ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণে একজীবন

জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণে একজীবন
×

ইনাম আল হক

মহসিনুল হক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৮:৩০

ইনাম আল হক সম্প্রতি ৮১ বছরে পা দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র আমার প্রতিবেশী বিশ্ব পর্যটক তানভীর অপু এবং তাঁর ভাই ভ্রমণযুবরাজ তারেক অণুর মাধ্যমে। ইনাম ভাই এবং এই দুই ভাইয়ের সঙ্গে সফরসঙ্গী হতে পারব ভেবেই মূলত আমি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে একুশ দিনের অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণে গিয়েছিলাম। একজন মানুষের কাছে মানুষ কীভাবে শুধু মানুষ হবার মন্ত্র শিখবেন তা ইনাম আল হকের সঙ্গে মিশলেই কেবল অনুভব করা সম্ভব। 
২৫ আগস্ট ১৯৪৫, ইনাম আল হক কুষ্টিয়া জেলার খোকসা উপজেলার ওসমানপুর ইউনিয়নের হিজলাবট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই পশু-পাখির প্রতি এক ধরনের টান অনুভব করতেন তিনি। প্রকৃতির কাছাকাছি বেড়ে ওঠা তাঁর। চারপাশের প্রকৃতি, পাখি আর বন্যপ্রাণের অনুভূতি ছিল তাঁর হৃদয়ে। শৈশবে একটি খাঁচাবন্দি পাখি তাঁকে পাখির প্রতি কৌতূহলী করে তোলে। সেই থেকেই শুরু প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা। পড়াশোনায়ও তিনি ছিলেন এগিয়ে। স্কুলে প্রথম হওয়ার পুরস্কার হিসেবে হাতে আসে লিও টলস্টয়ের ‘দ্য প্রিজনার অব দ্য ককেশাস’ বই। এ বইই তাঁর পাঠাভ্যাসকে পাকাপোক্ত করে। মাত্র ৯ বছর বয়সে প্রবেশ করেন স্কুলের সামনের জেলা লাইব্রেরিতে। সেই থেকে বইয়ের প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছিল তা আজও অটুট। অষ্টম শ্রেণিতে প্রথমবার পত্রিকায় ছড়া প্রকাশিত হয়। ১৯৫৯ সালে চাঁদে মানুষের অবতরণ নিয়ে লেখা প্রবন্ধ সংবাদপত্রে ছাপা হয়। লেখক জীবনের শুরু সেখানেই থেমে যায়নি, বরং বছর বছর তা গভীর হয়েছে।

তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে স্নাতকোত্তর। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রে কমিউনিকেশন-ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৬৭ সালে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তার দুই বছর পর পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় তিনি যুদ্ধবন্দি হিসেবে পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। ১৯৭৩ সালে বন্দিবিনিময় চুক্তির ফলে মুক্তি পান। ১৯৯৫ সালে বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার হিসেবে অবসর নেন। পরবর্তীকালে ব্র্যাক এবং জি কিউ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে কাজ করেন। ২০০৫ সালে চাকরি জীবন থেকে অবসর নেন। বিমানবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি পুরোপুরিভাবে পাখি গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। 

ইনাম আল হকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো ‘বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি পাখিপ্রেমী এবং গবেষকদের জন্য একটি মিলনক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। এই ক্লাবের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে পাখি পর্যবেক্ষণ, গবেষণা এবং সংরক্ষণের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। এ ছাড়াও তিনি ‘বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৩ সালে তাঁর গঠিত এভারেস্ট টিম ১-এর চারজন সদস্য এভারেস্ট জয় করেন। অন্যরা হিমালয়ের বিভিন্ন চূড়ায় আরোহণ করেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন, যিনি অ্যান্টার্কটিকা ও উত্তর মেরু ভ্রমণ করেছেন। নিজের ৬২তম জন্মদিনে উত্তর মেরুতেই দৌড়েছিলেন ম্যারাথন এক দৌড়। 

তিনি বাংলাদেশে নিয়মিত পাখিশুমারির প্রবর্তন করেন; যা দেশের পাখির সংখ্যা এবং প্রজাতির বৈচিত্র্য সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করে। এই তথ্য পাখি সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রণয়নে অত্যন্ত সহায়ক। তাঁর নেতৃত্বে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল এবং হাওর এলাকায় প্রতি বছর পাখিশুমারি পরিচালিত হয়। পাখি শনাক্তকরণের জন্য পাখির পায়ে রিং পরানোর মতো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিও তিনি বাংলাদেশে জনপ্রিয় করে তোলেন। এর মাধ্যমে পাখিদের পরিযায়ন পথ, জীবনকাল এবং আচরণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এছাড়াও তিনি দেশের বিভিন্ন জীববৈচিত্র্যময় এলাকা যেমন হাওর অঞ্চল, সুন্দরবন, চট্টগ্রামের পার্বত্য এলাকা ও উপকূলীয় অঞ্চলে গবেষণা পরিচালনা করেন। এসব গবেষণা শুধু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, নীতিনির্ধারকদের কাছেও মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করেছে।

পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত করেছেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, জাতীয় পরিবেশ পদক অন্যতম। ইনাম আল হক একাধারে পক্ষীবিদ, লেখক, আলোকচিত্রী এবং প্রকৃতিপ্রেমী। বাংলাদেশের পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কয়েক দশক ধরে তিনি নিরলসভাবে পাখিদের জীবনযাত্রা, আচরণ এবং তাদের সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। 

তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে বাংলাদেশের পাখিবিষয়ক গবেষণা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতি সংরক্ষণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। তিনি একজন দূরদর্শী প্রকৃতিপ্রেমী। তাঁর জীবন ও কর্ম বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব এবং তাঁর লেখনীর মাধ্যমে তিনি অগণিত মানুষকে প্রকৃতি ও পাখির প্রতি ভালোবাসায় অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। 
বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি সংরক্ষণের ইতিহাসে ইনাম আল হকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

মহসিনুল হক: সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ, স্পেশাল কোর্ট, কুমিল্লা
 

আরও পড়ুন

×