ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিশ্লেষণ

শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান: এজমালি লক্ষ্য ও ভাষার সন্ধানে

শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান: এজমালি লক্ষ্য ও ভাষার সন্ধানে
×

কাজী এ এস এম নুরুল হুদা

কাজী এ এস এম নুরুল হুদা

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩০ | আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৩১

জুলাই-আগস্টের শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থান জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত। কোনো জটিল আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং এটি ঐক্যবদ্ধ এজমালি বা সামষ্টিক লক্ষ্যে পরিচালিত হয়েছে। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেতৃত্বে সরকারি চাকরির কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবিতে সূচিত আন্দোলনটি দ্রুতই ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও সরকারি জবাবদিহির বৃহত্তর লড়াইয়ে রূপান্তরিত হয়। 

শিক্ষার্থীর নেতৃত্বাধীন এ গণঅভ্যুত্থান দমনমূলক শাসন অবসানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সক্ষম হয়। প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের অনাস্থা প্রকাশ করে এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রমের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। এটির এজমালি লক্ষ্য ক্ষমতাসীন দলের বিভাজনমূলক বয়ান নিষ্ক্রিয় করতে, আদর্শিক জটিলতা এড়াতে এবং অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সাফল্য অর্জনে গণঅভ্যুত্থানকারীদের সক্ষম করে তোলে।

এক কথায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের একমাত্র এজমালি লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতন। সে অর্থে এ আন্দোলনের কোনো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বহুত্ববাদী গণপরিসরের স্বপ্ন ছিল না, যা এজমালি লক্ষ্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আন্দোলনের অন্তর্নিহিত এজমালি লক্ষ্যই এর ভাষা গঠন করেছে।

কোটা সংস্কার থেকে সরকার পতন
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার দাবিতে ১ জুলাই ২০২৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করে। ১৪ জুলাই দিনের বেলা পর্যন্ত সাধারণ আন্দোলনের মতোই মিছিল, সমাবেশ, অবরোধ চলছিল। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেকে এ আন্দোলন সম্পর্কে অবগত বা আগ্রহী ছিল না। যারা সচেতন ছিল, তাদের অনেকেই ভাবত, শেখ হাসিনা সরকার অন্যান্য আন্দোলনের মতো এটিকেও দমন-পীড়নের মাধ্যমে চাপা দিতে সক্ষম হবে। ১৪ জুলাই থেকে পুরো পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে থাকে। ওই দিন শেখ হাসিনা এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’ তাঁর এ বক্তব্যে আন্দোলনকারীরা অপমানিত ও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। গভীর রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের মিছিলে স্লোগান ওঠে– ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ রাতে ও পরদিন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ পৈশাচিক হামলা চালায়; বিশেষত নারীশিক্ষার্থীর ওপর হামলা আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়। 
আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ১৬ জুলাই দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করে এবং শেখ হাসিনাকে ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানায়। আন্দোলনকারীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানায় ছাত্রশিবিরসহ ২২টি শিক্ষার্থী সংগঠন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারাদেশে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের ব্যাপক সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়। এর মধ্যে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শিরদাঁড়া সোজা করে পুলিশের রাবার বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করে আন্দোলনের প্রেরণাদায়ী প্রতীকে পরিণত হয়।

১৭ জুলাই দেশের সকল প্রাইভেট ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ও হল খালি করা হয়। অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বাড়ি চলে যেতে বাধ্য হয়। তখন মনে হয়েছিল, আন্দোলন এখানেই শেষ। কিন্তু ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বুক চিতিয়ে লড়াইয়ে নামে; সারাদেশে ৭০ জনের বেশি প্রাণ হারায়। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সরকারি চাকরির প্রতি তেমন আগ্রহ নেই, তবুও তারা জীবন দিয়ে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তন করে দেয়।
২১ জুলাই সরকারি চাকরিতে ৯৩% মেধার পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিলেও ততদিনে ১৩০ জনের বেশি প্রাণ হারিয়েছিল। অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছিল। অধিকন্তু পুলিশ বাহিনী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী যেভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, তা জনসাধারণের বিবেককেও নাড়া না দিয়ে পারেনি। অনেকেই বলতে শুরু করেন, কেবল কোটা সংস্কার নয়, এ আন্দোলন সরকার পতন পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া দরকার। সম্ভবত এ কারণেই ৩ আগস্টে ‘গণভবনের দরজা খোলা’ বলে শেখ হাসিনার আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের নেতারা।

আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর জনসাধারণের ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। টানা তিনটি ছলচাতুরীর নির্বাচন ছাড়াও ২০১৮ সালের প্রথম কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমে ছিল। নিরাপত্তাহীনতা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, লাগামহীন দুর্নীতির কারণে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছিল। কেবল বিশেষ কোনো কৌশল বা ভাষার কারণে সাধারণ মানুষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মবোধ করেছে, এমন নয়। কারণ সরকারের হাতে আন্দোলনরত মানুষকে প্রাণ হারাতে এ দেশের মানুষ ১৫ বছরে কম দেখেনি।
যেমন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দাবি, ২০২৩ সাল পর্যন্ত দলটির ১৫৫১ নেতাকর্মী নিহত, ৪২৩ জন গুম, দেড় লাখ মামলায় ৬০ লাখ আসামি হয়েছে। দানবীয় শাসনে ক্লান্ত ও হতাশ এ ‘রাজনৈতিক’ জনতারই একটি অংশ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কাজে লাগাতে চেয়েছে। যে কারণে বিএনপি ৬ জুলাই এ আন্দোলনকে সমর্থন জানালেও দলীয় ব্যানারে শরিক হয়নি। জামায়াতসহ অন্য অনেক রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বিএনপির ৪২২ ও জামায়াতের ৮৭ নেতাকর্মী নিহত হয় বলে পরবর্তী সময়ে দল দুটি দাবি করে। প্রশ্ন জাগে, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও বিএনপি ও জামায়াতের মতো রাজনৈতিক দল যে সরকারকে উৎখাত করতে পারেনি; বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কীভাবে তাতে সক্ষম হলো?

বাইনারির ভাঙন ও ভাষার প্রভাব
অনেকের দাবি, বিএনপি ও জামায়াত এমন কোনো ভাষা হাজির করতে পারেনি, যা মধ্যবিত্ত নাগরিক ও তরুণ সমাজকে আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। তবে গুম, খুন ও জুলুম তারা কম ভোগ করেনি। এ রকম বাস্তবতায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’ স্লোগানটি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত অস্ত্রকে নিমেষেই বিষহীন করে দেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্লোগানের এমন ভাষা রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক জনগোষ্ঠীকে এমন পরিসর দেয়, যেখানে তারা ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ বাইনারির সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়।

বস্তুত স্লোগানটির ত্রিমুখী তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমত, স্লোগানটি ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ বাইনারি অস্ত্র কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের ‘অরাজনৈতিক’ সাধারণ মানুষের মনে আন্দোলনে যোগ দিলে ‘অপরায়িত’ হওয়ার ভয় দূর করে দেয়। দ্বিতীয়ত, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন স্লোগানটির মাধ্যমে সরকারবিরোধী শক্তিগুলোর বিরাট অংশের নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পেরেছে, যা পরবর্তীকালে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রমাণিত। তৃতীয়ত, স্লোগানটি সরকারপ্রধানকে ‘স্বৈরাচার’ হিসেবে সামাজিক ন্যায্যতা প্রদান করে।

অবশ্য মানুষের অংশগ্রহণের দিকে খেয়াল না করে শুধু শাব্দিক বা তাত্ত্বিক দ্যোতনার ওপর জোর দেওয়া অনেকটা শেখ সাদির সেই পোশাকের গল্পের মতো, যেখানে মানুষের কাজ মূল্যায়ন না করে পোশাকের মূল্যায়ন করা হয়। উপাদানের চেয়েও উপাদানের আবরণে জোর দেওয়ার এ প্রবণতা অনেকেরই সহজাত। এ ক্ষেত্রে আমরা ভুলে যাই, কোনো উপাদান ‘উপাদান’ হয়ে উঠেছে তার অন্তর্নিহিত কারণ ও ইতিহাসের জন্য। আবরণের ওপর জোর দেওয়ার প্রবণতার কারণেই বিগত কর্তৃত্ববাদী সরকার উন্নয়নের নামে নাগরিক মৌলিক অধিকার ভুলিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নাম যদি ‘কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ হতো, তবুও গত দেড় দশকের ইতিহাস এবং আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারণে চাকরির আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ দিতে বেগ পেতে হতো না। আবার শুধু ‘বৈষম্যের বিরোধিতাই’ যদি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হতো, তাহলে ৩ আগস্ট আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘গণভবনের দরজা খোলা’ বলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহ্বানের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন থেমে যেত। ততদিনে সরকারি বাহিনী ও দলের হাতে এত মানুষ হতাহত হয়েছিল যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘বৈষম্যবিরোধী’ নামটিই অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। অর্থাৎ একটি সামাজিক আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলনে রূপান্তরে মানুষ হত্যা মূল ভূমিকা রেখেছে।

এজমালি লক্ষ্য ও ভাষার সন্ধান
সাফল্যের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আওয়ামী বয়ানকে খারিজ করে দিতে পারলেও এ প্রচেষ্টা বহুদিনের। বহু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টা করে আসছিল। বিএনপির মতো অপেক্ষাকৃত ‘সেন্ট্রিস্ট’ রাজনৈতিক দলের ভাষাও অন্তর্ভুক্তিমূলক ছিল। তবে স্বাধীনতার পর থেকে দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক অনুশীলনের কারণে বিএনপি নিজেও যার বড় ভাগীদার– রাজনৈতিক দলের ভাষা ও কর্মসূচির প্রতি মানুষের আস্থা তেমন ছিল না। আরেক ধরনের মানুষ ছিল, যারা ‘স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে ভয় পেত। অনেকে রাজনৈতিক বিষয়ে আগ্রহীই ছিল না।
ফলে বিএনপির মতো ‘সেন্ট্রিস্ট’ রাজনৈতিক দলের ভাষা অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া সত্ত্বেও তারা বেশির ভাগ মানুষকে সহমর্মী হিসেবে পায়নি। বরং ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় কেউ কেউ দলটিকে কৌশলগত ভুলের জন্য দোষারোপ করে। আবার বিএনপি যখন ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে ‘রাতের ভোট’ দেখে, তখন নাগরিক সমাজ থেকে বড় ধরনের প্রতিবাদ দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের ‘ডামি নির্বাচন’ নিয়েও বিএনপি সহমর্মী পায়নি। 

নাগরিক অধিকার থেকে বারবার বঞ্চিত হওয়া সত্ত্বেও মূলত রাজনৈতিক অনাস্থার কারণে সাধারণ মানুষ বিএনপির অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষা গ্রহণ করেনি। এ পরিস্থিতিতে ত্রাতা হিসেবে আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এ ফোরামের নেতৃত্ব সম্পর্কে মানুষ তেমন কিছু জানত না। ফলে রাজনৈতিক অনাস্থার গ্লানিও তাদের বহন করতে হয়নি। আন্দোলনের ভাষাগত তাৎপর্যের দিক থেকে বেশি পার্থক্য না থাকলেও সরকার পতনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সর্বজন-গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব দিতে পেরেছে।
মোদ্দাকথা, আন্দোলনের সাফল্যের মূল কারণ অনন্য এজমালি ভাষা নয়, যেখানে বহু ভাষা বা বয়ানের মানুষ এক লক্ষ্যে একত্র হয়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে পেরেছে। বরং সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আস্থাহীনতা, গুম-খুন-জুলুমের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলগুলোর মজলুম হয়ে ওঠা; শক্তিশালী কিন্তু বিষাক্ত আওয়ামী বয়ানকে নস্যাতের মতো স্লোগান তৈরিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্ষমতা এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী-জনতার হতাহত হওয়াই শেখ হাসিনার পতনের পরিসর তৈরি করেছে।

এ আন্দোলনে অনন্য এজমালি ভাষা খুঁজে না পাওয়া গেলেও এজমালি লক্ষ্য খুঁজে পাওয়া যায়; শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন। যে কারণে বিএনপি, জামায়াত বা ডানপন্থি-মধ্যপন্থি-বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাতার নিচে আশ্রয় খুঁজেছে। যে কারণে সরকার পতনের এক দফা দিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৩ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও জনতা সেই দাবি আগে থেকেই জানিয়ে আসছিল। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল ছয় সমন্বয়ক ডিবির হেফাজতে থেকে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও ২৮ জুলাই থেকে শিক্ষার্থী-জনতা স্লোগান তুলেছিল, ‘তুমি কে, আমি কে? সমন্বয়ক, সমন্বয়ক!’। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছিল, সমন্বয়করা কী বলছে, তা বিবেচনার প্রয়োজন অনুভব করছিল না মানুষ। তাদের দৃষ্টি তখন সম্পূর্ণভাবে সরকারের পতনের দিকে। এ পরিস্থিতিই সমন্বয়কদের ৯ দফাকে এক দফায় রূপান্তরে বাধ্য করে।

ভাবতে হবে, শেষ মুহূর্তের পরিবর্তনের পরও কীভাবে লাখ লাখ মানুষ সকাল থেকেই গণভবন অভিমুখে রওনা দেয়? তাদের তাৎক্ষণিক সংঘটন রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য কোনো সংগঠিত শক্তির পক্ষে সম্ভব ছিল না। উল্লেখ্য, বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো এ আন্দোলনে শুরু থেকেই অংশগ্রহণ করে সরকার পতনের কথা মাথায় রেখে, যা ‘পার্টি-পলিটিক্স’ করা যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে কোটা সংস্কার আন্দোলন হলো রাসায়নিক বিক্রিয়ার অনুঘটকের মতো, যার উপস্থিতি সরকার পতন নিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সাহায্য করেছে।

যেহেতু আন্দোলনের সাফল্যের মূল কারণ এজমালি লক্ষ্যের উপস্থিতি, অনন্য এজমালি ভাষা নয়; আমার মতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাফল্য হচ্ছে, এ লক্ষ্যে ধাবমান বিভিন্ন মত-পথের ব্যক্তি ও দলকে তারা একটি ব্যানার দিতে পেরেছে, যার ছায়াতলে দাঁড়িয়ে দলীয় পরিচয় গোপন করেও শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলন করতে পেরেছে। আবার যেহেতু এ আন্দোলনের এজমালি লক্ষ্যই আন্দোলনের প্রকৃত এজমালি ভাষা, তাহলে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বহুত্ববাদী গণপরিসরের স্বপ্নই কি এ এজমালি লক্ষ্য? অন্যভাবে বললে, গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বহুত্ববাদী গণপরিসরের স্বপ্নই কি জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের অনন্য এজমালি ভাষা?

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে যেসব মত-পথের ব্যক্তি ও দলের সমাবেশ ঘটেছিল, তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও বহুত্ববাদী গণপরিসরের স্বপ্ন নিয়ে বোঝাপড়া ছিল না। ৫ আগস্ট-পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে নজর দিলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। যদি সেই বোঝাপড়া থাকত, তাহলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে আন্দোলনকারী বিভিন্ন গোষ্ঠী বিবাদ ও বিভেদে জড়াত না। গণঅভ্যুত্থানের আগে শেখ হাসিনার পতনের লক্ষ্যের বাইরে যদি অন্য এজমালি ভাষা থাকত, তাহলে অভ্যুত্থানের পরও সেই লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকত।
মনে রাখতে হবে, এজমালি ভাষা তৈরি করার বিষয় নয়; হয়ে ওঠার বিষয়। শেখ হাসিনার পতন দরকার– এটি কেউ আন্দোলনের এজমালি ভাষা হিসেবে তৈরি করে দেয়নি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে এসে আপনাআপনি সবার এজমালি ভাষা হয়ে উঠেছে। এ জন্যই আমি দাবি করি, আন্দোলনের অন্তর্নিহিত এজমালি লক্ষ্যই এর এজমালি ভাষা। এর বাইরে অন্য কিছুকে– হোক তা গণতন্ত্র বা বহুত্ববাদিতা, এর এজমালি লক্ষ্য বা ভাষা বলার সুযোগ নেই।
এটি স্পষ্ট, শেখ হাসিনার পতনই ছিল আন্দোলনের এজমালি লক্ষ্য তথা ভাষা। এ লক্ষ্য অর্জিত হবার পরে এখন দেখা দরকার, সংবিধানের কোন উপাদান শাসকদের কর্তৃত্ববাদী করে তোলে।

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রিকন্সিলিয়েশন
জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান এজমালি লক্ষ্য হিসেবে বহুত্ববাদ গ্রহণ করলে আরেকটি গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়– আওয়ামী লীগ কি নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘রিডেম্পশান’ এবং ‘রিকন্সিলিয়েশন’-এর পথ খুঁজে পাবে?

এ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে গণঅভ্যুত্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তার ওপর। যদি গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের মতো আদর্শকে এজমালি লক্ষ্য হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে রিকন্সিলিয়েশন অত্যন্ত কঠিন বলে মনে হয়। অন্যদিকে যদি শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অপসারণকে একক এজমালি লক্ষ্য বিবেচিত হয়, তবে রিডেম্পশান ও রিকন্সিলিয়েশনের সম্ভাবনা বাড়ে।
যদি গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদভিত্তিক সামষ্টিক আহ্বানের ওপর গড়ে ওঠে, তবে গণঅভ্যুত্থানকারী শিক্ষার্থী-জনতা এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে আদর্শিক ব্যবধান প্রকট হয়ে দাঁড়ায়। আওয়ামী লীগের চিরায়ত দুই মূল স্তম্ভ– বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা দেশের প্রেক্ষাপটে গত দেড় দশকে বৈষম্যমূলক বলে প্রমাণিত। এ দর্শন ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ’ বিভাজনমূলক বাইনারি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে। বহুত্ববাদভিত্তিক এজমালি লক্ষ্য এ বাইনারিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশীদারিত্বমূলক রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিকল্প দর্শন প্রস্তাব করে। এ আলোকে গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের রিকন্সিলিয়েশন দলটির রাজনৈতিক পরিচয়ের মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া অসম্ভব বলে মনে হয়। 

যদি গণঅভ্যুত্থানটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার অপসারণের একক এজমালি লক্ষ্যে পরিচালিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে আমরা ভিন্ন দৃষ্টিকোণের মুখোমুখি হই। এ ব্যাখ্যা শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানকে আওয়ামী লীগের মূল দর্শনের বিরুদ্ধে আদর্শিক লড়াই হিসেবে নয়, বরং একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের বাস্তব প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করে। এ বিশ্লেষণ আওয়ামী লীগকে আদর্শিক উৎখাতের নিশানা হিসেবে নয়, বরং পরিস্থিতির শিকার হিসেবে অবস্থান পুনর্নির্মাণের সুযোগ দেয়। এখানে মূল লক্ষ্য বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করা নয়, বরং শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন নিশ্চিত করা। তাহলে দলটি নিজেদের রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও কৃতকর্মের দায় স্বীকারের সুযোগ পায় এবং আদর্শিক সংহতি বজায় রাখার পথ সুগম হয়। 
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পর্বে আওয়ামী লীগের প্রধান কাজ হবে তাদের সাম্প্রতিক শাসনে ক্ষুব্ধ জনগণের সঙ্গে রিকন্সিলিয়েশন করা। এটি আওয়ামী লীগকে আদর্শিক অবস্থান পুনরুদ্ধার এবং সংস্কারমুখী ও পুনর্গঠিত দল হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ দেবে। তবে এ পথ অনুসরণ করতে হলে দলটিকে গভীর আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। 

উপসংহার
শিক্ষার্থী-জনতার অভ্যুত্থানকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের ধরন নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এর রাজনৈতিক রিকন্সিলিয়েশন নির্ভর করবে এ ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানটি শুধু কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে একটি বাস্তব লড়াই ছিল, নাকি বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য আরও গভীর আহ্বান– এ ব্যাখ্যার ওপর। এ আন্দোলনের উত্তরাধিকার জাতির ভবিষ্যৎকে সংজ্ঞায়িত করবে, ঐক্যের শক্তিকে তুলে ধরবে এবং কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলোকে উন্মোচিত করবে।

ড. কাজী এ এস এম নুরুল হুদা: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×