ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাইট টার্ন

বাড়তে থাকা দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা

বাড়তে থাকা দারিদ্র্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা
×

মোহাম্মদ গোলাম নবী

মোহাম্মদ গোলাম নবী

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৪:৪২ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৫:৩৬

কর্মসংস্থান সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও সামাজিক অস্থিরতার বহুমাত্রিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। আয় হ্রাস ও ঋণ বৃদ্ধিতে অনেক পরিবার অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও খাদ্য নিরাপত্তা এক অমীমাংসিত সংকট হয়েই আছে। এ অবস্থায় আগস্ট মাসে রাজশাহীর এক পরিবারের চারজনের মরদেহের পাশে পাওয়া ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’ চিরকুট কেবল একটি পরিবারের আর্তনাদ নয়, বরং পুরো সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতার প্রতীক। 

রাজশাহীর ঘটনার মাত্র ১০ দিন পর প্রকাশিত পিপিআরসির জরিপ আরও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে জানাল, অতি দারিদ্র্যের হার তিন বছরে প্রায় দ্বিগুণ। দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে, বলা বাহুল্য; আরও ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দেশে কর্মসংস্থান না বেড়ে বরং কমেছে। স্থিতিশীলতার অভাব থেকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে বৈশ্বিকভাবে একক বৃহত্তম দাতা সংস্থা ইউএসএআইডির কার্যক্রম বিশ্বজুড়ে বন্ধ হওয়া। বাংলাদেশেও কয়েক লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে। 

গত সপ্তাহে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত মোয়াজ্জেম হোসেন স্মারক বক্তৃতায়ও বক্তারা বলেন, এক বছরে ব্যক্তি বিনিয়োগ কমেছে এবং মজুরি হার, দারিদ্র্য ও বৈষম্য আগের চেয়ে বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের ফাঁদে ঢুকে গেছে। এখন দরিদ্র নয় কিন্তু সামান্য অভিঘাতে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার মতো পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, ‘কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জরুরি অবস্থার মুখোমুখি।’ আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়া এবং শহর-গ্রামে ব্যয়ের তুলনায় আয়ের ঘাটতি– সব মিলিয়ে পরিবারগুলো ঋণের জালে আটকা পড়ছে।

পিপিআরসি গবেষণায় দেখা যায়, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও পরিবারগুলোকে তাদের মোট ব্যয়ের অর্ধেকের বেশি শুধু খাদ্যের পেছনেই যাচ্ছে। অতিদরিদ্র পরিবারগুলো সপ্তাহে অন্তত একবেলা না খেয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। আবার প্রায় ৯ শতাংশ পরিবার কোনো কোনোদিন একেবারেই খাবার পাচ্ছে না। এটি যেন নিছক সংখ্যা নয়, বরং মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি।

গত কিছুদিনে আমি দুটি ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি, যা সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করেছে। প্রথমটি ঘটেছিল মেট্রোরেলের পল্লবী স্টেশনে। ট্রেনের এক সহযাত্রী লিফট থেকে নেমে আমার পিছু নিলেন এবং একটু নিরিবিলিতে নিচু স্বরে বললেন, ‘ভাই, বাড়িতে ভাত রান্না করার মতো চাল আছে, কিন্তু সবজি কেনার টাকা নেই।’ পরিপাটি পোশাক পরা, কোমরে বেল্ট আর পায়ে জুতা পরা একজন মানুষ ভাতের সঙ্গে তরকারির ব্যবস্থা করতে পারছেন না– আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আলাপে জানতে পারলাম, তিন মাস আগে তিনি চাকরি হারিয়েছেন। আর তুলনামূলক সচ্ছল মানুষদের সহজেই খুঁজে পেতে তিনি মেট্রোরেল ব্যবহার করেন।

দ্বিতীয় ঘটনাটি আরও ভয়াবহ। ফকিরাপুলের এক ছোট্ট রেস্টুরেন্ট, যেখানে আমি প্রায় ৩৮ বছর ধরে দুপুরে গেলে পরোটা-ভাজি খাই। সেদিন দেখলাম, একজন গ্রাহক ছোট দুই পরোটার বদলে একটি নিলেন এবং ভাজির বদলে শুধু এক গ্লাস পানি চাইলেন। আমার জন্য এটি ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। যে দোকানে মানুষ মূলত ভাজি খেতে আসে, আর যেখানে দুই পরোটাসহ নাশতার দাম এখনও মাত্র ২৫ টাকা– সেখানে এক পরোটা আর এক গ্লাস পানি দিয়ে দুপুরের খাবার সারতে চাওয়া সমাজে নীরবে বেড়ে ওঠা অনাহার আর অক্ষমতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখলাম, গত মার্চ মাস থেকে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। কেউ বলছেন, হুন্ডি নিয়ন্ত্রণের কারণে বৈধ পথে অর্থ আসছে বেশি। তবে আমার অভিজ্ঞতা বলছে, দেশে থাকা পরিবারগুলোর আয় কমে গেলে প্রবাসী আত্মীয়স্বজন নিজেরা কষ্ট করেও অতিরিক্ত অর্থ পাঠায়। গত ৩০ বছরে দেশের ১৪৭টি উপজেলায় এবং রাজধানী-গ্রাম মিলে বিভিন্ন সময় কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, এটাই বাস্তবতা। ফলে রেমিট্যান্স বৃদ্ধি আসলে দেশের পরিবারগুলোর ক্রমবর্ধমান দুর্ভোগেরই প্রতিফলন।

শুধু খাদ্যসংস্থান নয়; বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে মানুষ। পণ্যের দাম বৃদ্ধি, আয় হ্রাস, চিকিৎসা খরচের চাপ, সন্তানদের লেখাপড়া চালানো এবং আগামী দিনের অনিশ্চয়তা মিলে এক ধরনের সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করছে। এর ওপর যুক্ত হয়েছে আইনশৃঙ্খলার অবনতি, মাদকাসক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্কলহ, যা অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে।

আজ আমরা এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দারিদ্র্য শুধু পরিসংখ্যান নয়; আমাদের চারপাশে স্পর্শযোগ্য বাস্তবতায় পরিণত। রাজশাহীর পরিবারের মৃত্যু কিংবা মেট্রোরেল স্টেশনে অসহায় মানুষটির আর্তি গভীর সংকটেরই সংকেত। এখনই যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনীতিকে সচল করা, বিনিয়োগ বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া, দুর্নীতি দূর করার নামে কলকারখানা বন্ধ করা থামানো, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে দেশকে মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।

অভিযোগ রয়েছে, পূর্ববর্তী সরকার আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছে ‘ভাবমূর্তি’ বাড়াতে নিয়মিতভাবে পরিসংখ্যান কারচুপি করে আসছিল। যে কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ঘোষিত হয় এবং আগামী বছর স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান হওয়ার কথা। এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে দেশের কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় খাত এনজিওতে তহবিল ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। এখন যদি প্রকৃত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয় তাহলে দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে পুনরায় তহবিল পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। 

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

আরও পড়ুন

×