তৃতীয় মেরু
ছাগল বিত্তান্ত
শেখ রোকন
শেখ রোকন
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০২ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১৯:৪৭
আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসটি বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছে মূলত প্রতিপাদ্যের কারণে; বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুতর পরিসরে উপাচার্যের গাভীপ্রীতি কীভাবে পরিবার ও সমাজের পাশাপাশি বিদ্যায়তনিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যদিও কোনো নাম উল্লেখ ছিল না; পাঠকমাত্রই বুঝতে পারেন যে, উপন্যাসটির পটভূমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
আমরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, মাত্র কয়েক বছর আগে প্রকাশিত ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসটি নিয়ে নানামুখী আলোচনা তখনও স্তিমিত হয়নি। ‘আলমা মাতের’ নিয়ে গরিমার কারণে ব্যক্তিগত আলাপে ছফা ভাইয়ের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তিনি নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে এভাবে ‘ধুয়ে’ দিলেন কেন? তিনি প্রশ্ন পেয়ে স্বভাবমত দুই ঠোঁট সরু করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন–‘অজ পাড়া গাঁ মানে জানেন’? আমি তখনও এর অর্থ জানতাম না।
লক্ষণীয়, উপন্যাসের নাম ‘গাভী বিত্তান্ত’ হলেও সেখানে ছাগলের প্রসঙ্গও আছে। উপাচার্য মিয়া মুহম্মদ আবু জুনায়েদের স্ত্রী নুরুন্নাহার বানু একবার ছাত্রীদের হেনস্তার শিকার হয়ে স্বামীকে বলেন–‘তোমার মতো একটা ছাগলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বলে...’। পুরানো হিসাব-নিকাশ চোকানোর তালিকা নিয়ে ভাবতে গিয়ে আরেকবার নুরুন্নাহারের মনে হয়েছিল, সাবেক প্রতিবেশী রহিমা খাতুনের ছাগলের কথা; সেটা প্রায়ই তার সবজি বাগান নষ্ট করতো।
অজ নিয়ে পাড়াগাঁয়ের মতো বিবাদ যে রাজধানীতেও ঘটতে পারে, সেটি আমাকে বিস্মিত করেছিল। এখন সম্ভবত পাঠকমাত্রই বিস্মিত হয়েছেন খোদ মন্ত্রিপাড়ায় ‘অপারেশন ছাগল’সংক্রান্ত সংবাদটি পড়ে।
খবরে প্রকাশ–আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের বাংলোয় দুটি পোষা ছাগল ছিল। গত বছর ডিসেম্বরের এক রাতে ছাগল দুটি হারিয়ে যায়। পরে জানা যায়, পাশের বাংলোয় আরেক উপদেষ্টার বাসায় আড্ডা দিতে আসা বন্ধু ও সহযোদ্ধারা রাতের বেলা দেয়াল টপকে ছাগল দুটি ধরে নিয়ে গিয়ে একটিকে জবাই করে খেয়েছেন। ‘বাংলা আউটলুক’-এর সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদন বলছে– “এই ছাগল ‘অপারেশনের’ মাস্টারমাইন্ড হিসেবে নাম আসছে বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর। সহযোগী হিসেবে ছিলেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা রিফাত রশিদ। এই ব্যাপারে বাংলা আউটলুকের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে রিফাত ঘটনাটির সত্যতা ও তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিত করেন। ... ক্ষুব্ধ আইন উপদেষ্টা বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদে অভিযোগ করেন। তরুণ উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বিব্রত হয়ে ছাগল কিনে দেন। যদিও আইন উপদেষ্টা তা ফিরিয়ে দিয়েছেন (বাংলা আউটলুক, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)।
সংবাদটি প্রকাশের পর ওয়াকিবহাল আরও কয়েকজনের ফেসবুক পোস্টসূত্রে জানা যায়, সংবাদমাধ্যমে না এলেও ঘটনাটি অনেকেই জানতেন। যেমন সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক এবং বর্তমানে বাসস এমডি মাহবুব মোর্শেদ লিখেছেন–“আসিফ ভাই উপদেষ্টা হওয়ার কিছুদিন পর ওনার বাসায় গিয়ে দেখি বাসার সামনের লনে ওনার বাচ্চারা একটা ছাগল নিয়ে খেলছে। .... পরে আরেক দিন সন্ধ্যায় গিয়ে দেখি বাচ্চারা ছাগল নিয়ে খেলছে। আমাকে দেখে ছাগলটাকে কাছে এনে দেখালো। ছাগলটাকে মায়া করে সারাক্ষণ আদর করছিল। তৃতীয়দিন গিয়ে ছাগলটিকে আর দেখলাম না। বাচ্চারা খেলছিল লনে। বললাম, তোমাদের ছাগল কই? কথার উত্তর না দিয়ে ছোট মেয়ে একদিকে সরে গেল। আসিফ ভাইকে বললাম, ওর ছাগলটা কই? আসিফ ভাই কিছু বললেন না। চুপ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন”।
উপদেষ্টার পরিবারের শিশুদের প্রিয় ছাগলের মর্মান্তিক পরিণতি ওই পরিবারেরই মাতৃকুলের পূর্বপুরুষ প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘পুটু’ ছোটগল্পটির কথা মনে করিয়ে দেয়। উত্তম পুরুষ লেখকের মা যদিও ছাগল পছন্দ করতেন না, ঘটনাচক্রে একটি দুর্বল ছাগ শাবককে দেখভালের দায়িত্ব পান। সেখান থেকে ‘পুটু’ নামের ছাগশাবকটি তাঁর ন্যাওটা ও প্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু ঈদুল আজহার আগে গৃহকর্তা ছাগলটিকে কোরবানির প্রস্তাব দিলে পরিবারে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। শেষ পর্যন্ত নাটকীয়ভাবে পুটু বেঁচে যায়। ইব্রাহিম খাঁ ছোটগল্পটি শেষ করেছেন এই বাক্য দিয়ে–“পুটু বুড়ো হয়ে মরেছিল, ওর গলায় কেউ ছুরি তুলতে সাহস পায় নাই”।
পুটু গল্পটি আমরা পড়েছিলাম কৈশোরে। আমাদের প্রজন্মের অনেকের ছাগলপ্রীতির নেপথ্যে সেই গল্পের প্রভাব থাকা অস্বাভাবিক নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘পরিচয়’ কবিতায় গ্রাম্য বালিকার মাধ্যমে মানুষ ও পোষা প্রাণীর আত্মিক সম্পর্কের ছবি এঁকেছেন এভাবে–‘এক কক্ষে ভাই লয়ে অন্য কক্ষে ছাগ/ দুজনেরে বাঁটি দিল সমান সোহাগ! পশুশিশু, নরশিশু–দিদি মাঝে প’ড়ে/ দোঁহারে বাঁধিয়া দিল পরিচয়ডোরে’।
প্রশ্ন জাগে, যাঁরা উপদেষ্টার বাংলো থেকে ছাগল ধরে নিয়ে গিয়ে ‘বঁটি দিয়ে’ জবাই করে ‘পার্টি’ করেছেন, তারা কি বাংলার সমাজ-সংস্কৃতিতে ছাগশিশুর সঙ্গে মানবশিশুর ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে জানেন না? পোষা প্রাণী নিয়ে অন্তত বাংলা গল্প-কবিতা পড়েননি? সাহিত্যের কথা বাদ, বাস্তবে এ ধরনের অঘটন কী বার্তা বহন করে?
গ্রাম বাংলার কৈশোরে অন্যের ছাগল বা মুরগি ধরে খাওয়া কিংবা গাছের ফলমূল চুরি করা বিরল নয়। এমনকি দিনের বেলা শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের হেনস্তার শিকার হয়ে, রাতের বেলা সেই শিক্ষকের গোয়ালে কিংবা বাগানে হানা দেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকেরই জীবনে রয়েছে। পরিণত বয়সে এসে এমন কর্ম দূরে থাক, চিন্তার কথাও আগে কখনও শুনিনি।
মনে আছে, ২০২৪ সালের ঈদুল আজহার আগে এনবিআরের তৎকালীন সদস্য মতিউর রহমানের সন্তান মুশফিকুর রহমান ইফাতের ছাগল কেনার ঘটনাটি ছিল আপাত নিরীহই। ‘সাদিক অ্যাগ্রো’ থেকে ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কিনে সেলফি তুলে ফেসবুকে দেয় ইফাত। সরকারি কর্মকর্তার ছেলের এত দাম দিয়ে ছাগল কেনার বিষয়টি সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তোলে। ওই ‘ছাগলকাণ্ড’র জের ধরে মতিউরের একাধিক বিয়ে, অবৈধ সম্পদ, আর্থিক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসে। তিনি স্বেচ্ছায় অবসর নিলেও সাদিক অ্যাগ্রোতে উচ্ছেদ অভিযান ও মামলা হয়। গণঅভ্যুত্থানের পর মতিউর ও তাঁর স্ত্রী কারাগারে যান, ছেলে ও মেয়ের নামেও মামলা হয়। আর ‘নাবালক’ ইফাত বিদেশে পারি জমায়।
এবারের ‘ছাগলকাণ্ড’ কতদূর গড়াবে জানা নেই। কিন্তু ঘটনাটি নিছক ব্যক্তিগত চিন্তা ও তৎপরতার বিষয় নয়; একজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টার বাসভবন থেকে আরেকজন মন্ত্রী বা উপদেষ্টার বাসভবনে রাতের বেলা দেয়াল টপকে ঢোকার রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক তাৎপর্যও হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। সময় এবং প্রেক্ষিতও গুরুতর। দেশে একটি অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেখানে শত শত মানুষ জীবন দিয়েছেন, হাজার হাজার মানুষ পঙ্গুত্ব বরণে বাধ্য হয়েছেন। শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নির্বাচন ও সংস্কারের আলোচনা হচ্ছে। আর গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতাদের কেউ কেউ রাতের বেলা পাশের বাসা থেকে ছাগল ধরে এনে ‘পিকনিক’ করছেন! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় বৈকি।
শেষ করি কাজী নজরুল ইসলাম ‘চিরঞ্জীব জগলুল’ কবিতাংশ দিয়ে–‘‘এই ভারতের মহামানবের সাগর-তীরে’ হে ঋষি, /তেত্রিশ কোটি বলির ছাগল চরিতেছে দিবানিশি!/গোষ্ঠে গোষ্ঠে আত্মকলহ অজাযুদ্ধের মেলা, এদের রুধিরে নিত্য রাঙিছে ভারত-সাগর-বেলা’’।
শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
[email protected]
- বিষয় :
- শেখ রোকন
- তৃতীয় মেরু
