রাইট টার্ন
পরিসংখ্যান: অনাস্থা ভাঙতে আরও যা করতে হবে
মোহাম্মদ গোলাম নবী
মোহাম্মদ গোলাম নবী
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৪
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ঘিরে তৈরি হওয়া অনাস্থা ভাঙার চেষ্টা শুরু হয়েছে। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংস্কারের জন্য গত এপ্রিলে গঠিত বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স তাদের খসড়া প্রতিবেদন গত ১৫ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছে হস্তান্তর করেছে। লক্ষ্য একটাই– তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ, যাচাই ও প্রকাশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এমন পর্যায়ে উন্নীত করা, যাতে জাতীয় নীতিনির্ধারণে এর পরিসংখ্যান নিঃসংশয়ে ব্যবহার করা যায়। সংক্ষেপে ডেটা বা উপাত্তকে প্রভাবমুক্ত করা এবং প্রমাণকে নীতির কেন্দ্রে ফেরানো। উপদেষ্টা বলেছেন, জিডিপি ও মূল্যস্ফীতির মতো তথ্য প্রকাশে রাজনৈতিক অনুমোদন আর লাগবে না। টাস্কফোর্সপ্রধান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এটিকে বলেছেন সাহসী, সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত প্যাকেজ।
সংস্কার প্রস্তাবের খসড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে আইনি সুরক্ষা, শাসন কাঠামো ও পদ্ধতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিতের প্রস্তাব। এ ছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর নাম বদলে স্ট্যাটিস্টিকস বাংলাদেশ বা পরিসংখ্যান বাংলাদেশ রাখা; মহাপরিচালক পদটিকে প্রধান পরিসংখ্যানবিদ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। গবেষণা পদ্ধতি ঠিক করতে উপদেষ্টা পরিষদও গঠিত হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এসব সংস্কার পরিসংখ্যানগত তথ্য ও উপাত্তের ওপর আস্থা বাড়াতে সামাজিক পুঁজি তৈরি করবে।
সঠিক পরিসংখ্যানের কথা উঠলেই উপাত্ত ও প্রেক্ষিত নিয়ে হ্যান্স রোজলিংয়ের বিখ্যাত ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ বইটির কথা চলে আসে। সেখানে সঠিক পরিসংখ্যানের সামাজিক পুঁজি তৈরির শক্তির বিভিন্ন দিক দেখানো হয়েছে। ফ্যাক্টফুলনেস আমাদের শেখায়– মতামত নয়, ডেটা বা উপাত্ত নিয়ে ভাবা দরকার। ‘শিরোনামের শোরগোল’ না তুলে উপাত্তের ১০-২০ বছরের ‘দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা’ দেখা জরুরি। মোট সংখ্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাথাপিছু হার ও অনুপাতের প্রেক্ষিত দেখা। কারণ প্রেক্ষিতহীন বড় সংখ্যা বিভ্রম তৈরি করে। সে কারণে শুধু গড় জানা যথেষ্ট নয়; বরং বণ্টনের মধ্যমা, পরিসর ও শতকরা ভাগ দেখলে বাস্তবের বৈচিত্র্য ধরা পড়ে। এ ছাড়াও কোনো একক কারণ ব্যাখ্যা না করে বরং সম্ভাব্য চিত্রগুলো তুলে ধরা এবং বিকল্প ব্যাখ্যাও বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। হ্যান্স রোজলিং বলেছেন, ভয় এড়িয়ে ও তাড়াহুড়োর বদলে ছোট ছোট পরীক্ষা ও ধারাবাহিক হালনাগাদ করে এগোলে নীতিনির্ধারণ প্রমাণভিত্তিক ও দায়িত্বশীল করে তোলে। এই প্রেক্ষিতে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সংস্কার প্রস্তাবগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বোঝা যায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থান-বিষয়ক সূচকের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বহুবার। তথ্য বিলম্বিত হওয়া, শিরোনাম পাল্টানো কিংবা তথ্যের ব্যাখ্যা বদলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি পরিসংখ্যানের ওপর নাগরিক আস্থা ক্ষয়ে সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল। নীতিনির্ধারণী কথাবার্তাও হারিয়েছিল জনগণের আস্থা। অন্তর্বর্তী সরকার গত মে মাসে ‘তথ্য প্রকাশনীতি’ ও ‘পরিসংখ্যান প্রতিবেদননীতি’ জারি করে বিবিএসের মহাপরিচালককে জিডিপি, মূল্যস্ফীতিসহ মূল সূচক উপদেষ্টা বা শীর্ষ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই প্রকাশের পূর্ণ ক্ষমতা দিয়েছে। তবে নির্ধারিত কারিগরি কমিটির সঙ্গে পরামর্শের কথা বলা হয়েছে। এটি সঠিক পদক্ষেপ হলেও ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান আইনে ভিন্ন বিধান থাকায় প্রকাশ-স্বাধীনতা, পদ্ধতিগত সিদ্ধান্ত ও যাচাইয়ের ক্ষমতা আইনে স্পষ্টভাবে ন্যস্ত করার প্রস্তাবও সংস্কার কমিটি করেছে। এটা জরুরি ছিল।
সংস্কার প্রস্তাবগুলোর শক্তি হলো, এগুলো পরস্পরকে সমর্থন করে। আগেভাগে প্রকাশ-ক্যালেন্ডার করার কথা বলা হয়েছে, যাতে জনগণ জানতে পারবে কোন পরিসংখ্যান কখন, কোথায় প্রকাশ হবে এবং কারা দায়িত্বে থাকবে। সবাই যেন একই সময়ে একই তথ্য পায়; কারও আগাম সুবিধা নেওয়ার সুযোগ না থাকে। পূর্ণ মেটাডেটা ও পদ্ধতিগত নোট বাধ্যতামূলক করা হলে সংখ্যার পেছনের যুক্তিও দৃশ্যমান হবে।
একই সঙ্গে সংস্কার প্রস্তাবের কিছু দুর্বলতা নিয়ে এখনই বলা দরকার।
প্রথমত, দীর্ঘদিন আলোচিত স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশন প্রস্তাবে আসেনি। আবার সাত সদস্যের তদারকি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কার্যকর হতে পারে। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় পরিসংখ্যান ব্যুরোকে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে। দ্বিতীয়ত, মহাপরিচালকের নাম প্রধান পরিসংখ্যানবিদ করলেই সুফল আসবে না, যদি এই নিয়োগ প্রতিযোগিতামূলক, নির্দিষ্ট মেয়াদভিত্তিক ও অপসারণের নিয়মনীতি স্পষ্ট করা না হয়।
প্রতিষ্ঠানের নাম বদলও জরুরি নয়। বিবিএস নামটির সঙ্গে ছয় দশকের জনস্মৃতি জুড়ে আছে। রিব্র্যান্ডিং বিভ্রান্তি ও ব্যয় বাড়াবে, কিন্তু আস্থা তৈরির নিশ্চিয়তা দিতে পারবে না। যে কোনো সংস্থার প্রতি জনআস্থা গড়ে ওঠে আইন, আচরণ, জবাবদিহির মাধ্যমে। বিশ্বের অভিজ্ঞতা তাই বলে। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস একই নাম রেখে আইনি কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে স্বাধীনতা বজায় রেখেছে। যুক্তরাজ্যে পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষ শক্তিশালী। কারণ তাদের সব নিয়মনীতি লিখিত ও বাধ্যতামূলক। কানাডায় প্রধান পরিসংখ্যানবিদ কী ধরনের পদ্ধতিগত স্বাধীনতা ভোগ করবেন কা প্রকাশ্য ও নথিবদ্ধ। ফলে আমাদের কসমেটিক সার্জারি করে নাম বদলানোর চেয়ে বেশি দরকার কাঠামোগত পরিবর্তন ও সংস্কৃতি বদলানো।
বাস্তবায়নের কৌশলও গুরুত্বপূর্ণ। ‘এখনই না হলে সর্বনাশ ঘটে যাবে’– এ চিন্তা থেকে বের হতে হবে। প্রদর্শনমূলক পদক্ষেপের ঝুঁকি না নিয়ে বরং নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারের পথে ধাপে ধাপে এগোতে হবে। আইন সংশোধন, নিয়োগে স্বচ্ছতা, ক্যাডার, নন-ক্যাডার একীভূত করা, রাজস্বভিত্তিক স্থায়ী তহবিল– এমন ছোট ছোট কিন্তু যাচাইযোগ্য ধাপ তৈরি; প্রতিটি ধাপের কাজের ত্রৈমাসিক অগ্রগতি রিপোর্ট, ওয়েবে ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ, দেরির কারণ জানানো প্রভৃতি করা গেলে সংস্কারের প্রভাব কেবল বিবিএসের দেয়ালে থেমে থাকবে না। বিশ্বাসযোগ্য উপাত্তের ভিত্তিতে তখন রপ্তানি সুবিধা, মেধাস্বত্ব, ভর্তুকি, বাজার শুল্কের সঠিক হিসাবনিকাশ করা সম্ভব। এখনকার মতো গৃহীত নীতিমালা প্রশ্নবিদ্ধ হবে না। ‘ফ্যাক্টফুলনেস’ বইয়ের ভাষায় বলতে হয়, তখন অন্ধ আশাবাদ নয়, বরং ডেটাভিত্তিক সম্ভাবনায় আলোকিত হবে দেশ ও জনগণ। সরকার ও রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও ফিরবে।
মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক;
প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন
- বিষয় :
- পরিসংখ্যান বাংলাদেশ
