ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অবকাঠামো

‘শ্বেতহস্তী’ বিআরটি প্রকল্পের ভূত ও ভবিষ্যৎ

‘শ্বেতহস্তী’ বিআরটি প্রকল্পের ভূত ও ভবিষ্যৎ
×

.

সামছুর রহমান আদিল

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০৯

কিছুদিন আগে জাতীয় অর্থনেতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে খোদ পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মন্তব্য করেছেন, ‘বিআরটি প্রকল্পটি লইয়া এখন আমরা কী করিব; প্রকল্পটি নিয়ে কীভাবে এগোনো যায় তা এখনও নিশ্চিত নই’ (সমকাল, ২৭ জুলাই ২০২৫)।

বস্তুত, বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পটি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ব্যবহারকারীর কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে আতঙ্কের নাম। নির্মাণকাজের শুরু থেকেই অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষ ভুগেছে। প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে নির্মাণকাজের কারণে কয়েক দফায় দুর্ঘটনায় ১০ জনের প্রাণ গেছে। ২০২২ সালের ১৫ আগস্ট গার্ডারচাপায় একই পরিবারের পাঁচজন মারা যান। চার বছরের প্রকল্পটি ১৩ বছরেও শেষ না হয়ে পরিণত হয়েছে ব্যয় ও ভোগান্তির শ্বেতহস্তীতে।

একনেকে বিআরটি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা এএফডি ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে; বাস্তবায়নকারী সংস্থা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন ঢাকা বাস র‍্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিবিআরটিসিএল)। শুরুতে প্রকল্প ছিল চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। পরে সময় ও ব্যয় বাড়ানো হলেও প্রকল্পটি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত সংকুচিত করা হয়। তিন দফা সংশোধন হয়ে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকার বেশি।

কিছুটা উড়ালপথ, কোথাও বিদ্যমান সড়কে বিশেষ বাস দিয়ে ২০১৬ সালে নতুন এ ব্যবস্থা চালুর কথা ছিল। প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত জোড়া লাগানো আধুনিক বাস চলবে সড়কের মাঝখান দিয়ে। যানজট কিংবা ট্রাফিক সিগন্যালের কারণে বাসের চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে না। 

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত দ্রুত বাস সেবা চালু, যা যানজট কমিয়ে সময় বাঁচাবে। কিন্তু বারবার প্রকল্পের সময়সীমা ও ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটি এখন জনগণের দুর্ভোগের কারণ। সংশ্লিষ্টরা বলতে পারছেন না– ভোগান্তি কবে নাগাদ শেষ হবে; বিআরটি স্টেশন কবে চালু হবে; কবে কেনা হবে বিশেষায়িত বাস। সরকারের খামখেয়ালিতে দেশের বিপুল সম্পদ অপচয়ের নজির সৃষ্টিকারী প্রকল্পটি বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত আট লেনের মহাসড়ককে কার্যত পঙ্গু করে দিয়েছে। 

বিআরটি প্রকল্প থেকে ২০১৯ সালে করা এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, টঙ্গী কলেজগেট থেকে ভোগরা বাইপাস পর্যন্ত অংশে দিনে গড়ে ২৪ হাজার ৭৫৪টি যানবাহন চলাচল করে। চলতি বছরের শুরুতে ঢাকা মহানগর পুলিশের এক সমীক্ষায় এসেছে, আবদুল্লাহপুর হয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ হাজার যানবাহন চলাচল করে। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি মহাসড়কের মাঝখানের সবচেয়ে বেশি ব্যবহারোপযোগী তিন-চারটি লেনে বিআরটি বাস ছাড়া অন্যান্য যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষায়িত বাসগুলোতে কত যাত্রী চলাচল করবে; প্রকল্পটি না থাকলে লেনগুলোতে কত গুণ যাত্রী চলাচল করতে পারত। প্রকল্প পরিকল্পনাতেও রয়েছে বিশাল ঘাটতি। বাংলাদেশে বাসের দরজা থাকে বাঁ দিকে। বিআরটি লেনে স্টেশনগুলো রাস্তার মাঝবরাবর। যাত্রী নামবে ডান দিক দিয়ে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রকল্প কর্মকর্তারা নির্মাণকাজ পরিদর্শনে গিয়ে বহুবার ভোগান্তি নিরসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেতুমন্ত্রী ২০২২ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বিআরটি প্রকল্প গলার কাঁটা; সেই কাঁটা এখনও নামেনি। বরং কাজ শেষ না করেই গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর বিআরটি প্রকল্পে ১০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সার্ভিস উদ্বোধন করেন বর্তমান সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। 

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফাওজুল কবির খান বলেছিলেন, বিআরটি একটি রুগ্‌ণ প্রকল্প। অনেকবার সময় বাড়ানো হয়েছে, তারপরও কাজ শেষ করতে পারেনি। তারপরও উদ্বোধনের কারণ, মানুষের কিছুটা হলেও যাতায়াতের সুবিধা হবে। যদিও থেমে থাকা নির্মাণকাজ, অসমাপ্ত ফুটপাত ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন যাত্রী ও চালকদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বৃষ্টি হলে দুর্ভোগ হচ্ছে কয়েক গুণ।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিআরটি প্রকল্পের একটি স্টেশনের কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। অনেক জায়গায় পদচারী সেতুর কাজ অসমাপ্ত। কোনো কোনো স্টেশনে এস্কেলেটর ও লিফট লাগানো হয়নি। সড়কের মাঝখানে বিআরটির জন্য নির্ধারিত লেন আলাদা করতে লোহার রেলিংও সব জায়গায় নেই। ময়মনসিংহ থেকে ঢাকামুখী একটি উড়াল সড়কের কাজও বাকি।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর গাজীপুর শাখা কার্যালয়ের তথ্যমতে, গাজীপুর মহানগরে নিবন্ধিত পোশাক কারখানা ৪৯২টি। এর বাইরে ছোট-বড় কয়েকশ কারখানা আছে। এসব কারখানার অধিকাংশই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক-সংলগ্ন। প্রতিদিন কারখানায় প্রবেশ, দুপুরের বিরতি ও ছুটির সময় সড়কে হাজারো শ্রমিকের ঢল নামে। বিআরটি প্রকল্পের বিশেষ লেনের দুই পাশে বিভাজক না রাখায় শ্রমিকদের চলাচলের সুযোগ নেই। যানজট, ভোগান্তির পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও থেকে যাচ্ছে।

বিআরটি প্রকল্পের এমন পরিণতির জন্য দায়ী কে– এটা নিয়ে সরকারের কেউ প্রশ্ন তুলছে না। এখন পর্যন্ত প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কাউকে জবাবদিহি করতে হয়নি। প্রশ্ন উঠছে না, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি থাকার পরও বিআরটি পথে ‘ঢাকা লাইন’ নামে কিছু কিছু বাস চালানোর জন্য আলাদা কোম্পানি গঠন কতটা যৌক্তিক? কোম্পানিটি লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হওয়ার নিশ্চয়তা কী?
ওদিকে বিআরটি প্রকল্পের বিদেশি ঋণের কিস্তি শোধের সময়ও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ১৩৭টি বাস কেনার প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও সচিব পছন্দের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস কিনতে না পেরে পুরো প্রক্রিয়া ঝুলিয়ে দিয়েছেন।

বিআরটি প্রকল্প থেকে এখন বের হয়ে আসার সুযোগও নেই। গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডোরে বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ বাস্তবায়ন বা পরিচালনার কারণে যানজট আরও বাড়লে শিল্পাঞ্চলটি ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ক্ষেত্রে বিশেষায়িত বাস কিনে আরও অর্থের অপচয়ের বদলে প্রকল্পটি সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। এতে ওই সড়কে নির্বিঘ্নে গাড়ি চলাচল করতে পারবে। প্রকল্পে অর্থের অপচয় হলেও অন্তত নতুন ভোগান্তি বাড়বে না।

সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
[email protected]

আরও পড়ুন

×