটা ভয়াবহভাবে রয়েছে। এ ধরনের নিপীড়িত, ক্ষুধার্ত মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন। এই সাংগঠনিক সক্ষমতাও বিএনপির নেই। মূল নেতৃত্ব এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এনসিপি যেহেতু পুরো কাঠামো পরিবর্তনের দাবি তুলেছে, সেই জায়গা থেকে এনসিপির সঙ্গে বিএনপির সংঘাত বাধছে। আমরা মনে করি, এটা আমাদের যেমন ছাপিয়ে উঠতে হবে, তেমনি তাদেরও ছাপিয়ে উঠতে হবে। এটা উভয় পক্ষের একটা দায়িত্বশীলতার বিষয়।
সমকাল: আদৌ কি আপনাদের সঙ্গে পুরোনোপন্থিদের কোনো পার্থক্য রয়েছে? আমরাও দেখছি আপনারা বিদ্যমান রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লুণ্ঠনের বাইরে যেতে পারছেন না?
সামান্তা শারমিন: নিয়তের জায়গা থেকে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। যদি নিয়তের জায়গায় পার্থক্য না থাকত, তাহলে বিএনপি জাতীয় সরকার গঠনে রাজি হতো। এর মানে হলো, আমরা কয়েক বছর সময় নিয়ে দেশটাকে সবাই মিলে গড়ে তুলতাম। বিএনপি তো এই গঠনে হাত দিতে রাজি হলো না। বিদ্যমান ক্ষমতার বলয় তথা এস্টাবলিশমেন্টে থাকাটাই তার জন্য আরামদায়ক। অস্বীকার করব না– আমাদের ক্ষেত্রে কেউ প্রশ্নবিদ্ধ কাজে জড়িয়ে পড়েছেন।
সমকাল: সমাজের বিপুলসংখ্যক লোক আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য পুরোনো দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এবার জনগণ বিএনপির মতো ‘বড় দল’কে ভোট না দিয়ে এনসিপিকে কেন দেবে?
সামান্তা শারমিন: বিএনপিকে ভোট না দেওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। তৃণমূলের ওপরে তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। একজন ছোট ব্যবসায়ী বা খাবার বিক্রেতা; তার আয় কতটুকু? যখন এই স্বল্প আয়ের লোকদের কাছ থেকেও একটা অংশ নিয়ে যাওয়া হয়, সেটার প্রভাব কিন্তু পরিবারেও পড়ে। শুধু চাঁদাবাজি বলে এর পুরো চিত্র আমরা বোঝাতে পারছি না। এর সামাজিক প্রভাব উঠে আসছে না। মানুষ তো বিরক্ত। তারা আওয়ামী লীগের অত্যাচার দেখেছে। এখন কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের চেয়ে তৃণমূলে বেশি চাঁদাবাজি হচ্ছে। সম্প্রতি যেসব সহিংসতা ঘটেছে, সেগুলো আমরা কখনও একটি গণঅভ্যুত্থানের শরিক রাজনৈতিক দলের কাছে আশা করিনি। এসব বিবেচনা নিয়ে জনগণ এনসিপির কাছেই ফিরে আসবে।
সমকাল: ২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচন হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোয় সুষ্ঠু নির্বাচন কি সম্ভব?
সামান্তা শারমিন: বিদ্যমান কাঠামোতে সুষ্ঠু নির্বাচন কোনোভাবে সম্ভব নয়। এর একটা কারণ হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এখানে এখনও আওয়ামী লীগের লোক আছে। সেনাবাহিনীকেও যদি বিবেচনায় নেন, তাতেও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। গণঅভ্যুত্থানে তাদের ভূমিকা নিয়েও কোনো স্পষ্টতা নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে অতীতে রাতের ভোট হয়েছে। ডামি নির্বাচন হয়েছে। এখনও কেউ ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। কারও অনুতপ্ততা আমরা এখনও দেখিনি। শুধু এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কারণেই সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এখানে অন্যান্য কারণ না-ই বললাম।
সমকাল: আপনাকে ধন্যবাদ।
সামান্তা শারমিন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- সামান্তা শারমিন
